দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ শাসনের পতন ঘটেছে তিন দশকের বেশি সময় আগে। সময়টা ছিল ১৯৯৪। বহু বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকদের নতুন আশা দেখান নেলসন ম্যান্ডেলার সরকার। ক্ষমতার রদবদলে কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের আশা ছিল শ্বেতাঙ্গদের দখলে থাকা জমি ফিরে পাওয়ার। সরকারেরও ছিল একই প্রতিশ্রুতি। তবে তিন দশক পেরোলেও তা আর হয়নি। দেশটির সবচেয়ে উর্বর ও বাণিজ্যিক কৃষি জমিগুলোর সিংহভাগ আজও শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের নিয়ন্ত্রণে। এমনই নির্মম বাস্তবতা উঠে এসেছে দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে। ঐতিহাসিক এই অর্থনৈতিক ফাটল ও বৈষম্যের নেপথ্য সত্য উন্মোচন করেছেন গবেষকেরা।
জমি পুনর্বণ্টন প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ৯০-এর দশকে প্রবর্তন করা হয় ‘ইচ্ছুক বিক্রেতা, ইচ্ছুক ক্রেতা’ নীতি। এই ব্যবস্থার কারণে আকাশচুম্বী বাজারদরে জমি কেনার চড়া মূল্যের সামনে সাধারণ কৃষ্ণাঙ্গদের সামর্থ্য ভেঙে পড়ে সম্পূর্ণভাবে। সরকার থেকে বরাদ্দ করা নামমাত্র অনুদানও অপ্রতুল প্রমাণিত হয়ে থমকে দেয় পুরো উদ্যোগকে। ফলে আইনি সুযোগ তৈরি হলেও অর্থমূল্যের কৃত্রিম দেয়াল পার হওয়া কৃষ্ণাঙ্গদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
আধুনিক কৃষি খাত দক্ষিণ আফ্রিকায় এখন রূপ নিয়েছে বিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায়। বংশপরম্পরায় পুঞ্জীভূত সম্পদ এবং ব্যাংক ঋণের সুযোগ কাজে লাগিয়ে শ্বেতাঙ্গ কৃষকেরা বহু যোজন এগিয়ে থাকে প্রতিযোগিতায়। বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে সামান্য জমি হাতে পেলেও আধুনিক সেচ, পর্যাপ্ত মূলধন ও আন্তর্জাতিক বাজারের অভাবে কৃষ্ণাঙ্গ কৃষকেরা দ্রুত প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়তে বাধ্য হয়।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অগ্রাধিকারের তালিকায় ভূমি সংস্কার কর্মসূচিকে অবমূল্যায়ন করে বাজেটে রাখা হয় মাত্র এক শতাংশের কম অর্থ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্থানীয় আমলাতন্ত্রের জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা পুরো প্রক্রিয়াকে স্থবির করে রাখে বছরের পর বছর। ফলে জমি হস্তান্তরের প্রশাসনিক গতি থমকে গিয়ে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা রূপ নেয় কাগজে-কলমে।
কৃষি জমির ওপর শ্বেতাঙ্গদের এই একচ্ছত্র আধিপত্য কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বড় অংশের মনে প্রতিনিয়ত জমিয়ে তুলছে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল জমি হাতবদল করলেই এই সংকটের চিরস্থায়ী সমাধান মিলবে না। উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন নিশ্চিত না করা পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার উর্বর কৃষি জমিতে বৈষম্যের ইতিহাস মিটে যাওয়া অনেকটাই অসম্ভব।