শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এমনকি কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া সন্ত্রাসীরা কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারী সে বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ঘটনাস্থলের আশপাশের ২৩টি বাড়ির সিসি ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণে কিলিং মিশনের আগে খুনিদের গতিবিধি, কিলিং মিশনে ব্যাকআপ টিম থাকা এবং গুলির পর পালিয়ে যাওয়ার রুট সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে গোয়েন্দারা। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ডিবি পুলিশ ধারণা করছে, প্রতি মঙ্গলবার নিউমার্কেট বন্ধ থাকায় এবং পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ হলের সামনে অন্ধকার ও কোনো সিসি ক্যামেরা না থাকায় অনেকদিন ধরে পরিকল্পনা করে জায়গাটি রেকি করা হয়। টিটন ঘটনার দিন মোবাইল নিয়ে বের না হওয়ায়, তিনি কোথায় গিয়েছিলেন বা কে তাকে ডেকেছিল সে বিষয়েও নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ডিবি সূত্র জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে ও খুনিদের পালাতে সুবিধা হওয়ার কথা চিন্তা করেই বেছে নেওয়া হয় জায়গাটি। এরপর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘনিষ্ঠ কাউকে দিয়ে টিটনকে নিউমার্কেট এলাকায় ডাকা হয়। যাতে বাসায় (হাজারীবাগের সুলতানগঞ্জ এলাকা) ফেরার সময় ওই পথ দিয়ে ফেরে। এরই ধারাবাহিকতায় ওত পেতে থাকা খুনিদের মাত্র ৪ মিনিটের কিলিং মিশনে খুন হন টিটন।
সিসি ক্যামেরা বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা দেখেছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকেই ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান করছিল মোটরসাইকেলে থাকা দুই কিলার। রাত ৭টা ৫০ মিনিটে তাদের অবস্থান দেখা যায় নীলক্ষেত মোড়ে। এ সময় টিটনও নীলক্ষেতে ছিল। পরে তিনি ঘটনাস্থলের দিকে হেঁটে যাওয়া শুরু করেন। আর মোটরসাইকেলে পিছু নেয় দুই কিলার। ঠিক ৭টা ৫৪ মিনিটে তারা টিটনের ্ওপর হামলা করে একে একে ছয়টি গুলি করে। এরপর আবার মোটরসাইকেলে করে বিজিবি গেটের সামনে দিয়ে ইরানি মাঠের পাশ দিয়ে রায়ের বাজার বেড়িবাঁধে ওঠে। সেখান থেকে দ্রুত গতিতে আটিবাজার দিয়ে পালিয়ে যায়। ২৩টি বাড়ির সিসি ক্যামেরা ফুটেজ চেক করে তাদের গতিবিধি পাওয়া যায়। তবে আটিবাজার থেকে তারা কোথায় পালিয়েছে, তা এখনো বের করতে পারেননি তদন্তকারীরা। সূত্র জানিয়েছে, মোটরসাইকেলে থাকা দুই কিলার ছাড়াও ব্যাকআপ টিমে আরও দুজন ছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ৩৫-৪০ বছর বয়সি ওই দুই যুবক টিটনকে অনুসরণ করছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ওই দুজন অনেকক্ষণ টিটনের গতিবিধি অনুসরণ করে মোটরসাইকেলে থাকা দুই কিলারকে তথ্য দেয়।
রেকি করা স্পটের কাছাকাছি এলে শুটার ও তার সহযোগী মোটরসাইকেলে নীলক্ষেত থেকে রওনা দেয়। ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, মোটরসাইকেল চালকের সাদা হেলমেট ও কালো ধরনের একটি শার্ট পরা ছিল। শুটারের পরনে ছিল সাদা শার্ট। মাথায় ক্যাপ ও মুখে মাস্ক পরা ছিল। তাদের গতিবিধি অনুসরণ করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আরেকটি সূত্র জানায়, মোটরসাইকেলে থাকা শুটার ও তার সহযোগী প্রায় শনাক্ত। রায়েরবাজার ও আশপাশ এলাকার শুটারদের প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে শুটার সম্পর্কে তদন্তকারীরা মোটামুটি নিশ্চিত। যেকোনো সময় শুটার গ্রেপ্তার হতে পারে। তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, আধিপত্য বিস্তার, রায়েরবাজারে ফুটপাতের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, ঈদকেন্দ্রিক চাঁদাবাজিতে প্রভাব বিস্তার করা, গরুর হাটের ইজারাসহ বিভিন্ন বিষয়কে সামনে রেখে আমাদের তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, এ ঘটনার পেছনে অনেকেই জড়িত থাকতে পারে। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া খুনিদের গ্রেপ্তারে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। শুটার গ্রেপ্তার হলে বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে।
এদিকে গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকায় আদালতপাড়ায় ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুন ও গত বছরের ২৫ মে বাড্ডা গুদারাঘাটে বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধন হত্যার সঙ্গে অনেকটাই মেলে টিটন হত্যার কিলিং মিশন। মামুন হত্যার নেপথ্যে নাম আসে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের। আর সাধন হত্যায় নাম আসে শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদী হাসানের। মামুন ও সাধন হত্যার কিলিং মিশনেও রাখা হয়েছিল ব্যাকআপ টিম। টিটন হত্যার পেছনে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল অথবা টিটনের বোনজামাই ইমনের হাত রয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ৮টার দিকে নিউমার্কেট এলাকায় শাহনেওয়াজ হলের সামনে বটতলায় টিটনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় বুধবার টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা উল্লেখ করা হয়, মাহাম্মদপুরের বসিলা গরুর হাটের ইজারা নিয়ে ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল ওরফে কাইলা বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ডাগারি রনির সঙ্গে টিটনের ঝামেলা চলছিল। ২০০১ সালে সরকারঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় নাম ছিল নিহত টিটনের।