বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দীর্ঘ সময় জুড়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতি মূলত ইরানকে একঘরে বা অবরুদ্ধ করে রাখার কৌশলের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক চাপ এবং ওয়াশিংটনের সামরিক প্রতিরোধের মাধ্যমে ইরানকে একটি নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে রাখা সম্ভব হবে– এমন একটি বদ্ধমূল ধারণা দীর্ঘদিন ধরে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা নীতিকে প্রভাবিত করেছে। এই ধারণার ওপর ভর করেই রিয়াদ বা আবুধাবির মতো রাজধানীগুলো ওয়াশিংটনের ওপর তাদের সামরিক নির্ভরতা বাড়িয়েছিল এবং তেল আবিবের সঙ্গে এক ধরনের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলেছিল।
তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এই দীর্ঘদিনের আত্মবিশ্বাস এবং সমীকরণকে এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক থিংক ট্যাংক ‘দ্য ক্রেডল’-এ প্রকাশিত লেখক পেইমান সালেহির সাম্প্রতিক নিবন্ধ ‘হোয়াই দ্য জিসিসি ইজ লার্নিং টু লিভ উইথ ইরান’ শীর্ষক বিশদ বিশ্লেষণে এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার চিত্রটি অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
মূল প্রবন্ধের আলোকে এটি স্পষ্ট যে, ইরান সাম্প্রতিক যুদ্ধে মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে এবং তার সামরিক দুর্বলতাগুলোও প্রকাশ পেয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি। অর্থাৎ, ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বা আঞ্চলিক ভূরাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা বা বাদ দেওয়া যে অসম্ভব, এই কঠিন সত্যটি এখন আরব বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে বাধ্য করছে।
এই পরিবর্তিত চিন্তাধারার সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর একটি প্রতিবেদনে। যেখানে সৌদি আরব সমর্থিত একটি আঞ্চলিক ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ বা ‘নন-অ্যাগ্রেশন প্যাক্ট’-এর প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পেইমান সালেহির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যদিও এই প্রস্তাবটি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা, খসড়া চুক্তি বা আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। তবুও এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক সংকেত।
এই প্রস্তাবের মূল অনুপ্রেরণা এসেছে শীতল যুদ্ধকালীন ইউরোপের ‘হেলসিঙ্কি প্রক্রিয়া’ থেকে। আরব ও মুসলিম দেশগুলো এখন মনে করছে যে, একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে এবং উত্তেজনা কমাতে এই ধরনের একটি বহুপাক্ষিক অনাক্রমণ কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যা ইউরোপীয় দেশগুলোও সমর্থন করছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ জিসিসি ভুক্ত দেশগুলোর সামনে এটি প্রমাণ করেছে যে, ইরানকে কোণঠাসা করা হলেও ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মাধ্যমে সে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতার ওপর বিশাল মাশুল চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ফলে সৌদি আরব এবং তার মিত্ররা এখন বুঝতে পারছে যে, ইরানকে পুরোপুরি দমন করার চেয়ে তার উপস্থিতি স্বীকার করে নিয়ে একটি সহাবস্থানের পথ খোঁজা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত।
অবশ্য ইরানের জন্য এই ধরনের আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রস্তাব একেবারে নতুন কিছু নয়। ২০১৯ সালে ইরান নিজেই ‘হরমুজ পিস এনডেভার’ বা ‘হোপ’ নামক একটি উদ্যোগের প্রস্তাব দিয়েছিল। সেখানে পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা বাইরের কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই কেবল আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। তৎকালীন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফও জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিজেদেরই নিশ্চিত করা উচিত। কিন্তু তৎকালীন সময়ে আরব দেশগুলো এই প্রস্তাবকে সন্দেহের চোখে দেখেছিল এবং একে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব কমানোর একটি ইরানি চাল হিসেবে গণ্য করেছিল। তবে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে।
জিসিসি ভুক্ত দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি, এখন আর কোনো একক পরাশক্তির ওপর অন্ধভাবে নির্ভরশীল না থেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান নীতি গ্রহণ করছে। এই নতুন আঞ্চলিক মেরুকরণকে চীন ও রাশিয়া উভয় দেশই জোরালো সমর্থন দিচ্ছে। কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা সামরিক আধিপত্যের অবসান এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর নেতৃত্বে একটি যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার পক্ষে সওয়াল করে আসছে। চীনের জন্য এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা তার জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক করিডোরের সুরক্ষার সাথে সরাসরি জড়িত।
এতসব পরিবর্তনের পরেও তেহরান এই নতুন সৌদি প্রস্তাবকে এখনই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে না বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো টাইমিং বা সময় নির্ধারণের জটিলতা। ইরানের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে যুদ্ধ পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি এবং ইসরাইল বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পুনরায় সরাসরি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা এখনো বাতাসে ভাসছে। তাছাড়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা এখনো বিদ্যমান।
এই পরিস্থিতিতে তেহরান দীর্ঘমেয়াদী কোনো আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো গড়ে তোলার চেয়ে তাৎক্ষণিক সামরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। যদি এই প্রস্তাবটি আরও স্থিতিশীল এবং শান্ত পরিবেশে উত্থাপিত হতো, তবে হয়তো তেহরানের পক্ষ থেকে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যেত। বর্তমানে ইরানের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি, যা ইরানের কৌশলগত সতর্কতা এবং নীরব পর্যবেক্ষণকে নির্দেশ করে।
‘দ্য ক্র্যাডল’-এর নিজস্ব সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই প্রস্তাব নিয়ে ইরানের রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হলেও রিয়াদের দীর্ঘমেয়াদী উদ্দেশ্য নিয়ে তেহরানের ভেতরে এখনো গভীর সন্দেহ রয়ে গেছে। বিশেষ করে যদি ইরানের ওপর পুনরায় কোনো সামরিক হামলা হয়, তখন সৌদি আরব এবং অন্যান্য গালফ দেশগুলো কী ভূমিকা পালন করবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।
এই পুরো সমীকরণের পেছনে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল উপাদান হলো ইসরায়েলের ভূমিকা। যদিও এই সম্ভাব্য অনাক্রমণ চুক্তিতে ইসরায়েলের সরাসরি অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবুও ইসরায়েলের সাথে সুসম্পর্ক রাখা গালফ দেশগুলোর অবস্থান নিয়ে ইরান অত্যন্ত চিন্তিত। তেহরানের মূল প্রশ্ন হলো, যে দেশগুলো ইসরাইলকে সামরিক বা গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে, তারা এই কাঠামোর ভেতরে কীভাবে থাকবে এবং ভবিষ্যতের কোনো সংঘাতে তাদের ভূমিকা কী হবে। ইরান কোনোভাবেই চাইবে না যে, এই অনাক্রমণ চুক্তিটি তাকে আঞ্চলিকভাবে নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিহত করার একটি ছদ্মবেশী হাতিয়ারে পরিণত হোক।
অন্য দিকে, সৌদি আরবও নিজে এই মুহূর্তে অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলছে। কারণ যুদ্ধপরবর্তী এই নাজুক পরিস্থিতিতে ইরানের সাথে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে জড়ানো ওয়াশিংটনের সাথে তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে বা মার্কিন নিরাপত্তা বলয় থেকে দূরে সরে যাওয়ার তকমা এনে দিতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এই প্রস্তাবকে সমর্থন করছে কারণ ব্রাসেলস বা প্যারিসের মতো ক্ষমতার ভরকেন্দ্রগুলো এখন আর ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের অলীক স্বপ্ন দেখছে না। বরং তাদের মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের সম্পূর্ণ পতন ঠেকানো, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন রাজনৈতিক পরিবেশের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটেছে ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে। একসময় আরব বিশ্বের একটি বড় অংশ ইসরায়েলকে ইরানের বিরুদ্ধে একটি ঢাল বা কৌশলগত অংশীদার মনে করলেও, সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর ইসরায়েল নিজেই এই অঞ্চলের জন্য একটি অস্থিতিশীল শক্তি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলকে এক অন্তহীন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। পেইমান সালেহির এই বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধটি স্পষ্ট করে দেয় যে, জিসিসি দেশগুলোর এই নতুন নীতি ইরানের প্রতি কোনো আকস্মিক ভালোবাসা বা অগাধ বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ নয়। তাদের মধ্যে এখনো গভীর অবিশ্বাস, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহাল রয়েছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের পুরনো সেই দ্বিমুখী রাজনীতি– যেখানে একপক্ষে ইরান এবং অন্যপক্ষে মার্কিন-আরব-ইসরায়েল জোট ছিল– তা এখন আর কার্যকর নয়। তার বদলে একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং কিছুটা অস্বস্তিকর লেনদেনভিত্তিক সহাবস্থানের যুগ শুরু হতে যাচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলটি ১৯৭০-এর দশকের ইউরোপ নয় এবং এখানে শীতল যুদ্ধের মতো কোনো সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য নেই, ফলে এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে সৌদি আরবের এই প্রস্তাবটি এ কারণেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে, বহু বছর পর আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে তার সাথে কীভাবে সহাবস্থান করা যায়, তা নিয়ে গুরুত্বের সাথে চিন্তা করতে শুরু করেছে। আর এটিই হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা।