Image description
► গড়ে দিনে আসছে ১৪ শ্রমিকের লাশ ► অমানবিক নির্যাতনের শিকার নারী শ্রমিক

দেশের ইতিহাসে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা এক মাসে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন (৩৭৫ কোটি) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন গত মার্চে। রেকর্ড রেমিট্যান্স পাঠিয়েও শ্রমিকরা কিন্তু ভালো নেই। বিশাল অঙ্কের রেমিট্যান্সের ভারে উল্টো চাপা পড়েছে তাঁদের কান্না। অর্থনীতির প্রাণশক্তি রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বরাবরই বাংলাদেশে অবহেলিত। এই শ্রমিকদের দেখার এবং তাঁদের কথা শোনার যেন কেউ নেই। বিদেশ যাওয়ার সোনার হরিণের পেছনে ছুটে দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন শ্রমিক। অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার পথে মাঝসমুদ্রেই করুণ মৃত্যু হচ্ছে অনেকের। কেউ কেউ অস্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করছেন। নারী শ্রমিকরা প্রায়ই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় দেশে ফিরছেন। এ অবস্থায় আজ শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মহান মে দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক কর্মঠ হাত, আসবে এবার নবপ্রভাত’।

বাংলাদেশ ১৯৭৬ সাল থেকে বিশ্ব শ্রমবাজারে অংশ নিচ্ছে। দীর্ঘ এই সময়ে বাংলাদেশের দক্ষ শ্রমবাজারে বড় পরিসরে প্রবেশের কথা থাকলেও তা হয়নি।  অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশের বাইরে যে পরিমাণ শ্রমিক গিয়েছেন সে পরিমাণ শ্রমিকের সেবা দিতে সরকার জনবল যুক্ত করেনি। শ্রমিকের অধিকার আদায়ে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার কাজটিও হয়নি। উল্টো ইন্স্যুরেন্সের নামে শ্রমিকদের থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার বাংলাদেশি কাজ না পেয়ে এখন রাস্তায় ঘুরছেন। বাংলাদেশে শ্রমিকদের অভিবাসন খরচ অনেক বেশি। অন্য দেশের চেয়ে দ্বিগুণ অর্থ খরচে শ্রমিকদের বিদেশে যেতে হয়। আবার শ্রমিকদের স্বার্থে প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক থেকে কম সুদে টাকা ঋণ নেওয়ার কথা, কিন্তু সেখানে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। এ টাকা পেতেও আবার তাঁদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

দিনে আসছে ১৪ শ্রমিকের লাশ : ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যে, গত বছর দেশ ৪ হাজার ৯৭২ জন প্রবাসীর লাশ দেশে আসে। এ হিসেবে মাসে গড়ে ৪১৫ এবং দিনে ১৪ প্রবাসীর লাশ দেশে আসে। মার্চের শেষে লিবিয়া থেকে সাগরপথে রাবারের নৌকায় গ্রিসে যাওয়ার সময় মানবিক বিপর্যয়ে ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর নির্মম মৃত্যু হয়। নৌকাটি মাঝসমুদ্রে প্রতিকূল আবহাওয়ায় দিক হারিয়ে ফেলে। খাবার ও পানির অভাবে তাঁদের মৃত্যু হয়। এ ২২ জনের ২০ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। এর আগে ১৮ এপ্রিল কুয়েত থেকে ৩০ বাংলাদেশি প্রবাসীর লাশ দেশে ফেরে। একই দিন মালয়েশিয়া ও লিবিয়া থেকে আরও কয়েকজন প্রবাসীর লাশ আসে। প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক সূত্রে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বেশ কয়েকবার ফ্লাইট বাতিল হয়। এ লাশগুলো সে সময় আসতে না পারায় পরে চার্টার ফ্লাইটে দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

৩১ শতাংশের অস্বাভাবিক মৃত্যু : অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) গবেষণা বলছে, বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে প্রবাসে যাঁদের মৃত্যু হয়, তাঁদের ৩১ শতাংশের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ১৬ শতাংশের মৃত্যু হয় দুর্ঘটনায়। ১৫ শতাংশ আত্মহত্যা করেন। আর ২৮ শতাংশের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। বাকিরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

অমানবিক নির্যাতন নারী শ্রমিকদেও : জনশক্তি, কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যে, বর্তমানে ১০ লাখের বেশি নারী বিদেশে কাজ করেন। আর ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন। বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নারীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। ঠিকমতো বেতন ও খাবার পান না। নির্ধারিত সময়ের চেয়েও তাঁদের বেশি কাজ করতে হয়। আবার কাজ করতে যাওয়া দেশের ভাষা না জানায় নারী কর্মীরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়েন। বরিশালের এক নারী গৃহকর্মী সৌদি আরব থেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফেরেন। চারবার হাতবদলের পর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া সেই নারী সৌদিতে কাজ করতে গিয়ে কোনো বেতন পাননি, খেতে পাননি। ২০২৪ সালে এক দালালের মাধ্যমে সৌদিতে যান। সেখানে প্রথমে একটি অফিসে রাখা হয়, পরে একের পর এক বাড়িতে কাজে পাঠানো হয়।

দালালের খপ্পরে সর্বস্বান্ত : বিদেশে যাওয়ার সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে গিয়ে শ্রমিকরা দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে বা ভিসাবাণিজ্যের কারণে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। ভুয়া কাগজপত্রের কারণে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন থেকেই অনেকে ফেরত আসছেন। আবার বিদেশে গিয়ে মাসের পর মাস কাজ না পেয়ে নিদারুণ কষ্টে আছেন অনেকে। কেউ কেউ খালি হাতে দেশে ফিরছেন। কিছু অসাধু ট্রাভেল এজেন্সি ও অসৎ দালালরা বিদেশে ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে গ্রামের সহজসরল তরুণদের ফাঁদে ফেলে বিপুল অর্থ লুটে নিচ্ছেন। দালালরা জাল ভিসা বানিয়ে এই যুবকদের টোপে ফেলছেন।

রামরুর নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকী গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রকে নিপীড়নের শিকার শ্রমিকদের কাছে দায়বদ্ধ হতে হবে। আমরা দীর্ঘদিন অদক্ষ শ্রমবাজারে বিচরণ করছি। সব মন্ত্রণলায় একত্র হয়ে সমন্বিতভাবে দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলার উদ্যোগ না নেওয়ায় দক্ষ শ্রমবাজার তৈরি হয়নি। এ কারণে শ্রমিকদের শোষণ করার হারও কমছে না। অসাধু একটি চক্র রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ে যাঁরা সিদ্ধান্ত নেন এবং এ খাতে বেসরকারিভাবে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের সঙ্গে জড়িত। এ চক্র নিম্নমানের ওয়ার্ক ভিসা নিয়ে এসে তার মাধ্যমে লোক পাঠায়। এর ফলে সরকার যে খবরদারি করবে তা হয় না। কারণ সরকারের মধ্যে থাকা একটি অংশ অসাধু চক্রের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শ্রমিকদের শোষণের কথা শোনা যায়নি। কিন্তু রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে এ চক্র, যারা সিন্ডিকেট করতে চায়, তারা বিভিন্ন দুর্নীতির মাধ্যমে তাদের অবৈধ কাজ চালু রাখতে চাইবে। এজন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরো ঘুরিয়ে দক্ষ অভিবাসনব্যবস্থা চালু করতে হবে। অবৈধ চক্রটিকেও নিষিদ্ধ করতে হবে। এ মুহূর্তে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কাজ শুরু করলে আগামী বছর থেকে এ খাতে ইতিবাচক ফল মিলবে। আর এক দশকে এটি দক্ষ খাত হিসেবে গড়ে উঠবে।’

বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, ‘বিদেশে কাজের খোঁজে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ৪৫ শতাংশ কমে গেছে। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের রেমিট্যান্স বেড়েছে। যুদ্ধের জন্য প্রবাসী শ্রমিকের যাঁর কাছে যে অর্থ ছিল দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু প্রবাসী শ্রমিকের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন কমেনি। ভিসার নামে কিছু এজেন্সি এই শ্রমিকদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে তার হিসাব রাখা হচ্ছে না। শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়ার জন্য সরকারি সেবা দেওয়ার মান শূন্য। শ্রমিকের রেমিট্যান্স, ইন্স্যুরেন্স ও ফিঙ্গার প্রিন্টের নামে প্রচুর টাকা ব্যাংকে রাখা হচ্ছে। কিন্তু প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন চলছে না। এজন্য সরকারকে শ্রমিক যে দেশে যাচ্ছেন সে দেশের সরকারকে দায়বদ্ধ করে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে।’