‘হেলিকপ্টার থেকে বোম্বিং, ড্রোনে চিহ্নিত করে হত্যা’—তদন্ত কর্মকর্তার এই বক্তব্যকেই ঢাল বানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজের নির্দোষ দাবি প্রতিষ্ঠা করতে ৬৪ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য দাখিল করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগকেই ‘কাল্পনিক, বানোয়াট ও ষড়যন্ত্রমূলক’ আখ্যা দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২-এ এই লিখিত বক্তব্য দাখিল করেন ইনু।বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মামলাটিতে একমাত্র আসামি ইনু। হত্যার নির্দেশসহ তার বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তিতর্কের জন্য ২ এপ্রিল দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবীরাই আগে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যরা।
‘একটা লাঠিচার্জেরও বিপক্ষে ছিলাম’
লিখিত বক্তব্যে ইনু বলেন, ‘চব্বিশের আন্দোলনে কাউকে হত্যা তো দূরের কথা, কোনো মানুষের ওপর একটা লাঠিচার্জেরও বিরুদ্ধে ছিলাম আমি। তবু আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা বিদ্বেষপ্রসূত, ভিত্তিহীন, ষড়যন্ত্রমূলক এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি সম্পূর্ণ নিরপরাধ।’
ইনু দাবি করেন, চব্বিশের আন্দোলনে শুরু থেকেই সব জায়গায় বারবার বলপ্রয়োগ না করে আলোচনার টেবিলে বসে সমাধানের কথা বলেছিলেন। আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে এসে যখন বুঝলেন সরকারের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়, তখনই সরকারপ্রধানকে বলেছিলেন—এবার আর ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।
তার আত্মবিশ্বাস ছিল, কোনো আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘অনেকেই দেশ ছেড়ে যেতে বললেও যাননি’
২০২৪ সালের ৩ ও ৪ আগস্ট কাছের মানুষজন দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলেন এবং সব ব্যবস্থাও করেছিলেন বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন ইনু। তাদের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তো কোনো অন্যায় করিনি, তাহলে যুদ্ধ করে স্বাধীন করা আমার দেশ ছেড়ে আমি চলে যাব কেন?’
সরকার পতনের পরও বাসায় থেকেছেন, ঢাকার রাস্তায় কাজের প্রয়োজনে চলাচল করেছেন বলে জানান তিনি। পরে ওই ভবনে বসবাসকারী অন্য সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বাসার নিচে ‘মব ট্রায়াল’ করতে আসা লোকজনের কারণে আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেন। পরিস্থিতির বিচারে এখন বুঝতে পারছেন, দেশের মাটি না ছাড়লেও ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হতে হতে পারে।
তদন্তে গরমিলের অভিযোগ
তার বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে মাত্র একটি কুষ্টিয়ার ঘটনাসংক্রান্ত, বাকি সাতটি সারা দেশের বিভিন্ন ঘটনার। অথচ তদন্ত কর্মকর্তা কুষ্টিয়া ছাড়া অন্য কোনো স্থানে তদন্তে যাননি বলে দাবি করেন ইনু।
তিনি বলেন, ‘বোঝেন মাননীয় ট্রাইব্যুনাল, তদন্ত কর্মকর্তার এই তদন্ত রিপোর্ট কতখানি মনগড়া ও ত্রুটিপূর্ণ!’
হেলিকপ্টার থেকে বোম্বিং অভিযোগ প্রসঙ্গে
তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দিতে স্ব-বিরোধিতার অভিযোগ তুলে ইনু বলেন, এক জায়গায় বলা হয়েছে ‘ড্রোন দিয়ে চিহ্নিত করে হেলিকপ্টার দিয়ে আন্দোলনকারীদের উঠিয়ে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে’, আরেক জায়গায় বলা হয়েছে ‘হেলিকপ্টার দিয়ে বোম্বিং করা হয়েছে’।
তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘আন্দোলন চলাকালে ঢাকা কিংবা সারা দেশে কোথায় হেলিকপ্টার থেকে বোম্বিং করা হয়েছে, তার একটা প্রমাণ তদন্ত কর্মকর্তা কি ট্রাইব্যুনালকে দেখাতে পেরেছে? কিংবা কোনো আন্দোলনকারীকে হেলিকপ্টার দিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে?’ দুটো অভিযোগের একটিরও বাস্তব ভিত্তি নেই বলে দাবি করেন তিনি।
হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ প্রসঙ্গ
তদন্ত কর্মকর্তার বরাতে ইনু আরও বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপে ‘ঘর থেকে বেরুলেই গুলি করে হত্যা’র নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অথচ সেই ফোনালাপে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—কারফিউ মনোভাব কঠোর থাকবে, তবে গুলি করা যাবে না। কাউকে আটক করলেও থানায় কয়েক ঘণ্টা রেখে ছেড়ে দিতে হবে, কোর্টে চালান করা যাবে না।
এই অসংগতি তুলে ধরে ইনু বলেন, ‘যেহেতু তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্যের গড়মিল, সেহেতু এখানেই প্রমাণিত হয়— এই মামলা খুবই নিম্নমানের বানোয়াট ও মিথ্যা মামলা।’
এদিকে শুনানি শেষে ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শারীরিক অসুস্থতার কারণে মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে চাননি হাসানুল হক ইনু। এরপরও তাকে জোর করে আনা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘৬৪ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করতে চাইলেও তা গ্রহণ করা হয়নি এবং আসামির সপক্ষে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি।’ এতে আসামির আইনি অধিকার খর্ব করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।