Image description
কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সংঘাতে নেমেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যার মধ্য দিয়ে এ সংঘাত আবার প্রকাশ্যে এল গত বছরের নভেম্বরে খুন হন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন

রাজধানী ঢাকার অপরাধজগতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে ‘লড়াই’ আবারও প্রকাশ্যে এল হাজারীবাগের শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। এই হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে অপর দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর। তাঁদের একজন তাঁরই ঘনিষ্ঠজন। কয়েক মাস আগে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুন হত্যার নেপথ্যেও ছিল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

পুলিশের সূত্র বলেছে, দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদপুরের ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল এবং হাজারীবাগের সানজিদুল ইসলাম ইমনের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছিলেন একটি রাজনৈতিক দলের মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির মধ্যম সারির কয়েকজন নেতা ও এক আইনজীবী। তবে তা সফল হয়নি।

এদিকে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এই খুনোখুনিতে চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বেড়েছে। তবে পুলিশ বলছে, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরপর দীর্ঘ দিন কারাগারে থাকা সাত শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পান। গণ-অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে। খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দখল ও সহিংসতা বেড়ে যায়। এ সুযোগে শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও অপরাধজগতে নিজেদের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় তৎপর হয়ে ওঠেন। তাঁদের তৎপরতাও আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে ভূমিকা রাখে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে মানুষ।

গণ-অভ্যুত্থানের পরপর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা হলেন ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন, মিরপুরের আব্বাস আলী, তেজগাঁওয়ের শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, হাজারীবাগের খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন, খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসু ও তারিক সাঈদ মামুন। ফ্রিডম রাসু পরে আবার গ্রেপ্তার হন। অবশ্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কুষ্টিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মগবাজারের শীর্ষ সন্ত্রাসী ত্রিমাতি সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে। তাঁরা কারাগারে আছেন।

পুলিশের সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা মুক্তি পাওয়ার পর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এ ক্ষেত্রে বেশি নাম আসে পিচ্চি হেলাল ও ইমনের।

২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বেড়িবাঁধে সাদিক খান আড়তের সামনে নাসির ও মুন্না নামের দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পিচ্চি হেলালসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হয়। ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি রাতে নিউ এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টার বিপণিবিতানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে কোপানোর ঘটনায় নাম আসে ইমন ও পিচ্চি হেলালের। দুই পক্ষ ঘটনার জন্য পরস্পরকে দায়ী করে। এই দুজনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকায় আদালতের কাছে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুনকে। এর আগে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেসের সামনে মামুনকে হত্যার চেষ্টা করে সন্ত্রাসীরা। তবে সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া গুলিতে নিহত হন সেখান দিয়ে মোটরসাইকেলে যাওয়া আইনজীবী ভুবন চন্দ্র শীল। ওই আইনজীবী ও মামুন হত্যার সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের অনুসারীদের সংশ্লিষ্টতার কথা জানান গোয়েন্দারা। তাঁরা বলছেন, ইমনের নির্দেশেই মামুনকে হত্যা করা হয়। শোনা যায়, ইমন বিদেশে অবস্থান করছেন।

পুলিশ বলছে, নিউমার্কেট এলাকায় গত ২৮ এপ্রিল টিটন হত্যার নেপথ্যে বছিলার কোরবানির পশুর হাটের ইজারা ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ। নিহত টিটনের ভাই খন্দকার সাইদ আক্তার রিপন নিউমার্কেট থানায় করা হত্যা মামলার এজাহারেও ওই হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাজাহান, রনি ওরফে ভাঙারি রনির সঙ্গে টিটনের ঝামেলার কথা উল্লেখ করেছেন। এজাহারে অজ্ঞাতনামা আট-নয়জনকে আসামি করলেও সন্দেহভাজন হিসেবে এই চারজনের নাম উল্লেখ করেছেন তিনি।

অবশ্য পিচ্চি হেলাল গণমাধ্যমে এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, টিটন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই জড়িত নন। যে গরুর হাটের ইজারার কথা বলা হয়েছে, সেখানে টিটন শিডিউল কিনেছিলেন কি না, তাও তিনি জানেন না। নিহত টিটনের ভাই কোনো চাপে পড়ে তাঁর নাম বলছেন। টিটনের মোবাইলের ফরেনসিক পরীক্ষা করলেই সব বের হয়ে যাবে। পুলিশ ঘটনাটি সঠিকভাবে তদন্ত করলে আসল রহস্য বের হবে।

পিচ্চি হেলাল তাঁর প্রতিপক্ষ ইমনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, পুরো মিরপুর থেকে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও পুরান ঢাকা পর্যন্ত ইমনের সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। তারাই সব করছে। তাঁর ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে।

অবশ্য নিহত টিটনের ভাই বলেছেন, টিটনের সঙ্গে ইমনের সম্পর্ক ভালো ছিল। তাঁদের ছোট বোনের স্বামী ইমন।

টিটন হত্যার ঘটনায় পুলিশ গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। পুলিশ দাবি করেছে, তাঁরা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও বিভিন্ন আর্থিক সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে।

সূত্র জানায়, গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ইমন, টিটন ও পিচ্চি হেলাল সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ছোট ভাই তোফায়েল আহমেদ জোসেফের সঙ্গে ছিলেন। পরে আলাদা হয়ে ইমন-টিটন একটি গ্রুপ এবং পিচ্চি হেলাল আরেকটি গ্রুপ তৈরি করেন। তখন থেকে তাঁরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট টিটন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কিছুটা আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি হাজারীবাগ, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন। এর মধ্যে কিছু এলাকায় ইমনের ও কিছু এলাকায় পিচ্চি হেলালের আধিপত্য রয়েছে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে টিটনের সঙ্গে পিচ্চি হেলাল গ্রুপের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সর্বশেষ বছিলার পশুর হাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়।

২০০১ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন বিএনপি সরকার যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, তাঁদের মধ্যে দুই নম্বরে ছিল নিহত টিটনের নাম।

একটি সূত্র জানায়, ইমন ও পিচ্চি হেলালের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে একের পর এক সংঘাতের ঘটনায় তাঁদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন একটি রাজনৈতিক দলের ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরের মধ্যম সারির কয়েকজন নেতা। ওই নেতারা তাঁদের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন। তবে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। একজন আইনজীবীও সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন। সেই উদ্যোগও ভেস্তে যায়। পিচ্চি হেলাল মোহাম্মদপুরের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন।

জামিনে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে মামুন ও টিটন খুন হয়েছেন। শোনা যায়, ইমনের মতো সুইডেন আসলামও বিদেশে অবস্থান করছেন। তবে সহযোগীদের দিয়ে তাঁরা নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছেন। মিরপুরের আব্বাস সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান।

আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে ২০১৮ সালের মে মাসে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বিদেশে চলে গেছেন। তবে মোহাম্মদপুরে তাঁর আধিপত্য রয়েছে।

রাজধানীতে অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত ও হত্যাকাণ্ডে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজধানীতে ৬১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি এবং মার্চে ২৪টি। এপ্রিলের প্রথম ২৮ দিনেই অন্তত ১৫টি খুন হয়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ৮৫৪টি খুন হয়েছে।

অবশ্য পুলিশ বলেছে, ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম বলেন, সব হত্যা মামলা পুলিশ তদন্ত করছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কেউ পার পাবে না।