রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ার আ. রহিম (৩০) নামে এক যুবক ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। গত ২রা মে রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্ত এলাকায় ড্রোন হামলায় রহিমের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া একই ঘটনায় আরও এক বাংলাদেশি ও এক নাইজেরিয়ান যুবকের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর খবরে রহিমের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। নিহত রহিম জেলার ফুলবাড়ীয়া উপজেলার পুটিজানা নামাপাড়া গ্রামের আজিজুল হকের ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে রহিম ছিলেন বড় ও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। রহিম রাশিয়ার ভাড়াটে যুদ্ধা হয়ে যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন বলে জানা যায়। রহিমের বাবা আজিজুল হক পুটিজানা ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সহ-সভাপতি। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য মোছা. আফরোজা আক্তার রহিমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, নামটা শুনেই আমার কলিজাটা কেঁপে ওঠে।
কারণ রহিম আমার আত্মীয় হয়। আমরা চাই সরকার যেন দ্রুত রহিমের মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করে। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে গত বছরের অক্টোবর মাসে রাশিয়ায় যান রহিম। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ধারণা করেছিলেন, তিনি সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। পরে জানতে পারেন চলতি বছরের ৭ই এপ্রিল তিনি রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বিষয়টি তিনি পরিবারের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন বলে দাবি স্বজনদের। গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে রহিমের বন্ধু লিমন দত্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেসেঞ্জারের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের রহিমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
লিমন নিজেও একই ক্যাম্পে রুশ সেনা সদস্য হিসেবে কর্মরত ছিলেন। হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়ে একটি পা হারিয়েছেন এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। স্থানীয়রা জানায়, পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন রহিম। কিন্তু তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতের মা রমিচা খাতুন বলেন, সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে বিদেশ গিয়েছিল রহিম। সেই-ই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সংসারে শান্তি ফেরাতে গিয়ে নিজেই যুদ্ধের ময়দানে মারা গেল। তোমরা আমার ছেলেকে এনে দাও, আমার কলিজার টুকরা ছেলেটারে একবার দেখি। এসব কথা বলেই মূর্ছা যান তিনি। নিহতের বাবা আজিজুল হক বলেন, রহিম এপ্রিল মাসে রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগদান করে এক মাস ট্রেনিং করে। এক মাস ট্রেনিং শেষে মে মাসের ১ তারিখে যুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধে যোগ দেয়ার পরদিন ২রা মে ড্রোন হামলায় নিহত হয়।
তিনি বলেন- রহিম আমাদের কাছে সেখানের সেনাবাহিনীতে যোগদানের বিষয়টি গোপন করেছিল। জানলে কখনোই তাকে সেখানে যেতে দিতাম না। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমার ছেলেকে আর ফিরে পাবো না। তার মরদেহটা যেন সরকার দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করে দেয় সেই দাবি জানান তিনি। নিহতের চাচা সিরাজুল ইসলাম বলেন, রহিমের বাকি দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন মেডিকেল ডিপ্লোমা কলেজে পড়ালেখা করছে। আরেকজন মাদ্রাসায় পড়ে। রহিম তার বাবার জমি বিক্রি ও ঋণ করে রাশিয়া গিয়েছিল সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে। তিনি আরও বলেন, রাশিয়া গিয়ে শুধু আমার ভাতিজা মারা গেছে, এমনটা নয়। আরও বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি যুবক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে গিয়ে মারা গেছে। আমরা চাই যত বাংলাদেশি রাশিয়ায় আছে, সকলকে সরকার ফেরত আনার ব্যবস্থা করুক। পুটিজানা ইউপি সদস্য আমিনুল ইসলাম হিরা বলেন, ঘটনাটি মর্মান্তিক ও দুঃখজনক।
আমি নিহতের পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছি। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতার সুযোগ থাকলে তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবো। ফুলবাড়ীয়া থানার ওসি মো. রাশেদুল হাসান বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো মেসেজ পাইনি।
আমাদের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে র্স্বোচ্চ সহায়তা করা হবে। এদিকে বিদেশের মাটিতে যুদ্ধের ঘটনায় একের পর এক বাংলাদেশি নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়া তরুণদের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ সেনাবাহিনীর পক্ষে লড়াইরত অবস্থায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহের দুই যুবকের মৃত্যু হয়। একই হামলায় আরও একজন বাংলাদেশি আহত হয় এবং একজন নাইজেরিয়ান নাগরিক নিহত হয়।