সারা দেশের সড়ক ও ফুটপাতে গড়ে উঠেছে হকারকেন্দ্রিক ব্যবসা ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। প্রতিটি নগরীর সিন্ডিকেট সদস্যরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে, সড়কে এবং দোকানের সামনে হকার বসিয়ে চাঁদাবাজি করে তারা। সড়ক ও ফুটপাতের এসব হকারের কাছ থেকে দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি করছে এ চক্রটি। বিশাল এই অর্থ ‘লাইনম্যান’ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও প্রশাসনের এক শ্রেণির অসাধু কর্তাদের পকেটে গেলে সরকারি কোষাগারে যাচ্ছে না এক পয়সাও। হকারকেও দিতে হচ্ছে না কোনো ধরনের ভ্যাট বা ট্যাক্স। তবে হকাররা যেসব মার্কেটের সামনে ব্যবসা করছে তার প্রতিটি দোকান মালিককে ব্যবসা করতে হয় ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে। এমনকি সড়ক দিয়ে চলাচলকারী পরিবহনও দিচ্ছে যথাযথ কর। কিন্তু সবকিছুর বাইরে থাকছে ওই হকাররা। বিশ্লেষকরা বলছেন, হকারদের লাইসেন্সের আওতায় না আনায় তারা বিশৃঙ্খল। এসব হকারকে ট্যাক্সের আওতায় আনলে শৃঙ্খলার পাশাপাশি সরকারের রাজস্বের আওতা বাড়বে।
জানতে চাইল বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন যে চাঁদা আদায় হয়, তা একটি সমান্তরাল অর্থনীতি তৈরি করছে। এই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে না গিয়ে একটি অস্বচ্ছ চক্রের হাতে যাচ্ছে। ফলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা ওই অনিয়ন্ত্রিত হকার ব্যবস্থা এখন কেবল শৃঙ্খলার নয়, একটি বড় অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, হকারদের আয় অর্থনীতির অংশ হলেও তারা ভ্যাট-ট্যাক্সের বাইরে থাকায় বছরে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে দেশ, যা উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা যেত। তিনি বলেন, তাদের উচ্ছেদ না করে বরং লাইসেন্সিং, নির্দিষ্ট স্থান ও স্বল্প করের মাধ্যমে হকারদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে আনা জরুরি। এতে রাজস্ব বাড়বে, শৃঙ্খলাও ফিরবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইন না মানার সংস্কৃতি আর কোনো দেশে নেই। একমাত্র বাংলাদেশে আছে। যে যেখানে পারছে রাস্তার মধ্যে দোকান খুলছে। আর একটি বিশেষ গোষ্ঠী তাদের থেকে নিয়মিত সুবিধা নিচ্ছে। দোকানে ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা সরকারকে কর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু হকাররা সেটা দেয় ওই বিশেষ গোষ্ঠীকে। এতে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আসলে কোনো সরকারই হকারদের নিয়ে কাজ করেনি। দু-একজন কাজ করতে চাইলেও তাদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই হকারদের একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা হোক।
রাজধানীতে শত কোটির চাঁদাবাজি : শুধু গুলিস্তানে মাসে ২০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি : রাজধানীর গুলিস্তান এলাকা অর্থাৎ শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউ, বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট, মওলানা ভাসানী জাতীয় হকি স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের সড়ক, গুলিস্তান সার্ক ফোয়ারা থেকে হযরত গোলাপ শাহ মাজার, সেখান থেকে ঢাকা ট্রেড সেন্টার, সার্ক ফোয়ারা থেকে হানিফ ফ্লাইওভার, আওয়ামী লীগ অফিস কার্যালয়ের সামনের সড়কসহ ভিতরের অলিগলিতে ২৫-৩০ হাজার হকার রয়েছে। এর মধ্যে কাপড়, ফল, খাবারসহ বিভিন্ন আইটেমের দোকান রয়েছে। এসব দোকানের ছোট বড় সাইজ রয়েছে। এসব দোকান থেকে দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা উঠায় লাইনম্যানখ্যাত একটি শক্তিশালী চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক ৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত টাকা উঠানো হয়। এ ছাড়া কিছু দোকান থেকে মাসিক ভিত্তিতে ৫-১০ হাজার পর্যন্ত টাকা আদায় করছে তারা।
চাঁদাবাজ-লাইনম্যান কারা : জানা যায়, শুধু গুলিস্তান এলাকায় ২০ জন লাইনম্যানখ্যাত চাঁদাবাজ রয়েছে। লাইনম্যানখ্যাত এসব চাঁদাবাজের মধ্যে লাইনম্যান নবী রাজধানী হোটেল ও বেল্টের গলি নিয়ন্ত্রণ করে। গুলিস্তান সিনেমা হলের সামনের ফুটপাত ও রাস্তা নিয়ন্ত্রণ করছে হারুন। এ ছাড়া গুলিস্তান বিল্ডিং থেকে ট্রেড সেন্টার পর্যন্ত রজ্জব, লম্বা বাবুল, সেলিম, বিমল, বাচ্চু, খোরশেদ, নিপু, মোহাম্মদ আলী। উসমানী উদ্যান পূর্ব এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করছে শাহজাহান। খদ্দর মার্কেটের সামনের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে কাদির। স্টেডিয়ামের দক্ষিণ গেট নিয়ন্ত্রণ করে খলিল ও পুটন। জাসদের অফিসের সামনের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে রহিম। কমিউনিস্ট পার্টি অফিসের সামনের এলাকার দায়িত্বে রয়েছে কালা নুরু। বেল্টের গলি থেকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ সড়ক ও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করছে আকতার ও জাহাঙ্গীর। জিপিও এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে সালাম (দাড়িওয়ালা)। ফুলবাড়িয়া ও বাস টার্মিনাল এলাকার একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ আলী। রমনা ভবন ও ভাসানী স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে আলী মিয়া। এসব লাইনম্যানকে নিয়ন্ত্রণ করছে হকার্স সংগঠন ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। এই চিত্র শুধু গুলিস্তানে নয়, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড, কাঁচপুর, পল্টন, নিউমার্কেট, মিরপুর, উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার হকারের কাছ থেকে একই পন্থায় চলে চাঁদাবাজি। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী হকারদের কাছ থেকে প্রতিমাসে শতকোটি টাকার বেশি চাঁদা বাণিজ্য হয়।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায় : নগরীর ৭১ শতাংশ সড়ক হকারদের দখলে- নগরের ফুটপাতগুলো স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিক, ছাত্রনেতা, স্থানীয় চাঁদাবাজরা এলাকা ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ করে এবং চাঁদা আদায় করে। এর মধ্যে নতুন ব্রিজ এলাকায় লেদু, নিউমার্কেট এলাকায় মামুন, স্টেশন রোড এলাকায় কিবরিয়া, বহদ্দার হাট এলাকায় ফয়সাল এবং আন্দরকিল্লা এলাকায় ইয়াসিনের নামে নিয়মিত চাঁদা আদায় হয়। তবে এসব বিষয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভয়ে মুখ খোলেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নতুন ব্রিজ এলাকার ভাসমান ব্যবসায়ী বলেন, এখানে বিভিন্নভাবে দৈনিক ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। বিভিন্ন গ্রুপ এসে টাকা নিয়ে যায়। টাকা না দিলে বসতে দেয় না।
চসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চৈতী সর্ববিদ্যা বলেন, নগরের অবৈধ ফুটপাত নিয়ে আমরা নিয়মিতই অভিযান পরিচালনা করে থাকি। প্রতি মাসে অন্তত আমার বিভাগ থেকে ১০ থেকে ১৫টি পর্যন্ত এবং সব মিলে প্রায় ২৫-৩০টি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। আমরা চাই, পথচারীর ফুটপাত পথচারীদেরই থাকুক। সিডিএর প্রিপারেশন অব চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২০-২০৪১) প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত জরিপের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নগরের ৯৭ শতাংশ রাস্তার একাংশ দখলে।
৬৪ শতাংশ রাস্তায় পথচারী পারাপারের কোনো ব্যবস্থা নেই। জরিপকৃত সড়কের ৮৩ শতাংশ এলাকায় ফুটপাত আছে। ৭১ শতাংশ ফুটপাত সম্পূর্ণ বা আংশিক বেদখল। ৬৮ শতাংশ ফুটপাতে হাঁটার উপযোগিতা নেই। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই মূল সড়কে নেমে হাঁটতে হচ্ছে।
গাজীপুর প্রতিনিধি : শিল্পসমৃদ্ধ গাজীপুরে দেশের প্রায় সব জেলার লোকজন এখানকার গার্মেন্ট ও শিল্প-কারখানায় চাকরি করেন। অধিক মানুষ বসবাসের কারণে হকাররা বিভিন্ন পণ্য সড়ক-মহাসড়কের পাশে বসে বিক্রি করেন। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা, সাইনবোর্ড, বোর্ডবাজার, বড়বাড়ী, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈরের সফিপুর বাজার ও শহরের জয়দেবপুর রেলক্রসিং এলাকায় সড়ক-মহাসড়কের পাশে ফুটপাতে হকাররা বসে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এখান থেকে চাঁদা উঠান।
রাজশাহী নিজস্ব প্রতিবেদক জানায়, রাজশাহী মহানগরীর আলুপট্টি থেকে রাজশাহী কলেজ, রেলগেট থেকে গণকপাড়া, লক্ষ্মীপুর থেকে রেলগেট, শিরোইল, ভদ্রা, তালাইমারী, কাজলা, বিনোদপুর, কোর্ট স্টেশন, শালবাগান, নওদাপাড়া এলাকার অধিকাংশ ফুটপাত হকারদের দখলে। অনেক জায়গায় ফুটপাতগুলো কার্যত অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক স্থানে পরিণত হয়েছে। এসব দোকান থেকে স্থানীয় চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট দৈনিক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে।
জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, মানবিক বিবেচনায় কিছু এলাকায় নির্ধারিত সময় পর্যন্ত দোকান বসানোর অনুমতি দেওয়া আছে। তবে টোলের নামে কেউ বাড়তি টাকা আদায় করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো হয়।
অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। রংপুর নিজস্ব প্রতিবেদক জানায়, রংপুর নগরীর শাপলা চত্বর থেকে কাচারি বাজার পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশের ফুটপাতের বেশির ভাগই অবৈধ দখলদারদের দখলে। নগরীর জাহাজকোম্পানির মোড় থেকে কাচারি বাজার পর্যন্ত ফুটপাতে জমজমাট ব্যবসা হয়। এই স্থানে শতাধিক হকার। এদের কাছ থেকে প্রতিমাসে ভাড়ার নাম করে প্রায় ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রভাবশালী মহল।