Image description

ইউরোপের অভিবাসন সংকট নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় নজিরবিহীন অভিবাসী প্রবেশের ঘটনার পর ফ্রান্স তার সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে। প্যারিসের আশঙ্কা, স্পেন হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করা অনিয়মিত অভিবাসীদের একটি অংশ শেনজেন এলাকার ভেতরে প্রবেশ করে ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সীমান্তে বাড়তি নজরদারির লক্ষ্য হলো অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, মানবপাচারকারী চক্রের কার্যক্রম বন্ধ করা এবং ইউরোপের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সীমান্ত এলাকায় পরিচয় যাচাই, নথিপত্র পরীক্ষা এবং সন্দেহজনক চলাচলের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ফ্রান্সের এই পদক্ষেপ ইউরোপের দীর্ঘদিনের অভিবাসন বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। শেনজেন ব্যবস্থার আওতায় ইউরোপের অধিকাংশ সদস্য দেশের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের সীমান্তে চাপ বাড়লে সদস্য দেশগুলো নিজেদের সীমান্তে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার সুযোগ পায়।

ফ্রান্স ২০১৫ সালের প্যারিস সন্ত্রাসী হামলার পর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। এরপর ইউরোপে শরণার্থী সংকট, ভূমধ্যসাগরীয় পথে অভিবাসী প্রবাহ বৃদ্ধি, সীমান্ত অপরাধ এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ফরাসি সরকার বিভিন্ন সময়ে এই নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রেখেছে।

বর্তমান সংকটের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে স্পেনের সেউতা। আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর উপকূলে অবস্থিত হলেও সেউতা স্পেনের অংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত। মরক্কোর সঙ্গে সরাসরি স্থল সীমান্ত থাকা এই ভূখণ্ডকে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সর্বশেষ ঘটনায় মরক্কো থেকে সেউতায় ব্যাপক সংখ্যক মানুষ প্রবেশের চেষ্টা করে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক পর্যায়ে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করেন। স্পেনের কর্মকর্তারা এটিকে সেউতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অভিবাসন চাপগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ঘটনাটি ঘটে মূলত স্থল সীমান্ত, উপকূলীয় এলাকা এবং সাগরপথ ব্যবহার করে। অনেক মানুষ সাঁতরে, ছোট নৌকা ব্যবহার করে অথবা সীমান্ত বাধা অতিক্রম করে স্পেনের ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি এত দ্রুত বেড়ে যায় যে স্থানীয় প্রশাসনের আশ্রয়, চিকিৎসা ও জরুরি ব্যবস্থাপনার ওপর বড় চাপ তৈরি হয়।

এই প্রবেশ চেষ্টার সময় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে অন্তত ৫৭ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। নিহতদের অনেকেই সমুদ্রপথে ডুবে মারা যান, আবার কেউ কেউ সীমান্ত এলাকায় ভিড় ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে প্রাণ হারান।

স্পেন সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ঘটনাটিকে দেশের সীমান্ত ও সার্বভৌমত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। স্পেনের দাবি, মানবপাচারকারী নেটওয়ার্ক এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েছে এবং মানুষকে সংগঠিতভাবে সীমান্ত অতিক্রমে উৎসাহিত করেছে।

সেউতার পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পেন ও মরক্কো সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক দশ হাজার মানুষ পরে স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে যান। প্রায় ৪৮ হাজারের বেশি মানুষের ফিরে যাওয়ার তথ্য জানিয়েছে স্পেন।

সেউতা সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে ইউরোপমুখী করছে। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে ইউরোপে প্রবেশের সুযোগ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মরক্কো এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইউরোপের বাইরের সীমান্ত হিসেবে মরক্কো বহু বছর ধরে স্পেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করে আসছে। তবে আফ্রিকা থেকে ইউরোপমুখী মানুষের চাপ সামলানো মরক্কোর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সেউতা ও মেলিলিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থল সীমান্ত, যা আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে যুক্ত। এ কারণে এই দুই অঞ্চল শুধু স্পেনের নয়, পুরো ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ফ্রান্সের উদ্বেগের মূল জায়গা হলো, ইউরোপের বাইরের সীমান্তে চাপ তৈরি হলে এর প্রভাব দ্রুত শেনজেন এলাকার ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। একটি দেশে প্রবেশের পর অনেক অভিবাসী অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এ কারণেই প্যারিস সীমান্ত নজরদারি আরও বাড়িয়েছে।

অভিবাসন ইস্যুতে ইউরোপ এখন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ মনে করছে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী না করলে অবৈধ অভিবাসন ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি আশ্রয়প্রার্থীদের আন্তর্জাতিক অধিকার রক্ষা করাও জরুরি।

ইউরোপীয় আইনে সীমান্তে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করা হয়। কেউ আশ্রয়ের আবেদন করলে তার আবেদন নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবেচনা করতে হয়। তবে যাদের থাকার বৈধ অনুমতি নেই, তাদের আইন অনুযায়ী ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন অভিবাসন ব্যবস্থায় নতুন নিয়ম কার্যকর করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্তে দ্রুত যাচাই, আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া উন্নত করা এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। তবে কোন দেশ কতটা দায়িত্ব নেবে, তা নিয়ে এখনো মতবিরোধ রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের সীমান্তে কড়া নজরদারি এবং সেউতার অভিবাসন সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে ইউরোপের অভিবাসন সমস্যা শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানবপাচার এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি।

ফ্রান্স থেকে সেউতা পর্যন্ত বর্তমান পরিস্থিতি এখন শেনজেন ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা। ইউরোপকে একদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে মানবিক দায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনও মেনে চলতে হচ্ছে।