প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক। শিক্ষার এই পুরো স্তর জুড়ে গাইড বইয়ের প্রাধান্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাঠ্য বইয়ের চেয়ে গাইডকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষা পাসের সহজ ও সংক্ষিপ্ত পথ বাতলে দেয়া এই গাইডের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণের মূল লক্ষ্যই ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্লেষণ, চিন্তা ও উদ্ভাবনী শক্তি অর্জন করতে পারছেন না অনেক শিক্ষার্থী। আর পরীক্ষা পাসের ‘সহায়ক’ এই গাইড বই ঘিরে তৈরি হয়েছে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য চক্র। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক থেকে শুরু করে প্রকাশনী থেকে বইয়ের দোকান পর্যন্ত এই চক্র জড়িত। কোচিংয়ের মতো এই গাইড বইও সর্বনাশ ডেকে আনছে শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের।
সময় নেই রিমন হাসানের। স্কুলের আগে টিউশনি, স্কুল শেষে দুটো কোচিং করে বাড়ি যেতে হয়। স্কুল ড্রেসে সারাদিন পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হলে গাইড ছাড়া উপায় নেই-এমন এক ধারণা তৈরি হয়েছে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিমন হোসেনের। কেন গাইডে নির্ভর করতে হচ্ছে- এমন প্রশ্নে সে বলে, পাঠ্য বইয়ে যা আছে তা দিয়ে হয় না। গাইডে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সাজেশন আর উত্তর লেখার ধরন থাকে। এটা দিয়ে সহজে পরীক্ষায় পাস করা যায়।
রাজধানীর আগারগাঁও ৬০ ফিট সড়ক এলাকার একটি কোচিং সেন্টারে দেখা যায়, একজন শিক্ষক সরাসরি একটি নির্দিষ্ট প্রকাশনীর গাইড অনুসরণ করে ক্লাস নিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের হাতেও এই গাইড বই। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবিনা আক্তার বলে, স্কুলে সবকিছু বুঝতে পারি না। সবকিছু পড়ানোও হয় না। গাইডে সহজ করে দেয়া থাকে, তাই পড়তে সুবিধা হয়। শুধু কোচিং নয়, অনেক অভিভাবকও এখন গাইড বইকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অপরিহার্য মনে করছেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রেয়সী জান্নাতের মা বলেন, আমরা বই পাওয়ার আগেই গাইড কিনেছি। সবাই গাইড পড়ে। আমার মেয়ে না পড়লে পিছিয়ে যাবে।
সরজমিন রাজধানীর মিরপুর-১০ ও নিউমার্কেট এলাকার কয়েকটি বইয়ের দোকান ঘুরে দেখা যায়, বছরের মাঝে এসেও দোকানের সামনের সারিতে সাজানো বিভিন্ন প্রকাশনীর রঙিন গাইড। আবার কোথাও, ‘ফাইনাল সাজেশন’, ‘১০০% কমন’, ‘একের ভেতর সব’ লেখা পোস্টার ঝুলতে দেখা যায়। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর জন্য একটি নির্ধারিত প্রকাশনীর শুধু বিজ্ঞানের গাইড খুঁজছিলেন একজন অভিভাবক। কিন্তু কোনো দোকানই সিঙ্গেল বই বিক্রি করতে রাজি হয়নি।
১২০০ টাকায় পুরো বইয়ের সেট ছাড়া বিক্রি সম্ভব নয় বলে জানান বিক্রেতারা। মিরপুর-১০ নম্বরের একটি দোকানে বিক্রি করতে রাজি হলেও ১০০ টাকা বেশি চাওয়া হয় গায়ে লেখা মূল্যের চেয়ে। নীলক্ষেত এলাকার বইয়ের দোকানেও একই চিত্র দেখা যায়। কেন সিঙ্গেল বই বিক্রি করা যাবে না, জানতে চাইলে মিলন নামে এক বিক্রেতা বলেন, ডিস্ট্রিবিউটর সিঙ্গেল বই দেয় না। সেটের কিছু বই থেকে যায় যা বিক্রি করা যায় না। প্রকাশনীই আমাদের এভাবে বিক্রি করতে বাধ্য করছে।
ঢাকার একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক মাহবুব আলম বলেন, অনেক শিক্ষার্থী এখন পাঠ্য বই খোলেই না। তারা শুধু গাইডের উত্তর মুখস্থ করতে চায়। এতে বিশ্লেষণী দক্ষতা কমে যাচ্ছে। তবে এর জন্য শিক্ষকরা যেমন দায়ী তেমন অভিভাবকরাও দায়ী। শিক্ষার্থীদের গাইড বই প্রেসক্রাইব করার মাধ্যমে শিক্ষকরা ক্ষেত্রবিশেষে ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমিশনসহ নানা উপহার পান। কারা এই কমিশন দেয়, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডিস্ট্রিবিউটররা।
শুধু ঢাকা নয়, গোটা দেশেই একই অবস্থা। গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া জানায়, স্কুলে শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নিতে পারেন না। তাই তারা একটি নির্দিষ্ট গাইড বই ধরে পড়াশোনা করে। সে বলে, স্যাররাও বলে দেন এই বই থেকে পড়লে কমন পাওয়া যাবে। স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ি আমরা, স্যারও গাইড দিয়েই পড়ায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ডিস্ট্রিবিউটর জানান, কিছু স্কুল ও কোচিংয়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট গাইড বই নিয়ে অলিখিত চুক্তি থাকে। এতে শিক্ষার্থীদের সেই গাইড বই কিনতে বলা হয়।
শিক্ষা গবেষক ড. ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির উদ্দেশ্য ছিল মুখস্থ কমানো। কিন্তু বাজারে সৃজনশীল গাইড ছড়িয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীরা এখন নির্দিষ্ট উত্তর কাঠামো মুখস্থ করছে। গাইড বইয়ের বিপক্ষে কঠোর তো হতেই হবে তার আগে অভিভাবকদেরও বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান অবস্থা এতটাই খারাপ যে, ‘জার্নি বাই বোট’ রচনা লিখতে দিলে সবাই এক নদীতেই যায়। একটা গবেষণা প্রবন্ধে দেখেছিলাম, ‘জার্নি বাই বোট’ রচনায় একটা ক্লাসের সবাই মেঘনা নদীতে ঘুরতে গিয়েছিল। আবার সবারই নদীতে থাকা অবস্থায় বিকাল হয়েছিল। কেউ সকালে বা দুপুরে ভ্রমণ করে নাই। তার থেকেও মজার বিষয় হচ্ছে, সেই স্কুল থেকে মেঘনা নদী প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে। আর স্কুল থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আত্রাই নদী। অনেকে এই নদী পার হয়ে নৌকাতেই স্কুলে আসে। কিন্তু কেউ পরীক্ষার খাতায় তা উল্লেখ করেনি। তিনি যোগ করেন, এই গাইড বই শিক্ষার্থীদের প্রাসঙ্গিক করে তোলা হয়েছে যে, শিক্ষার্থীরা চিন্তা করাও ভুলে গেছে।
সৃজনশীল মেধা বিকাশ নিশ্চিত করতে ২০০৮ সালে হাইকোর্ট বিভাগের এক আদেশে নোট বইয়ের পাশাপাশি গাইডও নিষিদ্ধ করা হয়। আইনে রয়েছে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। কিন্তু এই আইনের পর গাইড বই খোলস পাল্টানো শুরু করে। তারা গাইড বইয়ের নতুন নাম দেয় সহায়ক বই। এখন এই মোড়কেই চলছে সেই আগের গাইড বইয়ের রমরমা বাণিজ্য।
এবিষয়ে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীরা যদি গাইড বই পড়বে, কোচিং সেন্টারেই যাবে, তাহলে স্কুলের দরকার কী? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো হয়েছে সেখানে গাইডকে অপরিহার্য করা হয়েছে। এখানে ভালো রেজাল্ট না করলে অভিভাবকদের মান-সম্মান থাকে না। এই যে অশুভ প্রতিযোগিতা এটার বিরুদ্ধে একটা সামাজিক লড়াই প্রয়োজন। গাইড বই যাতে পড়ালেখার অংশই না হয় তা সকলের অনুধাবন করতে হবে। যতদিন অনুধাবন করা যাবে না, কড়া শাসন থাকবে না- গাইড বই বন্ধ হবে না। কারণ এটা কোটি কোটি টাকার ব্যবসা।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় সহায়ক বই সারা বিশ্বেই প্রচলিত। বাংলাদেশেও তা চলতে বাধা নেই। তবে সহায়ক বইয়ের আড়ালে নোট-গাইডের প্রচলন আর চলবে না। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট নোট বা গাইড বই পড়তে বাধ্য করতে পারবেন না। বরং শিক্ষকদের মানসম্মত সহযোগী বইয়ের তালিকা দিতে হবে, শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে বই বেছে নেবে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমন পর্যায়ে নেয়া হচ্ছে, যেখানে নোট বা গাইড বইয়ের কোনো প্রয়োজন থাকবে না। শিক্ষকরা যে সহায়ক বইয়ের তালিকা দেবেন, সেগুলো থেকেই শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন।
অনেক শিক্ষক নিম্নমানের নোট-গাইড বই থেকে পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করেন অভিযোগ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এ ধরনের অনিয়ম কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। মুদ্রণ ও প্রকাশনা একটি সম্মানজনক ব্যবসা। এটি যেন কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্ষতির কারণ না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে।