আধুনিক নতুন অস্ত্রে ঢাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণে তৎপর রয়েছে সন্ত্রাসীরা। গত মঙ্গলবার রাজধানীতে শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এখানেও রয়েছে ক্ষুদ্র অস্ত্রের ব্যবহার। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এমন আরো কয়েকটি ঘটনায় অপরাধীদের আধুনিক ক্ষুদ্র অস্ত্রের ব্যবহার দেখা গেছে বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ১৩ জন খুন হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছে শতাধিক। গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ২৭৪ জনের বেশি গুলিতে আহত হয়। নিহত হয় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানীতে জামিনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রীদের দাপট বেড়েছে। তাদের সহযোগীদের বেপরোয়া অপরাধমূলক ঘটনা, কিশোর গ্যাংয়ের উচ্ছৃঙ্খল তৎপরতা এবং প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
এ ব্যাপারে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, টিটন হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র বলছে, দেশে অপরাধ বাড়ার মূলে রয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পর্দার আড়ালে থাকলেও তাদের সহযোগীদের হাতে কয়েক হাজার অবৈধ অস্ত্র রয়েছে, যার বেশির ভাগ এখনো উদ্ধার হয়নি।
টিটন হত্যার পর তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, টিটন নিজেও একটি সন্ত্রাসীদলের দলনেতা ছিলেন। ছিলেন অস্ত্র ব্যবসায়ী। তাঁর নেতৃত্বে অস্ত্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।
২০০১ সালে সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ২ নম্বরে টিটনের নাম ছিল জানিয়ে সূত্র বলছে, টিটনের ভগ্নিপতি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন। এদের সঙ্গে এক হাজারের বেশি অস্ত্রধারী ক্যাডার বাহিনী রয়েছে, যাদের প্রত্যেকের কাছে অবৈধ ক্ষদ্র অস্ত্র রয়েছে।
জামিনে থেকে অপরাধে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা : পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর অন্তত ছয়জন শীর্ষ সন্ত্রাসী দীর্ঘ কারাবাসের পর জামিনে মুক্তি পান। এর মধ্যে ছিলেন ঢাকার অপরাধজগতের অন্যতম সদস্য খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন। জামিনে কারাগার থেকে আরো বেরিয়ে আসেন কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু। আরো রয়েছেন মিরপুরের অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রক ‘কিলার আব্বাস’ হিসেবে পরিচিত আব্বাস আলী ও পূর্ব রাজাবাজার এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম।
সূত্র জানায়, জামিন পেয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকে দেশের বাইরে পালিয়ে যান। তাঁদের কেউ কেউ ফিরেও এসেছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে গ্রেপ্তার না হওয়া জিসান আহমেদ ওরফে জিসান দীর্ঘদিন ধরে মতিঝিল, রামপুরাসহ আরো কয়েকটি এলাকায় ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি শুরু করেছেন।
জামিনে থেকে তাঁরা আর আদালতে ঠিকমতো হাজিরা দেন না জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তালিকাভুক্ত এসব সন্ত্রাসী এখন দেশে ও দেশের বাইরে থেকে অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন।
হত্যাকাণ্ডে ভয়ংকর শীর্ষ সন্ত্রাসীরা : পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীরা অত্যাধুনিক ক্ষুদ্র অস্ত্র ব্যবহার করে। রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এরপর পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে মসলা ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানকেও নতুন ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর কয়েক দিন আগে খুলনায় আদালতপাড়ায় প্রকাশ্যে দুজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নতুন ধরনের অত্যাধুনিক ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এর আগে মিরপুর এলাকায় যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় এ ধরনের অস্ত্র দিয়ে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের ব্যস্ততম সড়কে প্রকাশ্যে আব্দুল হাকিম নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয় এ ধরনের অস্ত্র দিয়ে। সর্বশেষ টিটনকে ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা।
অত্যাধুনিক ক্ষুদ্র অস্ত্রের ব্যবহার : গত ৩ এপ্রিল পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে যুবদল নেতা রাসেলকে গুলি করে হত্যাচেষ্টায় একটি অত্যাধুনিক ক্ষুদ্র আগ্নোয়স্ত্র ব্যবহার করা হয়। এরপর তদন্তে নেমে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে ‘পেনগান’ নামের একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে।
এর আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মধ্য বাড্ডা এলাকা থেকে মেহেদী হাসান ওরফে দীপু নামের এক যুবককে আটক করে আইন-শৃৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা জানতে পারেন, তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ক্যাডার। অভিযানের সময় যৌথ বাহিনী তাঁর ফ্ল্যাট এবং পাশের একটি রিকশার গ্যারেজে রাখা নষ্ট ভ্যান থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে।
উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তুরস্ক ও জার্মানিতে তৈরি রিভলভার, পিস্তলসহ ১১টি বিদেশি উন্নতমানের আগ্নেয়াস্ত্র, একটি নতুন অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় পয়েন্ট টুটু ক্যালিবার একে রাইফেল এবং দুটি এয়ার গান।
সীমান্তে ৬২ হত্যা : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দেড় বছরে যশোর সীমান্ত এলাকায় ৬২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এর মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিদেশি পিস্তল ব্যবহারের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর যশোর সীমান্ত দিয়েই দেশে সবচেয়ে বেশি অবৈধ ক্ষুদ্র অস্ত্র প্রবেশ করছে। বেলঘরিয়া পিস্তল এবং নাইন এমএম পিস্তলের মতো ছোট আকারের আগ্নেয়াস্ত্র সহজে বহন ও গোপন করা যায়, যা চোরাচালানকে সহজ করে তুলছে।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) মাসিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, গত তিন মাসে দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে অর্ধশতাধিক গুলিবিদ্ধ হয়েছে। গুলিতে খুন হয়েছে অন্তত সাতজন।
কৃতী ফুটবলার থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী : রাজধানীতে গুলিতে নিহত টিটনের মরদেহ নিজ জেলা যশোরে দাফন করা হয়েছে। পারিবারিক সূত্র জানায়, টিটন একসময় যশোরের জনপ্রিয় ফুটবলার ছিলেন। আশির দশকের শেষ দিকে জেলা দলের হয়ে খেলেছেন এবং বিভিন্ন জেলায় তাঁর খেলার সুনাম ছিল। আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি।
তবে খেলোয়াড়জীবন থেকে ধীরে ধীরে তিনি অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৯৮ সালে রাজনৈতিক কোন্দলে গুরুতর হামলার শিকার হওয়ার পর তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। পরে ১৯৯৯ সালের একটি জোড়া খুনের ঘটনার পর তিনি ঢাকায় চলে যান।
ঢাকায় গিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন টিটন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ছিল। অস্ত্র ও চোরাচালানসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।