Image description

ভারতের উত্তরপ্রদেশের মেরঠে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বিরুদ্ধে কথিত ‘আপত্তিকর’ মন্তব্য করার অভিযোগে এহসান (৭০) নামের এক মুসলিম বৃদ্ধকে গ্রেফতার করে চরম হেনস্থা করেছে পুলিশ।

গত ২৮ মে ঈদুল আজহার নামাজের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি সাক্ষাৎকার ভাইরাল হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আটক করা হয়। তবে গ্রেফতারের পর পুলিশের হেফাজতে ওই বৃদ্ধের শারীরিক অবস্থা এবং কান ধরে ক্ষমা চাওয়ার ভিডিও সামনে আসায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশি বিবরণী অনুযায়ী, গত ২৮ মে রেলওয়ে রোড ঈদগাহের কাছে ‘ট্রু ভারত’ নামের একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন পেশায় ভাঙারি ব্যবসায়ী এহসান। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ সম্পর্কে তার মতামত জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “উনি একজন গুন্ডা মুখ্যমন্ত্রী।”

এরপর প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, “উনি (মোদি) তো গুন্ডা, সবচেয়ে বড় গুন্ডা। আমাদেরকে বন্দে মাতরম গাইতে বলা হচ্ছে। আল্লাহ সবচেয়ে বড়, যোগী তো আল্লাহর চেয়ে বড় নন।” সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী প্রধানমন্ত্রীকে ‘মহারাজা’ হিসেবে উল্লেখ করার চেষ্টা করলে বৃদ্ধ তা তীব্রভাবে নাকচ করে দেন।

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই নড়েচড়ে বসে উত্তরপ্রদেশের মেরঠ জেলা পুলিশ। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমোটো) একটি মামলা দায়ের করে শুক্রবার (২৯ মে) সন্ধ্যায় এহসানকে তার দিল্লির গেট এলাকার বাসস্থান থেকে গ্রেফতার করা হয়।

মেরঠ পুলিশের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। সাংবিধানিক পদে আসীন সম্মানিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্য করায় সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন।”

ক্যান্টনমেন্টের সার্কেল অফিসার (সিও) নবীনা শুক্লা জানান, ভিডিওটি তদন্তের পর বিশেষ টিম গঠন করে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গ্রেফতারের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুলিশের প্রকাশ করা একটি ভিডিও নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ৭০ বছর বয়সী ওই বৃদ্ধ কানে ধরে ক্ষমা চাচ্ছেন এবং পুলিশ স্টেশন থেকে বের হওয়ার সময় তাকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, এহসান জিজ্ঞাসাবাদের সময় স্বীকার করেছেন যে তিনি ‘রাগের মাথায়’ ওই মন্তব্য করেছিলেন এবং এখন তিনি অনুতপ্ত।

তবে মানবাধিকার কর্মী এবং সচেতন মহল এই ঘটনায় পুলিশের পক্ষপাতমূলক আচরণ ও আইন প্রয়োগের দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সমালোচকদের মতে, উত্তরপ্রদেশে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ক্ষেত্রে পুলিশ যে কঠোরতা ও ক্ষিপ্রতা দেখায়, বহু ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে সেই একই অপরাধে চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়।

এই ঘটনার সমসাময়িক সময়ে মেরঠেরই আরেকটি ঘটনা পুলিশের এই ‘দ্বিমুখী নীতি’র বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে। গত শুক্রবার পুর্নিত নামের এক হিন্দু যুবক তার বাড়ির সামনে মাংসের ব্যাগ রাখা আছে বলে পুলিশে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো। পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় যে, পুর্নিত নিজেই সেই ব্যাগটি সেখানে রেখেছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাকে কোনো আইনি শাস্তি না দিয়ে কেবল ‘ভবিষ্যতে এমন মিথ্যা তথ্য না দেওয়ার’ জন্য একটি সাধারণ সতর্কবার্তা দিয়ে ছেড়ে দেয়।

একই জেলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টার মতো গুরুতর অপরাধে এক যুবককে স্রেফ সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া এবং অন্য ঘটনায় দেশের শীর্ষ নেতাদের রাজনৈতিক সমালোচনা করায় এক সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধকে দ্রুত গ্রেফতার ও হেনস্থা করার ঘটনাটি উত্তরপ্রদেশের আইনশৃঙ্খলার নিরপেক্ষতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।


শীর্ষনিউজ