Image description

ইরানে ভূপাতিত হওয়া একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রুদের খুঁজে বের করতে সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে মার্কিন বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর একজন ক্রুকে খুঁজতে তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ক্রুদের একজনকে ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন বিমানবাহিনীর জেনারেল এএফপিকে ব্যাখ্যা করেছেন, শত্রু এলাকায় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে এবং প্যারাশুট নিয়ে নেমে পড়লে একজন পাইলট কীভাবে বেঁচে ফেরার চেষ্টা করেন।

মিচেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যারোস্পেস স্টাডিজের কর্মরত অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিউস্টন ক্যান্টওয়েল বলেন, ‘এমন পরিস্থিতি প্রচণ্ড ধাক্কা খাওয়ার মতো। আপনার মনে হবে, হায় ঈশ্বর! মাত্র দুই মিনিট আগেও আমি একটি যুদ্ধবিমানে ছিলাম। ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ মাইল বেগে উড়ছিলাম। হঠাৎ একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরিত হলো, আক্ষরিক অর্থেই আপনার মাথা থেকে মাত্র ১৫ ফুট দূরে।

তিনি জানান, তবুও মাটিতে প্যারাশুটে নামার আগেই তার নেওয়া বিশেষ প্রশিক্ষণ কাজে লাগতে পারে। এই প্রশিক্ষণকে বলা হয় ‘এসইআরই’, যার অর্থ অনুসন্ধান, শত্রুকে এড়ানো, প্রতিরোধ করা এবং পালিয়ে আসা। এমন পরিস্থিতিতে এই প্রশিক্ষণই পাইলটকে টিকে থাকতে ও নিরাপদে ফিরে আসতে সাহায্য করতে পারে।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিউস্টন ক্যান্টওয়েল টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, প্যারাশুট নিয়ে করে নিচে নামার সময়ই একজন পাইলট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে পারেন।

তার মতে, তখনই ভালোভাবে বোঝা যায় কোথায় যাওয়া নিরাপদ আর কোথায় যাওয়া উচিত নয়।

 

তিনি বলেন, ‘প্যারাশুটে নামার সময় চারপাশে ভালো করে তাকাতে হবে। কারণ একবার মাটিতে নেমে গেলে দূর পর্যন্ত আর তেমন কিছু দেখা যায় না।’

ক্যান্টওয়েলের প্রায় ৪০০ ঘণ্টা যুদ্ধবিমান চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ইরাক ও আফগানিস্তানে মিশনও করেছেন।

কঠিন পরিস্থিতিতে প্যারাশুটে অবতরণের জন্য তিনি দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

 

তিনি ব্যাখ্যা করেন, প্যারাশুট নিয়ে মাটিতে নামার সময় গোড়ালি বা পায়ে আঘাত লাগার ঝুঁকি থাকে। তিনি বলেন, ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরা অনেক যোদ্ধার গল্প আছে, যারা শুধু বিমান থেকে ছিটকে পড়ার কারণেই গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তাই মাটিতে নামার পর প্রথম কাজ হলো নিজের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করা। অর্থাৎ, নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, আমি কি নড়াচড়া করতে পারছি? আমি কি সচল আছি?’

এরপর ফ্লাইট ক্রুরা পরিস্থিতি মূল্যায়ন শুরু করেন। তারা চেষ্টা করেন বোঝার, তারা ঠিক কোথায় আছেন, শত্রুপক্ষের পেছনে পড়েছেন কি না, কোথায় লুকানো যেতে পারে এবং কীভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব। ক্যান্টওয়েল বলেন, ‘যতক্ষণ সম্ভব শত্রুর হাতে ধরা পড়া এড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।’ তার কথায়, ‘আমি যদি মরুভূমির মতো কোনো জায়গায় পড়তাম, তাহলে প্রথমেই পানির উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম।’

তিনি আরো জানান, এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত নিজ দেশের কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (সিএসএআর) দলকে সক্রিয় করা হয়। এই দলগুলো উচ্চ প্রশিক্ষিত সেনা ও পাইলটদের নিয়ে গঠিত এবং জরুরি উদ্ধারের জন্য তারা আগে থেকেই প্রস্তুত অবস্থায় থাকে।

ক্যান্টওয়েল বলেন, ‘উদ্ধারকারী দল আছে, এই বিষয়টি একজন পাইলটকে মানসিকভাবে অনেকটা স্বস্তি দেয়।’ তিনি বলেন, ‘তারা জানে, আপনাকে উদ্ধার করতে তার দেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে তারা কোনো আত্মঘাতী অভিযানে যাবে না।’ তাই নিখোঁজ ক্রু সদস্যকেও এমনভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হবে, যাতে নিরাপদ উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

ক্যান্টওয়েল বলেন, মাটিতে নামার পর প্রথম কাজ হবে আত্মগোপন করা, যাতে শত্রুর হাতে ধরা পড়তে না হয়। তিনি বলেন, ‘আমি এমন একটি জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করব, যেখান থেকে আমাকে সহজে উদ্ধার করা যায়।’ শহরে হলে সেটি কোনো ভবনের ছাদ হতে পারে। আর গ্রামাঞ্চলে হলে এমন একটি খোলা মাঠ হতে পারে, যেখানে হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারবে। তার মতে, রাতে চলাচল করাই বেশি নিরাপদ।

তিনি আরো জানান, মার্কিন পাইলটদের সহায়তার জন্য তাদের ইজেকশন চেয়ার বা ফ্লাইট স্যুটে একটি ছোট কিট থাকে। এতে সাধারণ খাবার, পানি এবং টিকে থাকার কিছু সরঞ্জাম থাকে। পাশাপাশি যোগাযোগের জন্য রেডিওসহ অন্যান্য যন্ত্রও থাকে, যাতে দ্রুত উদ্ধার সম্ভব হয়। ক্যান্টওয়েল বলেন, তিনি যখন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান চালাতেন, তখন নিজের সঙ্গে একটি পিস্তলও রাখতেন।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এর পাইলটকে মার্কিন বিশেষ বাহিনী উদ্ধার করেছে বলে জানানো হয়েছে। তবে বিমানের অন্য ক্রু সদস্য, যিনি উড্ডয়নের সময় পাইলটের পেছনে বসেন তার ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনো জানা যায়নি।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে এফ-১৫ যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হয়েছিল। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীও এখন বিমানটির ক্রুকে খুঁজে পেতে তল্লাশি চালাচ্ছে বলেন দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তারা ক্রুকে জীবিত ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরুস্কারও ঘোষণা করেছে। 

ইরান একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরের ওপর আরো একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম বলছে, ভূপাতিত প্রথম বিমানটির উদ্ধার অভিযানের সময় হরমুজ প্রণালির কাছে এ-১০ যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। তবে বিমানটির পাইলট নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন।

ইরানে নিখোঁজ মার্কিন যুদ্ধবিমানের ক্রু সদস্যকে খুঁজে পেতে বিশেষজ্ঞ মার্কিন যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার ইউনিটগুলো ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ব্যবহার করে এলাকা চষে বেড়াবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহিনীর প্যারারেস্কিউ জাম্পারদের এক সাবেক কমান্ডার। বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই সাবেক কমান্ডার একথা বলেছেন।

তিনি বলেন, যদি উদ্ধার লক্ষ্যমাত্রা এমন এলাকায় থাকে যেখানে হেলিকপ্টার পৌঁছাতে পারে না, তাহলে এসি-১৩০ গানশিপ থেকে স্কোয়াডের সদস্যরা নেমে স্থলপথে উদ্ধার অভিযান চালাবে।

মাটিতে নামার পর প্যারারেস্কিউ জাম্পারদের লক্ষ্য থাকে নিখোঁজ ক্রু সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া, শত্রুকে এড়িয়ে যাওয়া বা প্রতিরোধ করা এবং এমন একটি স্থানে পৌঁছানো যেখান থেকে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হবে। এই প্যারারেস্কিউ সদস্যদের বিমানবাহিনীর ‘সুইস আর্মি নাইফ’ বলা হয়।