Image description
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

জীবন বাঁচাতে যেখানে ওপেন হার্ট সার্জারি প্রয়োজন কয়েক দিনের মধ্যে, সেখানে সেই অপারেশনের সিরিয়াল পেতে লাগছে দেড় থেকে দুই মাস। এ দীর্ঘ ‘অপেক্ষা’ এখন বহু হৃদরোগীর জন্য ‘নীরব মৃত্যুফাঁদ’ হয়ে উঠছে। চিকিৎসকদের ভাষায়, গুরুতর ব্লকেজ বা ভালভ্ সমস্যায় এমন বিলম্বে যেকোনো সময় হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিউর কিংবা আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়। অথচ সময়মতো অপারেশনের সুযোগ না পেয়ে অনেক রোগী বাধ্য হচ্ছেন জীবন হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে, আর সামর্থ্যবানেরা ছুটছেন বেসরকারি হাসপাতালে। তবে ‘জায়গামতো’ তদবির করতে পারলে এক সপ্তাহের মধ্যেই মিলছে অপারেশনের সিরিয়াল। রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দীর্ঘ অনুসন্ধানে এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। সমস্যা শুধু অপারেশনের সিরিয়ালেই নয়, সরকারি হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে এসে সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে অনেক রোগীকে। সব রোগীকে ওষুধ, টেস্ট, আয়া-বুয়া, ওয়ার্ডবয় ও চিকিৎসকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে খুশি করতে গুনতে হচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।

সরেজমিন বৃহস্পতিবার হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) বাইরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করতে দেখা যায় নূর মোহাম্মদের স্বজনদের। ভিতরে চলছিল হার্ট সার্জারি। কিছুক্ষণ পরপরই একজন কর্মী এসে ডাকছিলেন, ‘নূর মোহাম্মদের কেউ আছেন?’ স্বজনরা ছুটে গেলে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছিলেন বিভিন্ন ওষুধের ছোট ছোট তালিকা। অপারেশন চলাকালেই বারবার বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনতে হচ্ছিল রোগীর স্বজনদের। তাঁরা জানান, ওই সময় পর্যন্ত শুধু ওষুধ কিনতেই তাঁদের খরচ প্রায় ৯৬ হাজার টাকা। দেশে হৃদরোগীর সংখ্যাবৃদ্ধির পাশাপাশি এর চিকিৎসাও যেন সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় গলাকাটা ব্যয়। সরকারি হাসপাতালে গিয়ে মিলছে না সময়মতো চিকিৎসা। তদবিরে দ্রুত চিকিৎসা মিললেও নানান অজুহাতে খরচের গ্রাফ বাড়ছে। সরেজমিন দেখা গেছে, জরুরি ভিত্তিতে তিন দিনের মধ্যে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন এমন রোগীকেও অপারেশনের সিরিয়াল পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে দেড় থেকে দুই মাস।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, রোগীর চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তার পরও আগে যেখানে ওপেন হার্ট সার্জারির সিরিয়াল পেতে তিন মাস লাগত, শৃঙ্খলা আনায় এখন তা কমে দেড় মাসে নেমেছে। রোগীর স্বজন পরিচয়ে বুধবার সিরিয়ালের ব্যাপারে হাসপাতালটির ১১৩ নম্বর কক্ষে যোগাযোগ করলে বলা হয়, ‘সবার জন্য সমান নিয়ম। ওপেন হার্ট সার্জারির সিরিয়াল পেতে কমপক্ষে দেড় মাস লাগবে। বেশিও লাগতে পারে।’’ তবে অনুসন্ধানে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে এক সপ্তাহের মধ্যে অপারেশনের তারিখ পাওয়া অসংখ্য রোগী পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, সিরিয়ালে থাকা রোগী মারা গেলে বা অন্য কোথাও অস্ত্রোপচার করিয়ে ফেললে পুরোনো রোগীর সিরিয়াল এগিয়ে আনা হচ্ছে না। ওই স্লটগুলো বিভিন্ন দামে নতুন রোগীর কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। কিছু স্লট রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক তদবিরে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ‘তদবির’ থাকলে এক সপ্তাহেই অপারেশনের তারিখ পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে বুধবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালে একটি ভ্রাম্যমাণ অপারেশন থিয়েটার উদ্বোধন করতে যান। ওই দিন প্রায় সবাই সকাল ৮টার মধ্যে ফেসস্ক্যান করে হাসপাতালে হাজিরা দেন। পরদিনই বদলে যায় চিত্র। বৃহস্পতিবার সাড়ে ৯টার পরও অনেককে হেলেদুলে আসতে দেখা গেছে।

হাসপাতাল সূত্র জানান, প্রতিনিয়ত রোগীর চাপ বেড়েই চলেছে। হাসপাতালটিতে ২০২৩ সালে ইনডোর, আউটডোর, ইমারজেন্সি মিলে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৭৭০ জন চিকিৎসা নেন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪ লাখ ৮৪ হাজারে। ২০২৫ সালে চিকিৎসা নেন ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫২৮ জন। ধারাবাহিকভাবে ১০ থেকে ১৪ শতাংশ হারে রোগী বেড়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, সক্ষমতার তুলনায় তিন গুণের বেশি রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। কিছু বিভাগে এ চাপ ১০ গুণ পর্যন্ত।

হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, ‘সক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগী আসছে। সেবা বাড়ালে রোগীও বাড়ছে। হার্ট চিকিৎসা বিকেন্দ্রীকরণ না করলে ঢাকার ওপর চাপ কমবে না।’ ওষুধের খরচ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে প্রায় ৫০ শতাংশ ওষুধ সরবরাহ করা হয়, সব ওষুধ দেওয়া সম্ভব নয়। তার পরও বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় এখানে ওপেন হার্ট সার্জারির খরচ অর্ধেক এবং অনেক ক্ষেত্রে স্টেন্ট ও পেসমেকারে অনুদান দেওয়া হয়। আগে ওপেন হার্ট সার্জারির জন্য তিন মাস অপেক্ষা করতে হতো, যা বর্তমানে কমিয়ে দেড় মাসে আনা হয়েছে। তবে এ সময়টাও রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’

অধ্যাপক ওয়াদুদ বলেন, ‘আমাদের পেডিয়াট্রিক সার্জন মাত্র দুজন। সিরিয়াল পেতে ছয় মাসও লেগে যেত। এজন্য বর্তমানে শিশুদের হৃদরোগের চিকিৎসায় ওটিতে বেশি সময় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এটা করতে গিয়ে অন্য অপারেশন কিছু কমছে। অপারেশন ফ্যাসিলিটি বাড়ানো দরকার। তবে বাজেট ঘাটতির কারণে অনেক জরুরি সংস্কারও করা যাচ্ছে না।’ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে দালালের দৌরাত্ম্য কমাতে পেরেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ ছাড়া দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি শৌচাগার নারীদের জন্য আলাদা করেছেন।