Image description

কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের এজলাসে বৃহস্পতিবারের সকালটা শুধু আইনি লড়াইয়ের ছিল না, ছিল এক রাজনৈতিক বার্তারও। বহুদিন পর ফের আইনজীবীর কালো কোট পরে আদালতে হাজির হলেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু সওয়ালই করলেন না, বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে বাংলার মানুষকে রক্ষা করার আবেদনও জানালেন বিচারপতির কাছে। ভোট-পরবর্তী হিংসা মামলার শুনানিতে এদিন তৃণমূলের হয়ে সওয়াল করেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তার ছেলে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বাংলার মানুষকে বাঁচান। এটা বাংলা, উত্তরপ্রদেশ নয়। এখানে বুলডোজার রাজ চলতে পারে না।

মমতার অভিযোগ, ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূল কর্মী ও সমর্থকদের ওপর লাগাতার হামলা, ভয় দেখানো, ঘর ছাড়া করা এবং সংখ্যালঘু ও তফসিলি জাতির মানুষদের নিশানা করা হচ্ছে। এ ছাড়া সংখ্যালঘুদের এলাকায় নির্বিচারে বুলডোজার চালানো হচ্ছে। আদালতে তিনি দাবি করেন, ৯২ বছরের বৃদ্ধ থেকে ১৮ বছরের দম্পতি কাউকেই রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। তফসিলি জাতি ও সংখ্যালঘুদের ভয় দেখানো হচ্ছে। তার অভিযোগ, মাছ-মাংসের দোকান জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বহু তৃণমূল কর্মী বর্তমানে বাড়ি ছাড়া। এমনকি ১২ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে আদালতে জানান তিনি।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অভিযোগ ছিল তার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে। মমতা বলেছেন, ‘আমাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুলিশের কাছে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। অনলাইনে অভিযোগ জানাতে হচ্ছে। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না।’ কালীঘাটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে থানায় যাওয়ার ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে আদালতে অভিযোগ করেন তিনি। এদিন সওয়াল চলাকালে আচমকাই আদালত কক্ষে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক আইনজীবী মমতার উদ্দেশে কটাক্ষ করে বলে ওঠেন, ‘এখানে নাটক করবেন না।’ মুহূর্তে এজলাসে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। তবে থামেননি মমতা। শান্ত অথচ দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দেন, ‘আমি ১৯৮৫ সাল থেকে আইনজীবী। সেই অধিকারেই আমি সওয়াল করতে চাই।’

এদিন আদালতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সওয়াল করেন বাম নেতা তথা আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যও। বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে কার্যত একসুরে সরব হতে দেখা যায় বাম এবং তৃণমূলকে। বিকাশরঞ্জন আদালতে নিউ মার্কেট এলাকার হকার উচ্ছেদের প্রসঙ্গ তোলেন। তার অভিযোগ, বুলডোজার চালিয়ে গরিব হকারদের অস্থায়ী দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনি আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কয়েক দিন আগেই বিজেপিকে রুখতে বিরোধী ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই আবহে এদিন আদালতে বিকাশরঞ্জন এবং মমতার একসঙ্গে সওয়াল নতুন রাজনৈতিক জল্পনাও উসকে দিয়েছে। বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের ছবিই যেন দেখা গেল বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে।

তৃণমূলের তরফে আদালতে আরও দাবি করা হয়, ভোট-পরবর্তী হিংসায় অন্তত ১০ জন খুন হয়েছেন। প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০টি তৃণমূল কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং আগুন লাগানোর অভিযোগও তোলা হয়। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় দুই হাজারের বেশি অশান্তির ঘটনা ঘটেছে বলেও আদালতে জানানো হয়।

অন্যদিকে, পুলিশের আইনজীবী ধীরজ ত্রিবেদি পাল্টা দাবি করেন, কোথায় কোথায় অশান্তি হয়েছে তার নির্দিষ্ট তালিকা দেওয়া হয়নি। তার বক্তব্য, ‘সব ঘটনা ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাস নয়। তদন্ত চলছে। কেউ অপরাধ করলে পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং নেবে।’

তবে শুনানি চলাকালে হাইকোর্ট চত্বরে বিজেপির জয় শ্রী রাম স্লোগান ওঠে। পরে আদালত থেকে বেরোনোর সময় মমতাকে লক্ষ্য করে বিজেপির পক্ষ থেকে চোর চোর স্লোগানও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।