মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যয়ের কারণে দেশের মূল্যস্ফীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রপ্তানি এখন চাপের সম্মুখীন। চলমান জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় সতর্ক নীতিকাঠামো প্রয়োজন। গতকাল পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এপ্রিলের অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। জিইডি বলছে, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিময় হারের চাপ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় ব্যয় বাড়াচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের চলমান উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬-এ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। এ হ্রাস মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতির কমার ফল। মার্চে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে আসে, যা আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৯ শতাংশে অবস্থান করছে।
খাদ্য খাতে স্বস্তির প্রধান কারণ চালের দাম কমা। বোরো মৌসুমের নতুন সরবরাহ, আমদানি এবং উন্মুক্ত বাজারে বিক্রয় কার্যক্রম চালের দাম কমাতে ভূমিকা রেখেছে। তবে মাংস, মাছ ও সবজির দাম উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম থাকায় বাস্তব আয় এখনো চাপে রয়েছে। মার্চে মজুরি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ০৯ শতাংশে উঠলেও তা মূল্যস্ফীতির নিচে অবস্থান করছে। ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও সরকারি খাতে ঋণ দ্রুত বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৯ দশমিক ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ। রাজস্ব খাতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। মার্চে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৩ হাজার ২৯০ কোটি টাকা, বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩৩ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয়েও ধীরগতি লক্ষ করা গেছে।
জুলাই-মার্চ সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন কমেছে এবং মার্চে ব্যয় ও ব্যবহারহার উভয়ই হ্রাস পেয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, অর্থায়ন সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক জটিলতা এই ধীরগতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে রয়েছে, যা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও অর্থনীতিকে একটি সুরক্ষা বলয় দিচ্ছে। তবে রপ্তানি খাতে দুর্বলতা স্পষ্ট। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে এবং মার্চে তা ঋণাত্মক ১৮ দশমিক ০৭ শতাংশে নেমে এসেছে। বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। আমদানি পরিস্থিতিতে ভিন্নধর্মী চিত্র দেখা গেছে। ভোগ্য ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি স্থিতিশীল থাকলেও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কিছুটা কমেছে, যা বিনিয়োগপ্রবণতায় সতর্কতার ইঙ্গিত দেয়।
বিনিময়হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও বাস্তবে কার্যকর বিনিময় হারে টাকার অবমূল্যায়ন অব্যাহত রয়েছে, যা একদিকে রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ালেও অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রতিবেদনে সার্বিকভাবে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতিতে যে সামান্য নিম্নগতি দেখা গেছে তা মূলত খাদ্য খাতে, বিশেষ করে চালের দামের কারণে। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, বহিরাগত অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর ঝুঁকি এখনো বহাল রয়েছে। এজন্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক ও সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে জিইডি।