Image description

চার বছরের ফাহিমা। ফুটফুটে একটি ছোট্ট শিশু। খেলার ছলে ও বাড়ি, এ বাড়ি ঢুঁ মারতো সে। সবার আদুরে ছিল। এক নরপশুর কু-নজরে পড়ে ফাহিমা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে চিরতরে। আর ফিরবে না। ধর্ষণের চেষ্টাকালে শিশু ফাহিমাকে গলা টিপে হত্যা করে ঘাতক জাকির।

এমন ঘটনা নাড়া দিয়েছে সবাইকে। ঘটনাটি ঘটেছে সিলেটের জালালাবাদ ইউনিয়নের সোনাতলা পশ্চিমপাড়ায়। ঘাতক জাকিরের বাড়ি ফাহিমাদের বাড়ির পাশে। প্রতিবেশী সম্পর্কে ফাহিমার চাচা জাকির। পারিবারিক সম্পর্কও রয়েছে। জাকির বিবাহিত। তার স্ত্রী রয়েছে। তবে ঘটনার দিন জাকিরের স্ত্রী পিত্রালয়ে ছিলেন। তার পিতা তোতা মিয়া। গত ৬ই মে সকাল ৯টার দিকে সহপাঠীদের সঙ্গে খেলতে খেলতে জাকিরের বাড়ির উঠোনে চলে আসে ফাহিমা। এ সময় জাকির ফাহিমাকে ডেকে নিয়ে সিগারেট আনতে দোকানে পাঠায়।

জাকিরের কথামতো ফাহিমা দোকান থেকে সিগারেট নিয়ে আসে। এ সময় জাকির ছোট্ট ওই শিশুটিকে ঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে দরোজা লক করে দেয়। এক পর্যায়ে সে ফাহিমাকে ধর্ষণের চেষ্টা চালালে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার ভয়ে অজ্ঞান ফাহিমাকে গলা টিপে হত্যা করে। পরে সে ফাহিমার লাশ স্যুটকেসে ভরে খাটের নিচে রেখে দেয়। কয়েক ঘণ্টা পর ফাহিমাকে খুঁজে না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেন তার দিনমজুর পিতা ও গৃহিণী মাতা। তাদের সঙ্গে ফাহিমাকে খুঁজতে যোগ দেয় ঘাতক জাকির। সে-ও নানা জায়গায় ফাহিমাকে খুঁজে।

এলাকায় বিষয়টি জানাজানি হলে সবাই ফাহিমার সন্ধান করতে থাকে। গোটা দিন ফাহিমাকে খুঁজে না পেয়ে ফাহিমার মা রাতে জালালাবাদ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর থেকে পুলিশও ফাহিমার সন্ধান করছিল। খাটের নিচে ফাহিমার লাশ রেখে দেয়ায় পরদিন সকাল থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। এই অবস্থায় একটি চটের বস্তায় ফাহিমার লাশকে নিয়ে বাড়ির পেছনে একটি জঙ্গলে রাখে জাকির।

পরদিন রাতে ওখানে দুর্গন্ধ ছড়ালে লাশ পরবর্তীতে ফাহিমাদের পাশের বাড়ির পুকুর পাড়ে লাশটি ফেলে আসে জাকির। শুক্রবার সকালে স্থানীয় লোকজন দুর্গন্ধ পেয়ে ওই স্থানে গিয়ে ফাহিমার লাশ দেখতে পান। স্থানীয়রা জানিয়েছেন-পুলিশ যখন ফাহিমার লাশ উদ্ধার করে তখন তার পরনে কেবল একটি শর্ট প্যান্ট ছিল। গোটা শরীরই ছিল খালি। লাশ ফুলে যায়। পচনও ধরে। আর ছোট্ট একটি মেয়ের লাশের এ দৃশ্য যারাই দেখেছেন তারা কান্না থামাতে পারেননি। এতে করে এলাকায় ক্ষোভের সঞ্চার হয়।

পুলিশ ফাহিমার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করে। আর ওদিকে এলাকার মানুষ ঘাতককে চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। শনিবার ফাহিমার লাশ দাফনের পর এলাকার কয়েকটি গ্রামের মানুষ ঘাতকদের গ্রেপ্তার দাবিতে সমাবেশ করেন। এ সমাবেশে জালালাবাদ থানার ওসি মুজাহিদুল ইসলামও যান। তিনি ঘাতককে খুঁজে বের করতে এলাকাবাসীর সহযোগিতা চান। এ সময় এলাকার লোকজন খুনের ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে পুলিশকে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন।

সোমবার রাতে এলাকার কয়েকজন যুবক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানতে পেরে সোমবার রাত ৯টার দিকে জাকিরকে পুলিশের হাতে তুলে দেন তার স্বজনরা। আর এ খবর ছড়িয়ে পড়ামাত্র এলাকার হাজারো মানুষ সড়কে নেমে আসেন। জাকির ছিল বখাটে। সে ইয়াবা সহ নানা জাতীয় নেশাদ্রব্য সেবন করতো। তার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ ছিলেন মানুষ। আর ফাহিমা খুনের ঘটনায় ক্ষোভ আরও বাড়ে। রাতে থানা ঘেরাও করে মানুষজন জাকিরের ফাঁসি দাবি করেন। এক পর্যায়ে অনেকেই থানার ভেতরে ঢুকে জাকিরকে নিয়ে আসতে চাইলে পুলিশ বাধা প্রদান করেন। কলাপসিবল ফটক বন্ধ করে থানাকে সুরক্ষিত রাখে।

মধ্যরাতে পুলিশের অনুরোধে এলাকার মানুষ থানা কম্পাউন্ড ত্যাগ করে সোনাতলা পশ্চিমপাড়া গ্রামে জাকিরের বাড়িতে হামলা করে। ইটপাটকেল ছুড়ার পর তার বাড়িতে অগ্নিসংযোগও করা হয়। পরে জালালাবাদ থানা পুলিশের একাধিক দল ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ক্ষুব্ধ মানুষের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। শেষ রাতে জালালাবাদ থানা পুলিশ জাকিরকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে জাকিরের দেখানো জায়গা থেকে খুনের ঘটনায় ব্যবহার করা একটি ওড়না উদ্ধার করা হয়।

এ সময় জাকির পুলিশকে জানায়- ওড়না তার স্ত্রীর। এটি দিয়ে গলা চেপে সে ফাহিমাকে খুন করেছে। রাতে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে খুনের ঘটনা স্বীকার করে। জানায়, ধর্ষণের চেষ্টার সময় ফাহিমা অজ্ঞান হয়ে পড়লে সে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাহিমাকে খুন করে। এরপর লাশ প্রথমে খাটের নিচে, পরে বাড়ির এক পাশে ও সর্বশেষ পাশের বাড়ির পুকুর পাড়ে ফেলে দেয়ার কথা বলে। এ নিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেছেন সিলেট নগর পুলিশের ডিসি (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।

তিনি বলেন- জাকিরের স্বীকারোক্তি প্রমাণ করছে সে একাই এই খুন করেছে। ঘটনার সব আলামত ইতিমধ্যে জব্দ করা হয়েছে। জাকিরের স্বীকারোক্তি আছে। এখন মেডিকেল রিপোর্টের প্রয়োজন। এতে জানা যাবে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কিনা। পুলিশ ন্যায়বিচারের স্বার্থেই দ্রুত এ মামলার তদন্ত রিপোর্ট আদালতে দাখিল করবে। এদিকে বিকালে ঘাতক জাকিরকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তার জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে জাকির ধর্ষণের চেষ্টা ও খুনের ঘটনা স্বীকার করেছে বলে আদালত সূত্র জানিয়েছে।