Image description

দখলের পর মাইক্রোপ্লাস্টিক ও বিষাক্ত ভারী ধাতুর ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে খুলনাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণ ভৈরব ও রূপসা নদীর তলদেশ। এই দুই নদীর তলদেশের ১০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার গভীরে পলিতে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ক্যাডমিয়াম-সিসার মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি দেশের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের পরিবেশকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ইমার্জিং কন্টামিন্যান্টস’-এ প্রকাশিত যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের এক গবেষণায় উদ্বেগজনক এই চিত্র উঠে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষক নিশাত সালসাবিল, মো. তৌহিদুজ্জামান, তাপস কুমার চক্রবর্তী ও গোপাল চন্দ্র ঘোষ গবেষণাটি পরিচালনা করেন।

গবেষণার জন্য ভৈরব ও রূপসা নদীর ৯টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট থেকে ৩০ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত পলির নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা মহানগরী, যশোর নওয়াপাড়াসহ আশপাশের এলাকার শত শত টন বর্জ্য পড়ছে ভৈরব ও রূপসা নদীতে। এর মধ্যে খুলনা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন খাল ও নালা থেকে ২২টির বেশি ড্রেনের মুখ দিয়ে ভৈরব ও রূপসা নদীতে মিশছে নানা ধরনের বর্জ্য। নওয়াপাড়া এলাকায় গড়ে ওঠা ট্যানারিসহ শিল্প-কারখানার কেমিক্যাল-বর্জ্য সরাসরি পড়ছে ভৈরব নদীতে।

ফলে দিন দিন বিষাক্ত ধাতুতে ভারী হয়ে উঠছে নদীর তলদেশ।

জাতিসংঘের ‘ওয়েস্ট ওয়াইজ সিটি টুল’-এর মাধ্যমে ২০২১ সালে সিটি করপোরেশনের জরিপ অনুযায়ী, উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে খুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৭৩২ টন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে করপোরেশন প্রতিদিন ৪৬১ টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করছে। বাকি বর্জ্য ড্রেন, খাল ও নদীতে ফেলা হয়, যা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়ে পড়ে।

এই বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে রান্নাঘর বা ক্যান্টিন বর্জ্য ৭৭ থেকে ৮০ শতাংশ, প্লাস্টিক ফিল্ম ৩ থেকে ৫ শতাংশ, কাগজ-বোর্ড ৫ শতাংশ, বাকি অংশ কঠিন প্লাস্টিক, ধাতু, কাচ, টেক্সটাইল ইত্যাদি। অবশ্য বেসরকারি হিসাবে নগরীতে প্রতিদিন বর্জ্য সৃষ্টির পরিমাণ এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ মেট্রিক টন।

যবিপ্রবির গবেষকরা ভৈরব-রূপসা নদীর দূষণ পর্যবেক্ষণে ভৈরব নদীর যশোর অংশের রূপদিয়া, নওয়াপাড়া, খুলনার ফুলতলা, সিএসডি ঘাট, শোলপুর, জেলখানা ঘাট, রূপসা নদীর রূপসা সেতু, তেঁতুলতলা বোট ঘাট ও বটিয়াঘাটা এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে রূপদিয়া উজান ও বটিয়াঘাটা ভাটির স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এসব স্থানের নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি কেজি পলিতে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৭০০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে।

গড়ে এই সংখ্যা তিন হাজার ৬০০টি। মধ্যস্তরে এই সংখ্যা কমে গড়ে দুই হাজার ৭৪৪টি এবং নিচের স্তরে এক হাজার ১৭৭টিতে নেমে আসে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে প্রধানত ফ্র্যাগমেন্ট মিলছে ৫১ শতাংশ, ফাইবার ২৬ শতাংশ ও ফিল্ম ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে পলিইথিলিনের হার ২৩ শতাংশ, পলিস্টাইরিন ২১ শতাংশ, পলিপ্রোপিলিন ১৮ শতাংশসহ সাত ধরনের পলিমারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নমুনায় নদীর তলদেশের ১০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার গভীরতায়ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ভারী ধাতুর বিষক্রিয়া, মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাশাপাশি নদীর তলদেশে ক্রোমিয়াম, নিকেল, কপার, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের উচ্চমাত্রা ধরা পড়েছে। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে। এর ফলে বিষাক্ত ভারী ধাতুগুলো মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, যা ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগের কারণ হতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক প্রোনেটসিয়াল রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্স (পিইআরআই) অনুযায়ী, এই দুই নদীর পলিতে দূষণের মাত্রা ‘অত্যন্ত উচ্চ’ ক্লাস-ভি পর্যায়ের। ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের আধিক্য নদী দুটির জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য এবং সরাসরি নর্দমার সংযোগ নদীর স্বাস্থ্যকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নদী দুটির স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

পূর্ব রূপসাপারের মৎস্যজীবী মো. জাবেদ। দুই দশকের বেশি সময় ধরে রূপসা ও ভৈরব নদীতে মাছ শিকার করেন। তিনি বলেন, দিন দিন নদীর মাছ কমছে। পানি ভালো না। আগে জাল নিয়ে নদীতে গেলে মাছ পেতাম। এখন আর সেই অবস্থা নেই। বেঁচে থাকাই কষ্ট।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মো. মুজিবুর রহমান নদীর তলদেশে সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ধাতুর উপস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ভৈরব-রূপসাসহ আশপাশের নদীতে প্রতিনিয়ত শিল্প-কারখানার বর্জ্যসহ শহরের বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য বাধাহীন পড়ছে। এসব নদীর প্রবাহ সরাসরি সুন্দরবনের সঙ্গে যুক্ত। জোয়ার-ভাটার কারণে এই দূষিত পলি ও কণাগুলো ম্যানগ্রোভ বনের গভীরে পৌঁছে যাচ্ছে, যা আমাদের সুন্দরবনের পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র ও ভারসাম্যকে বিপদাপন্ন করে তুলছে।

এ অবস্থা থেকে সুন্দরবন, উপকূলীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ জরুরি বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদীর দূষণমুক্ত প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে আমাদের বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।