তথ্যপ্রবাহ এখন কল্পনার চেয়েও সহজতর। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এক ক্লিকেই মেলে সেবা। শারীরিক কসরত কমিয়ে অনলাইনেই মিটছে প্রয়োজন। কিন্তু এই বিদ্যা যেখানে শেখানো হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানেই লাগেনি ডিজিটালের ছোঁয়া; দেশের বেশিরভাগ স্কুল-কলেজে নেই ওয়েবসাইট। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ট্যাব দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ডিভাইসের প্রকৃত ব্যবহার হবে কি না এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই কী সুফল পাবে— উঠেছে এমন অনেক প্রশ্ন।
সরকারের ভাবনায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থা হবে স্মার্ট। সেজন্য নেওয়া হয়েছে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ ও ডিজিটাল ক্লাসরুম করার কর্মসূচি। এটি বাস্তবায়নে আসন্ন বাজেটে অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অর্থায়ন হলে ধীরে ধীরে প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হবে এই কর্মসূচি। কিন্তু সরকারের স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে কত ফারাক, তা বোঝা গেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের চিত্র দেখেই।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের আওতাধীন ২৩ হাজার ২৩৭টি স্কুল-কলেজের মধ্যে নিজস্ব ওয়েবসাইট নেই— এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩ হাজার ৯২টি। ওয়েবসাইট আছে, কিন্তু হালনাগাদ নেই ৯৬১টিতে। অর্থাৎ ডিজিটাল তথ্যসেবার বাইরে দেশের ৫৬ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
ওয়েবসাইট না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক তথ্য, ভর্তি বিজ্ঞপ্তি, শিক্ষক তালিকা, নোটিস, ফলাফল এবং জরুরি নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার কিংবা নাগরিক সেবা— সবকিছুতেই তারা অন্ধকারে, তৈরি হচ্ছে তথ্য বিভ্রাট। এমন বাস্তবতায় আগামী ৪ জুনের মধ্যে সব স্কুল-কলেজকে ওয়েবসাইট তৈরি বা হালনাগাদের জন্য গত ২১ মে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে মাউশি।
মাউশির স্কুল-কলেজ ছাড়াও বিভিন্ন স্তরে অনুমোদিত ৮ হাজার ৭৪৩টি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ৯ হাজার ১৭৬টি মাদ্রাসা। এসব প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট আছে কি না, জানা সম্ভব হয়নি সেই তথ্য। তবে মাদ্রাসাগুলোয় এই চিত্র আরও খারাপ বলে জানালেন অধিদপ্তরের এক কর্তা।
স্কুল-কলেজের ওয়েবসাইট না থাকায় ভর্তি নোটিস ফেসবুকে খুঁজতে হয় বলে জানালেন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু। তার অভিযোগ, গ্রাম অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোয় এই চিত্র নিয়মিত ব্যাপার। অতি সামান্য তথ্যের জন্য অভিভাবকদের কাজ ফেলে ছুটে যেতে হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
ওয়েবসাইটে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নাম, পদবি, নোটিস বোর্ড, সেবা বক্স (যেমন তথ্য অধিকার, অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা, নাগরিক ই-সেবা) থাকা বাধ্যতামূলক— বলছে মাউশির নির্দেশনা। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে ওয়েবসাইট নেই, বিষয়টিকে তাদের ঘাটতি ও ফাঁকফোকর হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয়ের জন্যও নির্দেশনা দিয়েছে মাউশি। অধিদপ্তরের অধীনে ২ হাজার ৪৪৩ ওয়েবসাইট থাকলেও তথ্যে ধরন অভিন্ন নয়। সেবা সহজ করতে এসব ওয়েবসাইটে একই ফরম্যাটের নামকরণ করতে বলা হয়েছে।
শুধু নির্দেশনা দিয়েই দায় সারেনি মাউশি, তা বাস্তবায়নে এই দপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন উইংয়ের পরিচালক এবং ইএমআইএস সেলের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্টকে সরাসরি দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় উপজেলার সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও নেই ওয়েবসাইট। ২০১৮ সালে সরকারি হওয়ার পরও সেটি করতে না পারার কারণ জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মাহবুব আলমের দাবি, ওয়েবসাইট চালানোর মতো নেই দক্ষ শিক্ষক। একটা ডোমেইন-হোস্টিং কেনা, ওয়েবসাইট ডিজাইন করা এবং তা নিয়মিত মেইনটেইন বা হালনাগাদ করতে যে টাকার দরকার, তারও উৎস অজানা। এজন্য শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন থেকে টাকা জোগাড় করতে হবে, যা অসম্ভব।
প্রায় একই অভিযোগ উপজেলার বাইশকাহনিয়া ভাঙ্গীরচর দাখিল মাদ্রাসার সুপার আনোয়ারুজ্জামানের। তিনি বললেন, সরকার স্মার্ট শিক্ষার জন্য ওয়েবসাইট করতে চিঠি দিয়ে আলটিমেটাম দিচ্ছে ঠিক আছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রান্তিক প্রতিষ্ঠানে কারিগরি খাতে বরাদ্দ বা দক্ষ জনবল নেই। ওয়েবসাইট বা কম্পিউটার অপারেট করবে, এমন শিক্ষকও নেই। এর সঙ্গে রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং বিদ্যুৎ না থাকার ইস্যু।
বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে ওয়েবসাইট না থাকার চিত্র উদ্বেগজনক উল্লেখ করলেন মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, বিভিন্ন সভায় ওয়েবসাইটবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এবার সতর্ক করে নোটিস দিয়েছি, যারা ওয়েবসাইট করবে না বা হালনাগাদ করবে না, তাদের বিরুেদ্ধ নেওয়া হবে পদক্ষেপ।