পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, যুক্তরাষ্ট্রে দুই শিক্ষার্থী হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে বাংলাদেশ। রোববার দুপুরে তিনি এতথ্য জানান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থী জামিলের লাশ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এমভি জয়যাত্রাসহ বাংলাদেশের পতাকাবাহী সব জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে।যুক্তরাষ্ট্রে নিহত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন এবং নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি একে অপরকে ভালোবাসতেন। তাদের বিয়ের কথা চলছিল। অল্প কিছুদিন পরই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতেন তারা। কিন্তু সে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই কেড়ে নেওয়া হলো তাদের জীবন। দীর্ঘ আটদিন নিখোঁজ থাকার পর স্থানীয় সময় গত শুক্রবার লিমনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর শনিবার (২৫ এপ্রিল) নাহিদার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন তার ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত। শনিবার ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে এ তথ্য নিশ্চিত করে তিনি লেখেন, নাহিদার লাশ এখনো পাওয়া যায়নি।
লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, বাংলাদেশে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় বৃষ্টি সম্পর্কে অনেক ইতিবাচক কথা বলতেন লিমন। বৃষ্টির অনেক প্রতিভা আছে, তিনি ভালো গান গাওয়ার পাশাপাশি রান্নাও করতে পারেন। লিমন পরিবারকে জানিয়েছিলেন, বিয়ের বিষয়ে ভাবছেন তারা। তার ভাই দুই বছর ধরে নিজের থিসিস নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন বলেও জানান জুবায়ের।

সন্দেহভাজন খুনি হিশাম আবুগারবিয়া
২৭ বছর বয়সি লিমন ও বৃষ্টি দুজনই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন। লিমন ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন এবং নাহিদা কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন ১৬ এপ্রিল সবশেষ তাদের ক্যাম্পাসে দেখা গিয়েছিল। পরদিন ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হন লিমন ও বৃষ্টি। পরে ক্যাম্পাসে তাদের খোঁজ না পেয়ে পারিবারিক বন্ধু বিষয়টি পুলিশকে অবগত করেন। পরে ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে শুক্রবার লিমনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
তাদের দুজনের নিহতের ঘটনায় সন্দেভাজন ২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুগারবিয়াকে আটক করেছে পুলিশ। তিনি লিমনের রুমমেট ছিলেন। পূর্বপরিকল্পিতভাবে অস্ত্র দিয়ে তিনি ভিকটিমদের হত্যা করেছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ।
শনিবার সকালে বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে লেখেন, ‘আমার বোন আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’ পরবর্তীতে গণমাধ্যমকে তিনি জানান, ফ্লোরিডার পুলিশের কাছ থেকেই তিনি এ খবর পেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি তার বোনের লাশ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় পুলিশ তাকে ফোন করে জানিয়েছে নাহিদার লাশ এখনো পাওয়া যায়নি।
গ্রেপ্তার হওয়া হিশাম আবুগারবিয়া নিশ্চিত করেছে, ‘এটা আসলে দুজনের লাশ। সন্দেহভাজন ব্যক্তি আরেকটা বডি ডিসপোজ করছিল।’ মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, লিমনের বাসায় রক্তের মধ্যে পড়ে থাকা দেহের একটি অংশের সঙ্গে নাহিদার ডিএনএর মিল পাওয়া গেছে। গতকাল শনিবার এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এর আগে, গত শুক্রবার জামিলের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ। ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে লিমনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে পুলিশ এখনো বৃষ্টির মৃত্যুর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত হিশাম সালেহ আবুগারবিয়া আমেরিকার নাগরিক। তিনি লিমনের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন। তবে তাকে তার পারিবারিক বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিবিএস জানিয়েছে, আবুগারবিয়া আগে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থী ছিলেন, তবে বর্তমানে তিনি এনরোল্ড ছিলেন না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী, তিনি ২০২১ সালের বসন্ত থেকে ২০২৩ সালের বসন্ত পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করেছেন এবং ম্যানেজমেন্টে বিএস ডিগ্রি নিচ্ছিলেন। এর আগে, আবুগারবিয়ার একাধিকবার গ্রেপ্তারের রেকর্ড রয়েছে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার বিরুদ্ধে হামলা এবং ফাঁকা বাড়িতে চুরি (বার্গলারি) করার অভিযোগ আনা হয়। একই বছরের মে মাসে তার বিরুদ্ধে আরো একটি হামলার অভিযোগ ছিল, যেগুলো আদালতের নথিতে কম গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে, আদালতের নথি অনুযায়ী, প্রথমবার অপরাধে অভিযুক্তদের জন্য একটি ডাইভারশন প্রোগ্রামে অংশ নেন তিনি। ২০২৪ সালে সেটি সম্পন্ন করার পর তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হয়। এ বিষয়ে তার আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
নিহত লিমন জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের মহিষবাথান এলাকার জহুরুল ইসলামের ছেলে। তবে দীর্ঘদিন থেকে তার পরিবার গাজীপুরের মাওনা এলাকায় বসবাস করছে। দুই ভাইয়ের মধ্যে লিমন বড় ছিলেন। তার মৃত্যুর খবরে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
লিমনের চাচা জিয়াউল হক বলেন, লিমন খুবই ভালো ছাত্র ছিল। সে বিদেশে লেখাপড়া করছিল। তাকে ঘিরে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল, তা এখন ভেঙে গেছে। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছি।
অন্যদিকে, নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর গ্রামে। তার বাবার নাম জহির উদ্দিন আকন। জহির উদ্দিন দুই দশকের বেশি সময় ধরে ঢাকার মিরপুর এলাকার পল্লবীতে থাকেন। গ্রামে তার নিজস্ব ঘর না থাকলেও মাঝেমধ্যেই তিনি সেখানে যেতেন।
বৃষ্টি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে তার এমন মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল। এ ঘটনায় এলাকাবাসী ও স্বজনদের মধ্যে গভীর শোক এবং ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা দ্রুত হত্যাকারীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার চান তার পরিবার ও এলাকাবাসী। বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন বলেন, ‘২০২৫ সালের ১২ আগস্ট উচ্চশিক্ষার জন্য আমার মেয়ে বৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রে যায়। সর্বশেষ ১৬ এপ্রিল তার সঙ্গে আমাদের কথা হয়। এরপর থেকেই সে নিখোঁজ ছিল। পরে আমরা তার মৃত্যুর খবর পাই। আমি আমার মেয়ের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। শিগগিরই তার লাশ দেশে ফেরত আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি। ’
নিহতের চাচা দানিয়াল আকন বলেন, ‘সে বেঁচে থাকলে দেশের জন্য অনেক কিছু করতে পারত। কিন্তু তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই।’