Image description

প্রতিবছর মে দিবস আসে আবার চলেও যায়। দিবসটি ঘিরে শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ ইত্যাদি প্রতিশ্রুতির কথা বারবার উচ্চারিত হয়। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকের জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নয়ন নিতান্তই সীমিত। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রম অর্থনীতিতে বর্তমানে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য ক্রমে গভীর হচ্ছে।

মজুরি বাড়লেও জীবনযাত্রার চাপ তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বৈপরীত্য আরো স্পষ্ট। গার্মেন্টস খাতে সাম্প্রতিক মজুরি বৃদ্ধি শ্রমিকদের জন্য কিছুটা স্বস্তি আনলেও বাসাভাড়া, খাদ্য, চিকিৎসা ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই স্বস্তি দ্রুত মিলিয়ে গেছে। ফলে মাস শেষে বাড়তি কিছু বেতন পাওয়া গেলেও বাস্তবে সেই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন।

শ্রমিকদের বড় অংশের অভিযোগ, তাদের বেতন সামান্য বাড়লেও বাজারে নিত্যপণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি আয় কোনো কাজেই লাগছে না। ফলে অনেক শ্রমিক পরিবারে খরচ কমানো, ধারদেনা স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো জরুরি খাতে আপস করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় রাজধানীসহ শিল্পাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের আয় কিছুটা বাড়লেও স্বস্তি নেই। ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও নেই।

আশুলিয়ার একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন তাসলিমা বেগম। জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বেতন একটু বাড়ছে, কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখি সবকিছুর দাম আগের চেয়ে বেশি। মাস শেষে হাতে কিছুই থাকে না। জীবনটা আগের মতোই চাপে।

তিনি বলেন, মজুরি কিছুটা বাড়লেও পরিবারের ব্যয় তার চেয়েও দ্রুত বেড়েছে।

চাল, ডাল, তেল, সবজি, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়ালেখার খরচ মিলিয়ে মাস শেষে টিকে থাকা এখন আগের চেয়ে কঠিন। আগে যে বেতন পেতাম, সেটা দিয়ে যেমন কোনোভাবে চলত, এখন বেতন একটু বাড়লেও বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের জীবনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। একই কারখানার আরো কয়েকজন শ্রমিকের অভিজ্ঞতাও প্রায় এক। তাঁরাও জানান, অতিরিক্ত সময় কাজ করেও সঞ্চয় করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং অনেকে বাধ্য হচ্ছেন পরিবারের দৈনন্দিন খরচ কমাতে। কেউ কেউ স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি ব্যয়ের ক্ষেত্রে আপস করতে বাধ্য হচ্ছেন।

 

নির্মাণ শ্রমিকদের অনিশ্চিত আয় : রাজধানীর মিরপুরে একটি নির্মাণ সাইটে কাজ করেন রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, যেদিন কাজ থাকে সেদিন আয় হয়, না থাকলে আয় নেই। পুরাই অনিশ্চিত জীবন। এক দিন কাজ করলে টাকা পাই, না করলে ঘরে খালি হাতে ফিরতে হয়। কিন্তু খরচ তো থামে না। অসুস্থ হলে বা কাজ না থাকলে ধারদেনা ছাড়া সংসার চালানো অসম্ভব।

মূল্যস্ফীতির দীর্ঘ ছায়া : শ্রমিকদের মতে, শুধু মজুরি বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল রাখা জরুরি। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে বাস্তবে কোনো স্বস্তি পাওয়া যায় না। গত পাঁচ বছরে দেশে মূল্যস্ফীতি দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ সালে ৫.৬৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ২০২২ সালে ৭.৭০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ২০২৩ সালে ৯.৮৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ২০২৪ সালে ১০.৪৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও ২০২৫ সালে মূল্যস্ফীতি ৮-১০ শতাংশে ওঠানামা করেছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন-রাশিয়া, ইরান-মার্কিন ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে খাদ্য ও জ্বালানি খাতে মূল্যস্ফীতির মূল কারণ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিম্নআয়ের শ্রমিকদের জীবনে।

একটি শ্রমিক পরিবারের মাসের হিসাব : শ্রমিক সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীর আশপাশে একটি শ্রমিক পরিবারের মাসিক ব্যয় ২৫ হাজার টাকার বেশি

বাসাভাড়া : ৫,০০০-৭,০০০ টাকা, খাবার ব্যয় : ১০,০০০-১২,০০০ টাকা, শিক্ষা ব্যয় : ২,০০০-৩,০০০ টাকা, চিকিৎসা ব্যয় : ১,০০০-২,০০০ টাকা, পরিবহন ব্যয় : ১,৫০০-২,৫০০ টাকা, অন্যান্য খরচ : ২,০০০-৩,০০০ টাকা। এই হিসাবে দেখা যায়, বর্তমান ন্যূনতম মজুরি কাঠামো দিয়ে একজন শ্রমিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব।

নীতি ও বাস্তবতার ফারাক : শ্রমিক নেতারা বলছেন, শ্রমিকের মজুরি কিছুটা বাড়লেও জীবনমান উন্নত হচ্ছে না। বাংলাদেশ এখন এই বৈপরীত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁদের মতে, টেকসই সমাধানের জন্য শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার ও ন্যায্য বাজারব্যবস্থা জরুরি। এ ছাড়া শ্রমিক কার্ড করা যেতে পারে। শ্রমিক নেতা তৌহিদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি বাংলাদেশে এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার বাধ্যতামূলক প্রয়োগ শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। শ্রমিক নেতা বাবুল আকতার কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশে মজুরি বৃদ্ধি অনেক সময় নামমাত্র পরিবর্তন হিসেবে দেখা যায়। একই সময়ে খাদ্য, বাসাভাড়া ও পরিবহন খরচ দ্রুত বাড়ে। ফলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে না।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট : বিশ্লেষণে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মজুরি কাঠামোতে বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি কিছুটা বাড়লেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় তেমন বাড়ছে না।