জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধনী) বিল-২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে গত ৯ এপ্রিল। এই বিলে জামায়াতকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী দল’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরপর গত ২৯ এপ্রিল আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী কার্যত নিজেদের ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ দল হিসেবে মেনে নিয়েছে। তবে এর জবাবে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকার ফ্যাসিবাদের বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করতেই একতরফা এই বিলকে সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও বিলটির ওপরে জামায়াত কোনও সংশোধনী প্রস্তাব আনেনি বলে জানা গেছে।
গত ৯ এপ্রিল সংসদে ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধনী) বিল-২০২৬’ উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আহমেদ আজম খান। তিনি জানান, ২০২২ সালের (১৫ নম্বর আইন) বিদ্যমান আইনের সংশোধনের মাধ্যমে সময়োপযোগী ও প্রাসঙ্গিক আইন কাঠামো তৈরি করাই এ বিলের লক্ষ্য।
সংশোধিত এ আইনে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করা কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং নেজামে ইসলামসহ আরও কয়েকটি পক্ষ। সেদিন এ বিলের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তার আপত্তি অগ্রাহ্য করে তা কণ্ঠ ভোটে দেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এতে হ্যাঁ জয়যুক্ত হওয়ায় তা আইনে পরিণত হয়। যদিও এই বিলের বিপক্ষে আপত্তি দেয়নি তাদের জোট শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যরা।
এ বিষয়ে গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবে বক্তব্য দিতে গিয়ে আইন মন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘জামায়াতে ইসলামী কার্যত নিজেদের ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ হিসেবে মেনে নিয়েছে।’’ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার’ সংজ্ঞা তুলে ধরে এমন দাবি করেন তিনি।
আসলে কি জামায়াত নিজেদের স্বাধীনতাবিরোধী দল হিসেবে মেনে নিলো- রাজনৈতিক মহলে এমন প্রশ্ন উঠেছে। কারণ বিলটি পাস বা আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় জোরালো কোনও অবস্থান নিতে পারেনি দলটি। আইন অনুযায়ী ভবিষ্যতে যদি দলটির কার্যক্রমের ওপর আইনগত কোনও নিষেধাজ্ঞা আসে, তাহলে তারা কীভাবে তা মোকাবিলা করবে? এমন আলোচনাও হচ্ছে।
জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। সে হিসেবে তারা সন্ত্রাসী সংগঠন। আদালতও একই রায় দিয়েছে। আইন অনুযায়ী তাদের রাজনৈতিক অধিকার থাকে না। যেহেতু এখন দলটির অতীত অপরাধ আইনগত স্বীকৃতি পেয়েছে, তাই ভবিষ্যতে যেকোনও সরকার চাইলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।’’
বিলে কী আছে?
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল অধ্যাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী’, ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবার’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যের সংজ্ঞা’ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অধ্যাদেশে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং যেসব ব্যক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং যারা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, এমন বেসামরিক নাগরিকেরা (ওই সময়ে যাদের বয়স সরকার-নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে ছিল) তারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন। এর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, বিএলএফ ও অন্যান্য স্বীকৃত বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স ও আনসার সদস্যরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন।
আইনমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে আইন মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘জামায়াতে ইসলামী কার্যত নিজেদের ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ দল হিসেবে মেনে নিয়েছে।’’ সংসদের চলতি অধিবেশনে পাস হওয়া জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার’ সংজ্ঞা তুলে ধরতে গিয়ে এমন দাবি করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘‘সংশোধিত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনে বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—‘১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এ দেশের দোসর—তৎকালীন মুসলিম লীগ, তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, তৎকালীন নেজামে ইসলামী এবং আলবদর, আলশামস বাহিনী, রাজাকারদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের যেসব দামাল ছেলেরা, যারা সংগ্রাম করেছেন।’ তার দাবি, এই বিল পাস হওয়ার সময় জামায়াতে ইসলামী কার্যত বিরোধিতা করেনি।’’
জামায়াতের অবস্থান
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইনের বিষয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘‘এ জিনিসটা স্বাধীনতার পরে তখনকার সরকার আনেনি। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরকার আনেনি। এ বিষয়টা সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন ফ্যাসিস্টের বিকৃত প্রতীক শেখ হাসিনা। পরবর্তী পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকার ধারাবাহিকতা রেখেছে সামান্য পরিবর্তন করে। সেখানে তৎকালীন তিনটি সংগঠনের নাম নেওয়া হয়েছে—মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টি।’’
তিনি বলেন, ‘‘আগামীর দিনগুলোতেও আর জাতিতে বিভক্ত নয়, বরং ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, সম্মানের জাতি গঠন করতে পারি, এটাই হোক সব দলের অঙ্গীকার।’’ তবে বিলটির ওপর জামায়াত কোনও সংশোধনী প্রস্তাব আনেনি বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সরকার ফ্যাসিবাদের বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করতেই একতরফা এই বিলকে সামনে নিয়ে এসেছে। আমরা নাকি নিজেদের স্বাধীনতাবিরোধী দল হিসেবে মেনে নিয়েছি, এখন এসব কথা বলে মিথ্যাচার করা হচ্ছে। অথচ সংসদে বিল পাসের আগে আমাদের এমপিদের আপত্তিকে উপেক্ষা করা হয়েছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘আইনমন্ত্রীর বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য। জামায়াতের প্রতি দেশের গণমানুষের সমর্থন দিন দিন বাড়ছে। যে কারণে এত চ্যালেঞ্জের মধ্যেও গত নির্বাচনে আমরা এককভাবে ৬৮টি আসন লাভ করেছি।’’