সামাজিক অস্থিরতার কারণে দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনে পদে পদে বাধা পাচ্ছে পুলিশ। এমনকি অভিযানে গিয়ে হামলার শিকারও হচ্ছে। গত চার মাসে এ ধরনের হামলার ঘটনায় দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
চলতি পুলিশ সপ্তাহে এসব সমস্যার কথা তুলে ধরে সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে গত রবিবার রাজারবাগ পুলিশ মিলনায়তনে ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কল্যাণ প্যারেডে’ এসব বিষয়ে দাবি উত্থাপন করা হয়।
গতকাল পর্যন্ত একাধিক অনুষ্ঠানে পুলিশের নানা সংকটের বিষয়ে দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণ। অন্যান্য দাবির মধ্যে বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনীর মতো পুলিশের জন্যও আলাদা বেতন কাঠামো চাওয়া হয়েছে।
এসব অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), অতিরিক্ত আইজিপিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার সদস্যদের অবসরের আগে সেনাবাহিনীর আদলে অন্তত একটি সম্মানসূচক পদোন্নতি প্রদান করার আরজি জানিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, থানা, ব্যারাক ও ফাঁড়ি নির্মাণের জন্য বন্ধ থাকা উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আবার চালু করার দাবি তুলেছেন তাঁরা।
গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ‘হেলথ কার্ড’ চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট) আহম্মদ মুঈদ বলেন, পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন, সন্ত্রাসীদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হন এবং ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা প্রায়ই আহত হন। তাঁদের দ্রুত রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে আনার জন্য যে সাপোর্ট দরকার, তার ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালে দক্ষ চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি থাকার কারণে চিকিৎসাসেবা বিঘ্নিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রাইভেট হাসপাতাল ও বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু পুলিশে যাঁরা অল্প বেতনে চাকরি করেন, তাঁদের পক্ষে খরচ বহন করা কঠিন।
অতিরিক্ত ডিআইজি আহম্মদ মুঈদ বলেন, প্রায় দুই লাখ পুলিশ সদস্য ও পরিবারের ১০ লাখ সদস্য রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল ও বিভাগীয় শহরে চিকিৎসা নেন। প্রতিদিন রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে দুই থেকে তিন হাজার রোগী সেবা নেন। রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালটি ৫০০ শয্যা হলেও অর্ধেক সাপোর্ট দিতে হয় জনবলের অভাবে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই পুলিশ সদস্যদের জন্য হেলথ কার্ড চালু হোক। এই কার্ডের মধ্য দিয়ে প্রতিটি পুলিশ সদস্য যেন মেডিক্যাল সাপোর্ট পান। আইজিপি এটার উদ্যোগ নিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই।’
কনস্টেবলদের ব্যারাক ঘাটতির কথা উল্লেখ করে আহম্মদ মুঈদ বলেন, রাজারবাগে সাড়ে চার হাজার সিটের বিপরীতে পাঁচ হাজার পুলিশ সদস্য রাত যাপন করেন। কেউ বেড পান, কেউ পান না। নতুন ভবনের চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে সিটের ঘাটতি পূরণ হবে।
পুলিশ ঘুষ খায়—এমন কথা প্রচলিত আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে সত্য। তবে পুলিশ সদস্যদের বেসিক চাহিদা পূরণ করা গেলে বদনাম থাকবে না। পুলিশের চাহিদা হলো বাচ্চা ভালো স্কুলে পড়বে এবং ভালো একটি বাসায় থাকার ব্যবস্থা। প্রতিটি জেলায় পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের জন্য ভালো স্কুল নির্মাণ এবং কোয়ার্টারগুলো উন্নত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর আগে অনুষ্ঠানের প্রথম দিন কল্যাণ প্যারেড শেষে পুলিশ সদর দপ্তরের আরেক কর্মকর্তা বলেন, দেশের মানুষের জন্য পুলিশ সবচেয়ে বেশি সময় সেবা দিয়ে থাকে। তাই দীর্ঘদিনের এই যৌক্তিক দাবিগুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হয়েছে।
কল্যাণ প্যারেডে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) এক নারী কনস্টেবল চাকরিজীবনের শেষ দিকে অনারারি পদোন্নতির দাবি জানান। তিনি বলেন, অনেক পুলিশ সদস্য কনস্টেবল বা একই পদে দীর্ঘদিন চাকরি করে অবসরে যান। সেনাবাহিনীর মতো অবসরের আগে অন্তত একটি সম্মানসূচক পদোন্নতি দিলে সদস্যদের মধ্যে প্রেরণা বাড়বে। এতে সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক চাপও পড়বে না।
কল্যাণ প্যারেডে অংশ নেওয়া একজন ডিআইজি বলেন, পুলিশ মেস, রান্নাঘর, থানার ভবন, ব্যারাক, ফাঁড়ি ও অন্যান্য অপারেশনাল ইউনিটের নতুন অবকাঠামো নির্মাণে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এই বরাদ্দ আবার চালু করার দাবিও জানানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, সাইবার অপরাধ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে স্বতন্ত্র এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে স্বয়ংসম্পূর্ণ সাইবার ইউনিট প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তাদের যাতায়াত ও তদন্ত ব্যয় বেড়েছে। এসআইদের যাতায়াত সুবিধার জন্য মোটরসাইকেল কেনার লোন ও জ্বালানি খরচ দেওয়া হলে তদন্তে গতি বাড়বে। পুলিশের কর্মঘণ্টার কোনো নিশ্চয়তা নেই, তাই ওভারটাইম ভাতার দাবি জানানো হয়েছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সদস্যদের উত্থাপিত দাবিদাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন এবং সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক ও জনকল্যাণমুখী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণ করা হবে। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের জন্য বিশেষ নীতিমালার আওতায় ওভারটাইম ভাতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার।
তিনি বলেন, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের ভবন বা কার্যালয় নির্মাণ ও আবাসন সমস্যা দূরীকরণে বর্তমান সরকার আন্তরিক। এ ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণসহ প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত চার মাসে হামলায় দেশে দুই শতাধিক পুলিশ আহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা হয় ২১৩টি মামলা। অন্যদিকে দেখা গেছে, এসব হামলায় দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন, গড়ে প্রতি মাসে যা ৫৩ জনের বেশি। পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধমূলক পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এই তথ্য পাওয়া গেছে। পরিসংখ্যানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত জানুয়ারি মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ৪২টি মামলা করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতেও মামলার সংখ্যা ৪২। মার্চে ৬৩টি এবং এপ্রিলে ৬৬টি মামলা করা হয়েছে।
সর্বশেষ গত এপ্রিল মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ মাসে ঢাকা রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি ২২টি মামলা হয়েছে। ময়মনসিংহ রেঞ্জে হয়েছে ছয়টি, খুলনা রেঞ্জে পাঁচটি, রংপুর রেঞ্জে সাতটি।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ক্রাইম মেট্রো) আশরাফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশ সব সময় দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হঠাৎ হামলার শিকার হচ্ছে পুলিশ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অপরাধ দমনে পুলিশের প্রত্যেক সদস্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। গতকাল দুপুরে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে আইজি’জ ব্যাজ, শিল্ড প্যারেড, অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।