ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন হতাহতের পরিসংখ্যান নিয়ে লুকোচুরি খেলছে। প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন বাড়তে থাকায় গণনায় যোগ-বিয়োগ করছেন কর্মকর্তারা। ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দিনে মার্কিন সেনার নিহত ও আহতের সংখ্যা ছিল ৩৮৫।
পেন্টাগনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও সোমবার (২০ এপ্রিল) এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে ৪২৮-এ দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু মঙ্গলবার যুদ্ধ দপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো প্রকাশ্য মন্তব্য ছাড়াই যুদ্ধে আহত সেনার সংখ্যা ১৫ জন কমে যাওয়ায় মোট সংখ্যা ৪১৩-তে নেমে আসে। বুধবার এই সংখ্যা অপরিবর্তিত ছিল, তবে যুদ্ধ দপ্তরের একটি প্রকাশ্য পরিসংখ্যানে আহত ও নিহতের ‘সর্বমোট’ সংখ্যা ৪১১ দেখানো হয়।
গত ২১ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা বাড়ানোর ঘোষণা দেন। এর পরই হতাহতের সংখ্যায় এই জটিল পরিস্থিতিটি তৈরি হয়।
পেন্টাগনের দুজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, মঙ্গলবার যুদ্ধ দপ্তর কর্তৃক গুম করা ১৫ জন নিহতের বিষয়ে তারা কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না। তাদের দাবি, কেবল ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ই এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। কিন্তু সেই ব্যক্তি তার ডেস্কে নেই। তাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার ডেস্কে ফিরে এলেই আমি তাকে বিষয়টি জানাতে পারব।’
একদিন একাধিকবার খোঁজখবর নেওয়ার পরেও যুদ্ধ দপ্তরের হতাহতের তালিকা থেকে কেন ১৫ জন আহত সেনার নাম মুছে ফেলা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্টারসেপ্ট এখনও পায়নি।
প্রকৃত সংখ্যা যাই হোক না কেন, পেন্টাগনের নিহত ও আহত সামরিক কর্মীদের সরকারি হিসাবটি প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম। এর কারণ হিসেবে একজন মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা একে ‘হতাহতের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন। ডিফেন্স ক্যাজুয়ালিটি অ্যানালাইসিস সিস্টেম (ডিসিএএস) নামে যে সরকারি সিস্টেমটি কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্টকে সেনাদের নিহত, আহত বা অসুস্থ হওয়ার তথ্য দেয়, সেখানে শত শত পরিচিত হতাহতের তথ্যই বাদ পড়ে গেছে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা বলেন, এই সংখ্যাগুলো যে গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট। তারা যে এগুলো জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করতে চাইছে না, তা থেকেই কিছু একটা বোঝা যায়। এটাই হলো ধামাচাপা দেওয়ার সংজ্ঞা।
আহতদের নিখোঁজ হওয়ার প্রশ্নটি বাদ দিলেও পেন্টাগনের সরকারি হতাহতের পরিসংখ্যান এই সংঘাতের একটি বিকৃত চিত্র তুলে ধরে। যদিও ডিসিএএস ‘অ-শত্রুতাজনিত’ মৃত্যুর অর্থাৎ যারা দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় মারা গেছেন তাদের হিসাবও দেয়, তবে এতে ‘অ-শত্রুতাজনিত’ আঘাত অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।
ডিসিএএস-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধে অন্তত ৬৩ জন নৌবাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন। তবে এই পরিসংখ্যানে সেই ২০০ জনেরও বেশি নাবিকের নাম নেই, যাদের ১২ মার্চ ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড জাহাজে লাগা ভয়াবহ আগুনে ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট বা ক্ষতের জন্য চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।
জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের মতে, জাহাজটি ‘যুদ্ধ শক্তি প্রদর্শনের’ জন্য দিনরাত ফ্লাইট অপারেশন চালাচ্ছিল। এই সংখ্যায় সেই নাবিকের নামও অন্তর্ভুক্ত নেই, যিনি ২৫ মার্চ ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র সমর্থনে স্ট্রাইক মিশনে জড়িত থাকার সময় ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন জাহাজে যুদ্ধ-বহির্ভূত কারণে আহত হয়েছিলেন।
পেন্টাগনের এক সংবাদ সম্মেলনে সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ঘোষণা করেন, ‘আমরা শহীদদের সর্বদা সম্মান জানাব। এবং যে ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন, তারা বাহিনীর সংকল্পকে দৃঢ় করতে এবং প্রেরণাকে সংহত করতে সত্যিই সাহায্য করেছেন।’
ডিসিএএস একইভাবে যুদ্ধের সময় ১৩ জন শত্রুভাবাপন্ন ও নিরপেক্ষ মার্কিন সেনার মৃত্যুর তালিকা এবং তাদের নাম প্রকাশ করেছে। কিন্তু কুপারের গণনা ও পেন্টাগনের হিসাব থেকে বাদ পড়েছেন মেজর সরফ্লাই ডেভিয়াস। তিনি নিউইয়র্ক আর্মি ন্যাশনাল গার্ডের একজন সিগন্যাল ও কমিউনিকেশন অফিসার ছিলেন। এ ছাড়াও ৪২তম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের সদর দপ্তরে নিযুক্ত ছিলেন। জানা যায়, তিনি গত ৬ মার্চ কুয়েতের ক্যাম্প বুহরিং-এ কর্তব্যরত অবস্থায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান।
গত মাসের শেষের দিকে ডেভিয়াসের জন্য আয়োজিত এক স্মরণসভায় রিপাবলিকান পার্টির নিউ ইয়র্কের প্রতিনিধি মাইক ললার বলেন, অপারেশন এপিক ফিউরির সমর্থনে কুয়েতে মোতায়েন থাকাকালীন তিনি মারা যান। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান কেইনও যুদ্ধে ‘আমাদের শহীদদের সম্মান জানানোর’ সময় ডেভিয়াসের কথা স্মরণ করেন।
দ্য ইন্টারসেপ্ট ডিসিএএসে কর্মরত দুজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে যে, ঐতিহাসিকভাবে মাঠে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটা ও সিস্টেমে তা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মধ্যে খুব সামান্যই ব্যবধান ছিল। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময় ডিসিএএসে কর্মরত জোয়ান ক্রেনশ দ্য ইন্টারসেপ্টকে বলেন, আমরা খুব দ্রুত তথ্য পেতাম। খুব দ্রুত হতাহতের সংখ্যা জানাতে পারতাম। ডেটা প্রতিদিন আপডেট করা হতো।
দুই সপ্তাহ ধরে হতাহতের সংখ্যা ধীরগতিতে বাড়ার কারণ কিংবা ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির পর থেকে যুদ্ধে আহতের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে ৪৩, ২৮ বা ২৬ জন হওয়ার কারণ সম্পর্কে করা প্রশ্নের কোনো উত্তর মার্কিন যুদ্ধ সচিবের কার্যালয় দেয়নি। কয়েক সপ্তাহ ধরে পেন্টাগনের হতাহতের তালিকায় ডেভিয়াসের নাম কেন নেই, সে বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধ করা হলেও পেন্টাগন সাড়া দেয়নি।