অনেকের ধারণা, বেশি খাবার খাওয়ার ফলেই শুধু ওজন বাড়ে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। শরীরের ওজন বৃদ্ধির পেছনে বিভিন্ন শারীরিক, হরমোনজনিত এবং জীবনযাত্রাসংক্রান্ত কারণও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই হঠাৎ করেই ওজন বাড়তে শুরু করলে বিষয়টিকে অবহেলা না করাই ভালো।
চিকিৎসকদের মতে, জীবনযাপন বা খাদ্যাভ্যাসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ছাড়াই যদি অস্বাভাবিকভাবে ওজন বাড়ে, তাহলে সেটি শরীরের ভেতরে অন্য কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, যদি এক সপ্তাহে প্রায় দেড় থেকে দুই কেজি ওজন বেড়ে যায় কিংবা এক মাসে মোট শরীরের ওজনের প্রায় পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
বয়স বাড়ার সঙ্গে বিপাকক্রিয়া কমে
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। একই সঙ্গে মাংসপেশির পরিমাণ কমে এবং শরীরে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ে। ফলে আগের মতোই খাবার গ্রহণ করলেও অনেকের ওজন বাড়তে পারে। যদিও এটি স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া, তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
হরমোনের ওঠানামা
জীবনের বিভিন্ন সময়ে হরমোনের পরিবর্তন ওজন বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে-
বয়ঃসন্ধিকাল: শরীরের দ্রুত বৃদ্ধি ও পরিবর্তনের কারণে এ সময় ওজন বাড়তে পারে।
মাসিক চক্র: অনেক নারী মাসিকের আগের সময়ে শরীরে অতিরিক্ত পানি জমার কারণে সাময়িকভাবে ওজন বৃদ্ধি অনুভব করেন।
গর্ভাবস্থা: গর্ভকালীন সময়ে শিশুর বৃদ্ধি ও শারীরিক পরিবর্তনের কারণে ওজন বাড়া স্বাভাবিক বিষয়।
মেনোপজ: ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার ফলে অনেক নারীর শরীরে অতিরিক্ত ওজন জমতে শুরু করে।
মানসিক চাপ ও ঘুমের অভাব
দীর্ঘ সময় মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এটি বিশেষ করে পেটের অংশে চর্বি জমাতে সহায়তা করে এবং বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে ক্ষুধা বাড়ে এবং ধীরে ধীরে ওজনও বাড়তে পারে।
কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা
কিছু শারীরিক সমস্যাও হঠাৎ ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। যেমন—
- থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি
- ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
- পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস)
- শরীরে পানি জমে যাওয়া বা এডিমা
- বিষণ্নতা বা অন্যান্য মানসিক সমস্যা
এ ছাড়া কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও ওজন বাড়তে পারে। অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ এবং কর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
যা করা যেতে পারে
হঠাৎ ওজন বাড়লে নিজেকে দায়ী না করে প্রথমে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো যেতে পারে। পাশাপাশি কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাসও উপকারী হতে পারে—
- অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া
- নির্দিষ্ট পরিমাণে খাবার গ্রহণ করা
- প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা
- ধ্যান বা যোগব্যায়ামের মাধ্যমে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা
- পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম নিশ্চিত করা
শরীরের হঠাৎ পরিবর্তন অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করতে পারে। তাই অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে কারণ খুঁজে বের করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।