তাঁর বিরুদ্ধে হাসপাতালের টিকিট বিক্রি নিয়ে বাণিজ্য করার অভিযোগ রয়েছে। আরো অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কর্মচারী নিয়োগে কারসাজি, কেবিন বাণিজ্য, কমিশন আদায়, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায়, কমিশন না দেওয়ায় ঠিকাদারের বিল আটকে রাখা, রোগীদের খাবার থেকে বিশেষ খাবার দিতে ঠিকাদারকে বাধ্য করা, প্রশিক্ষণার্থী ও টিকা মাঠকর্মীদের ভাতা আত্মসাৎ।
একের পর এক এত অভিযোগের পাহাড় যাঁর বিরুদ্ধে খাড়া, তিনি কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচও) ডা. মহিবুস সালাম খান। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর ব্যাপক দুর্নীতির কারণে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যসেবার এখন রুগ্ণ দশা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডা. মহিবুস সালাম খান ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দেন। এরপর নানা কৌশলে হাসপাতালের অর্থ লুটপাটের সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি। একের পর এক চালিয়ে যেতে থাকেন দুর্নীতি।
ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে একজন ঠিকাদারের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে। এই অডিও রেকর্ড সূত্রে জানা গেছে, বহির্বিভাগের রোগীদের টিকিট থেকে প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার এবং জরুরি বিভাগ থেকে ১০ হাজার টাকা বাড়তি আদায় করে নেন ডা. মহিবুস সালাম খান। হাসপাতালের কেনাকাটায়ও রয়েছে ওই স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অনিয়ম ও দুর্নীতি।
মেসার্স স্বাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. সুমন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, “হাসপাতালে অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মহিবুস সালাম। তাঁকে বিলের ১৫ শতাংশ কমিশন দিতে রাজি না হওয়ায় আমার ৩০ লাখ টাকার বিল চার মাস ধরে আটকে রেখেছেন।
হাসপাতালের একাধিক কর্মচারী বলেন, সরকারি ওষুধ থাকার পরও সংকট দেখিয়ে রোগীদের দেওয়া হয় না। একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তা বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তির তদবির ছাড়া সরকারি অ্যাম্বুলেন্স জোটে না রোগীদের। সিন্ডিকেটের কারণে যন্ত্রাংশ নষ্টের অজুহাতে রোগীদের অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয় না। পরে স্বজনরা উচ্চ মূল্যে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে গুরুতর রোগীদের কুমিল্লা বা ঢাকায় নিতে বাধ্য হয়।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি সূত্রের অভিযোগ, খাদ্য, ধোপা ও স্টেশনারি খাতে ঠিকাদারদের বিল থেকে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ‘কমিশন’ নেন এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। আশানুরূপ কমিশন না পেলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিল আটকে রেখে চাপ সৃষ্টি করেন।
অভিযোগ উঠেছে, সাবসেন্টারে কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারীদের কাছ থেকেও নিয়মিত টাকা নিয়ে তাঁদের জরুরি বিভাগে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তাঁর সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন মেডিক্যাল অফিসার ডা. ইয়াহিয়া, ডা. সাইফুল ইসলাম শুভ, আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) মো. কবির হোসেন এবং সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার মো. মাইনুল ইসলাম। অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে, প্রতিদিন রোগীদের বরাদ্দ করা খাবার থেকে ওই স্বাস্থ্য কর্মকর্তার জন্য আলাদা করে সকালের নাশতা, দুধ, ডিম, ফলমূলসহ তিন বেলার খাবার তৈরিতে বাধ্য করা হয় ঠিকাদারকে। এতে প্রতিদিন তাঁর পেছনে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, যা রোগীদের প্রাপ্য খাদ্য থেকে কেটে নেন ঠিকাদার। এসব খাবার হাসপাতালের বাবুর্চি দিয়ে বিশেষভাবে রান্না করে তাঁর কোয়ার্টারে পাঠাতে হয়।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের ভাষ্য, প্রতিদিন সকালের নাশতায় আধালিটার দুধ, দুটি হাঁসের ডিম, দুটি কলা, পাউরুটি এবং দুুপুর ও রাতে মাছ, মাংস, সবজি, ডাল, দই দিতে হয়। এসব রোগীর নিয়মিত পথ্য হিসেবে বরাদ্দ খাবার থেকে দিতে হয়।
এদিকে জরুরি বিভাগের কিছু কর্মীর অভিযোগ রয়েছে, জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের জোরপূর্বক স্বাস্থ্য কর্মকর্তার আবাসিক কক্ষে পাঠানো হয়। সেখানে প্রতিটি রোগীর কাছ থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা করে ভিজিট নেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মহিবুস সালাম। ভুক্তভোগীদের এসংক্রান্ত একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
দেবীদ্বার সদর এলাকার বেসরকারি হাসপাতালের একাধিক মালিক বলেন, হাসপাতালে চাপ প্রয়োগ করে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫টি অ্যানেসথেসিয়া তাঁকে দিয়ে করাতে বাধ্য করা হয়। অন্যথা ঘটলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়ে নোটিশ পাঠান তিনি। তাঁর এই কাজের সহযোগী ডা. সাইফুল ইসলাম শুভ।
তাঁর আগের কর্মস্থল নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুসন্ধান চালায় কালের কণ্ঠ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডা. মহিবুস সালাম খান ২০২৩ সালে সেখানে টিএইচওর দায়িত্বে ছিলেন। ওই বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে এলাকাবাসী বিক্ষোভ ও ঝাড়ু মিছিল করে, যার কয়েকটি ছবি কালের কণ্ঠের এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেবীদ্বার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন কর্মকর্তা বলেন, ডা. মহিবুস সালাম খান হাসপাতালের এমন কোনো খাত নেই, যেখান থেকে টাকা হাতিয়ে নেন না। সম্প্রতি বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের টাইফয়েডের টিকা প্রদানকালে তিনি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে করে যাতায়াত করেন। এতে অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে ১৫ থেকে ২০ দিন দুর্ভোগ পোহায় সাধারণ রোগীরা। সরকারি গাড়ি থাকার পরও তা ব্যবহার না করে যাতায়াতের বিল করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
দেবীদ্বার উপজেলার রাজামেহার গ্রামের মো. মহিবুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মহিবুস সালাম খান, আরএমও ডা. কবির ও ডা. সাইফুল ইসলাম শুভ—এই তিনজনের সিন্ডিকেট আমার প্রতিপক্ষকে একটি ভুয়া মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দেয়। এ বিষয়ে আমি কুমিল্লা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিই। পরে এ ব্যাপারে তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া সার্টিফিকেট প্রদানের সত্যতা উঠে আসে। এটা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি বরাবর পাঠানো হয়েছে। এই তিন সদস্যের সিন্ডিকেট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িত।’
দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচও) ডা. মহিবুুস সালাম খানের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কোনো লুটপাট করিনি। আমি সরকারি দায়িত্ব পালন করি। জরুরি বিভাগের কোনো রোগী আমি দেখি না। এটা মিথ্যা কথা। আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান।’
কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথমত, সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধের কোনো সংকট নেই। তিনি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী খাবার টেস্ট করতে যতটুকু খাবার প্রয়োজন, তা নিতে পারেন। তিনি যদি জোর করে খাবার নেন, তাহলে তো হবে না। কোনো ঠিকাদারের বিল আটকে রাখা হয়েছে কি না, এ বিষয়ে কেউ আমাকে এ পর্যন্ত লিখিতভাবে জানায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
এ বিষয়ে দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০ শতাংশ কমিশন না দেওয়ায় বিল আটকে রাখা, মেডিসিন সরবরাহে অনিয়ম, নিয়োগপ্রক্রিয়াসহ কয়েকটি অভিযোগ আমার কাছে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে আমি তাঁর কাছে জানতে চেয়েছি। এ বিষয়গুলো আমার নজরে আছে।’