Image description

চার দফায় নির্বাচনের তারিখ পেছানোর পর ৬ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। এর আগেই ভিপি-জিএস ও এজিএস পদ থেকে নানা কারণ দেখিয়ে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ৫ প্রার্থী। এ ছাড়াও অন্যান্য পদে আরও কয়েকজন পারিবারিক-পারিপার্শ্বিক অবস্থা তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন ও ফেসবুক লাইভে এসে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।

পুরোদমে নির্বাচনী প্রচারণে শেষে, শেষ মূহুর্তে এসে প্রার্থীদের সরে দাঁড়ানোকে ভিন্ন চোখে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একাধিক প্রার্থীকে চাপ প্রয়োগ করে সরিয়ে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ ২৯ ডিসেম্বর সরে দাঁড়ান প্রার্থী সুজন চন্দ্র সুকুল। পরদিন ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। তবে এদিন ভোটগ্রহণ স্থগিতের ঘোষণা দেয় নির্বাচন কমিশন।

গত মঙ্গলবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত করা হয় নির্বাচন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি সিন্ডেকেট সভায় নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। নির্বাচন স্থগিত হওয়ার ১-২ দিন পর্যন্ত নির্বাচনী আমেজ ঝিমিয়ে গেলেও ফের জমে উঠেছে জকসু নির্বাচন। সোশ্যাল মিডিয়ায় বেড়েছে প্রচার-প্রচারণা, অনলাইনে প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে বিভাগীয় শহরে বাস দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রদল ও শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই নির্বাচনে মোট ৪টি প্যানেল অংশ নিলেও মূল লড়াইটি হতে যাচ্ছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের মধ্যে। একের পর এক স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলকে সমর্থন দিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করছে। জকসু নির্বাচনের ভিপি পদে মোট ১২ প্রার্থীর মধ্যে ৪ জন প্রকাশ্যে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলকে সমর্থন দিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা বলছেন, গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ৫ ঘন্টা আগেও একটি পক্ষকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যায় কয়েকজন। প্রার্থীরা নামমাত্র সংবাদ সম্মেলন ডেকে, হটাৎ ফেসবুক লাইভে বা স্ট্যাটাস দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। কারও চাপে প্রার্থীরা নির্বাচনের শেষ মূহুর্তে এসে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে অভিযোগের তীর নিক্ষেপ করেছেন একটি ছাত্র সংগঠনের দিকে।

তাদের অভিযোগ, আর্থিক প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে কয়েকজন প্রার্থীকে সরে দাঁড়াতে ‘বাধ্য’ করছে ছাত্রদল। তবে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফেসবুক পেজে চলে নানা আলোচনা-সমালোচনা। 

জানা গেছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই নির্বাচনে মোট ৪টি প্যানেল অংশ নিলেও মূল লড়াইটি হতে যাচ্ছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের মধ্যে। একের পর এক স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলকে সমর্থন দিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করছে। 

জকসু নির্বাচনের ভিপি পদে মোট ১২ প্রার্থীর মধ্যে ৪ জন প্রকাশ্যে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলকে সমর্থন দিয়েছেন। জিএস পদে নির্বাচন করতে চাওয়া প্রার্থী রাশেদুল ইসলাম (স্বতন্ত্র) রবিবার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা থাকলেও তিনি সরে দাঁড়াননি।

গত ২৯ ডিসেম্বর রাতে স্বতন্ত্র দুই প্রার্থী ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলকে সমর্থন দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তারা হলেন—স্বতন্ত্র প্যানেলের সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদপ্রার্থী তামজিদ ইমাম অর্ণব এবং ক্রীড়া সম্পাদক পদপ্রার্থী মো. মাজহারুল ইসলাম। তারা দুজনই ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেলের প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন জানান।

এর আগে ২৩ ডিসেম্বর ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ইশতেহার ঘোষণার দিন একযোগে তিনজন স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী ছাত্রদলের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি ১৪ ডিসেম্বর ছাত্রদলের প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে আরও দুইজন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। তারা হলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মিথুন চন্দ্র রায় এবং পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী তাওসিফ।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক প্রার্থী (স্বতন্ত্র) সুজন চন্দ্র সুকুলকে পুরান ঢাকার একটি হোটেলে আটকে রেখে নির্বাচন থেকে সরে যেতে বাধ্য করে ছাত্রদল। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সুজন চন্দ্র সুকুল রবিবার (৪ জানুয়ারি) রাতে ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তায় জানান, তিনি কোনো ধরনের চাপের মুখে পড়েননি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটের বিষয়ে এই প্রার্থী বলেন, ‘বাবা-মা না চাওয়ায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছি। নির্বাচনের আগের দিন একজনকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে আসি। এরপর থেকে একটা মানসিক হীনমন্যতায় ভুগতেছি। সরে দাঁড়ানোর কারণ অনেকে জানতে চাওয়ায় আমার ফেসবুক আইডি ডিএকটিভেট করি। পরে আজ জানতে পারি, আমার ফেসবুক ম্যাসেজিংয়ের একটি স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমার আইডি ডিএকটিভেট থাকা স্বত্বেও আইডি ব্যাবহার করে, কেউ তা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এটা করেছে। যেটা প্রপাকাণ্ডা আকারে ছড়ানো হচ্ছে। এ স্ক্রিনশটটি ছড়িয়ে বলা হচ্ছে, আমাকে চাপ দেয়া হচ্ছে, আসলে বিষয়টা এমন নয়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফারিহা তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘বাস্তবতা হচ্ছে সুজনকে খুন করা হবে এই থ্রেট দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন না করার জন্য সর্বোচ্চ চাপ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন করলে সুজনকে নিশ্চিত মেরে ফেলা হতো। এই চাপের জন্য নিজের জীবন বাঁচতে রাত ৩ টায় সুজন নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু যারা এটা করেছে তারা অবশ্যই ভুল করেছে। খুনের হুমকি দিয়ে ভোটের রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জায়গায় আগানো যায় না। ভোটের রাজনীতির হিসেব অন্যরকম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এতোটুকু মেধা আছে বাস্তবে কি ঘটেছে এটা বোঝার। নাহলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় চান্স পেত না।

১৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রেদুয়ান বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বসে যাওয়ার কয়েকটা কারণ রয়েছে। নির্বাচনী খরচ, প্রচারণায় লোকবল কম থাকায় প্রার্থীরা দলীয় প্যানেলের কাছে নিজেদের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় বড় প্যানেলগুলো নিজেদের প্রার্থীদের জিতিয়ে আনতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাধ্য করে থাকে, তা আর্থিক প্রলোভন, ভয়, হুমকির মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। অনেক প্রার্থী এ ফাঁদে পড়তেও পারে। এটা প্রমাণ করা নির্বাচন কমিশন ও বিপক্ষ প্রার্থীরা এটা অভিযোগ দিয়ে প্রমাণ করতে পারে।

উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, এবারের জকসু নির্বাচনে পদভিত্তিক প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ভিপি পদে ১২ জন, জিএস পদে নয়জন, এজিএস পদে আটজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র সম্পাদক, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে প্রত্যেকে সাতজন প্রার্থী রয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক এবং আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে ৫ জন করে প্রার্থী লড়ছেন।

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে ৮ জন করে, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে ৭ জন, পরিবহন সম্পাদক পদে ৪ জন, সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক পদে ১০ জন এবং পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক পদে ৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাহী সদস্য পদে লড়ছেন ৫৭ জন প্রার্থী। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১৬ হাজার ৬৪৫ জন।

এদিকে মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি ভবনের ৩৯টি কেন্দ্রে ১৭৮টি বুথে ভোটগ্রহণ করা হবে, যা একটানা বেলা ৩টা পর্যন্ত চলবে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে সবধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন