প্রচণ্ড বাতাসে ছড়িয়ে পড়া দাবানলে পুড়ছে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল। শনিবার (১ আগস্ট) গ্রিসের একাধিক এলাকায়, এমনকি রাজধানী এথেন্সের আশপাশেও বড় আকারে অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক অগ্নিনির্বাপণ অভিযান ও জরুরি সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে স্পেন ও ফ্রান্সের কিছু এলাকায়ও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
এ বছর গ্রীষ্মে পরপর রেকর্ড তাপপ্রবাহ এবং কম বৃষ্টিপাতের পর ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানল দেখা দিয়েছে। ফ্রান্স ও স্পেনের বিভিন্ন গ্রাম ধ্বংস হয়েছে এবং কয়েক লাখ মানুষকে বাড়িঘর ও পর্যটন আবাসন ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে হয়েছে।
গ্রিসে সাম্প্রতিক দিনগুলো পর্যন্ত তাপপ্রবাহ তুলনামূলক কম থাকলেও শনিবার প্রবল বাতাসের কারণে দেশটির বিভিন্ন স্থানে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য ভার বিভাগের একটি দাবানল তিন দিন আগে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল। তবে শুক্রবার আবারও তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিএফএম টিভির তথ্য অনুযায়ী, ছয় ঘণ্টার মধ্যে আগুন এক হাজার হেক্টরের বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
রাতভর প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শনিবার বাতাস আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কায় অগ্নিনির্বাপণ প্রচেষ্টায় নতুন করে কর্মী ও সরঞ্জাম যোগ করা হয়েছে।
স্পেনের পরিস্থিতি
জাতীয় জরুরি অবস্থা শেষ হওয়ার দুই দিন পরও শনিবার স্পেনে কয়েকটি এলাকায় দাবানল মোকাবিলা অব্যাহত রয়েছে। দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে ভয়াবহ আগুনের পর সরকার ওই জরুরি অবস্থা শেষ ঘোষণা করেছিল।
উত্তরের লিওন প্রদেশে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। শুক্রবার রাতে সেখানে নতুন করে আগুন শুরু হয়, আরেকটি আগুন এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং তৃতীয় একটি আগুনের পরিস্থিতি উন্নতির দিকে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পার্শ্ববর্তী জামোরা প্রদেশে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়িয়ে দেওয়া একটি দাবানল নিয়ন্ত্রণে আসায় ১৪টি শহরের বাসিন্দারা ঘরে ফিরেছেন এবং বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে।
পূর্বাঞ্চলীয় কাস্তেলন প্রদেশে ভ্যাল দ’উইক্সো দাবানল সপ্তম দিনে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এতে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সরিয়ে নেওয়া সব বাসিন্দা ঘরে ফিরতে পেরেছেন। দুটি আলাদা স্থানে আগুনের সূত্রপাত পাওয়ায় পুলিশ অগ্নিসংযোগের সন্দেহ করছে।
মাদ্রিদ ও আভিলা অঞ্চলের দাবানল যেখানে ৭০ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। তবে সান হুয়ান জলাধারের কাছে নতুন করে শুরু হওয়া একটি আগুন শুক্রবার নিভিয়ে ফেলা হয়েছে।
গ্রিসে জরুরি সতর্কতা
শনিবার গ্রিসের কয়েকটি এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আটিকা ও এভিয়া অঞ্চলে দাবানল ঝুঁকির সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে। এথেন্সের প্রায় ৮০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অ্যাজিওস ভাসিলিওস শহরে দাবানলের কারণে ২০০ জনের বেশি মানুষকে সমুদ্রপথে সরিয়ে নিতে হয়েছে। ওই এলাকায় ৩০০-এর বেশি অগ্নিনির্বাপক কর্মী, ৯২টি অগ্নিনির্বাপণ যান, ভারী যন্ত্রপাতি ও বিমান আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
একই দাবানল থেকে পালিয়ে আরও ১২ জনকে পোর্তো জারমেনো সৈকত থেকে গ্রিসের কোস্টগার্ডের নৌকা ও ফায়ার সার্ভিসের একটি জাহাজ উদ্ধার করে। আর্গোলিদা ও আর্তা অঞ্চলেও রাতভর অগ্নিনির্বাপণ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তীব্র গরমে বাড়ছে মৃত্যুও
অস্ট্রিয়ার স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, জুন মাসে দেশটিতে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড ৩৯৫ জনে পৌঁছেছে। জুনে দেশটির প্রায় অর্ধেক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি ছিল। ১৫টি কেন্দ্রে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি রেকর্ড করা হয়।
যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত দেশটিতে তাপজনিত কারণে আনুমানিক ২ হাজার ৮৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফ্রান্সে ১৭ জুন থেকে ২ জুলাইয়ের মধ্যে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৭৬৪। জার্মানির আরকেআই স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, চলতি বছরে উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ৯ হাজার ৮০০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব
রেকর্ড কম পানির স্তরের কারণে হাঙ্গেরির পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সার্বিয়ার জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। জার্মানি থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত প্রবাহিত দানিউব নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
হাঙ্গেরি, সার্বিয়া ও রোমানিয়ায় নদীপথে পণ্য পরিবহনও ব্যাহত হচ্ছে। সংকুচিত নৌপথ দিয়ে চলাচলের জন্য বার্জগুলোকে পণ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হচ্ছে। এর ফলে সার্বিয়ার জ্বালানি আমদানিও জুলাইয়ের লক্ষ্যমাত্রার এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে।
রোমানিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ারইলেকট্রিকা চলতি সপ্তাহে নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় তাদের দুটি চুল্লির একটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। দ্বিতীয়টিও শিগগির বন্ধ হতে পারে, যা দেশটির বিদ্যুৎ চাহিদার এক-পঞ্চমাংশে প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স