দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। আসন হিসাবে ভূমিধস বিজয় হলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপির জন্য মোটেও সহজ ছিল না; বরং রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে অনেকগুলো জেলায় পুরোপুরি ধরাশায়ী এবং অনেকগুলো আসনেই নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন বিএনপি প্রার্থীরা। আবার নির্বাচনের আগে বিএনপিকে চাঁদাবাজ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতো দল, দখলবাজ, জুলাই সনদ/আন্দোলন বিরোধীসহ নানা রকম ফ্রেমিং করা হয়েছে। যা নির্বাচনের সময় মোকাবিলা করতে হয়েছে দল ও দলের প্রার্থীদের। যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও চলমান রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে হচ্ছে বিএনপিকে।
তাই জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে শেষ হওয়ার পরপরই এখন বিএনপির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। দলটির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই জানিয়েছেন, বিএনপি সরকার দ্রুতই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিতে চায়। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের (জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা) অনেক পদ বর্তমানে ফাঁকা রয়েছে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব এগুলোর নির্বাচনের ব্যবস্থা করব। এটি তো আর এক দিনে সম্ভব নয়, কিন্তু দ্রুত করার চেষ্টা করব।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করা। জনগণের দোরগোঁড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো আরো শক্তিশালী ও দুর্নীতিমুক্ত করা হবে।
একই দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকেও দ্রুততম সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার বিষয়টি আলোচনায় আসে বলে জানান অর্থ প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি স্থগিত আসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছেড়ে দেয়া আসন: এই দুটি আসনের নির্বাচন শেষ করেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায় নির্বাচন কমিশন। আর এই নির্বাচন শুরু হবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে এই তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে চিঠিও দিয়েছে।
বিএনপি নেতারাও চান দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন। দলের শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, মাঠ পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় করতে দ্রুত নির্বাচন প্রয়োজন। তাদের মতে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কার্যকর না হলে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বর্তমানে সারা দেশে আমিই একমাত্র নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এর কারণ হলো, ২০২১ সালের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জালিয়াতির মাধ্যমে আমাকে হারিয়ে দেয়া হয়েছিল। পরে আদালতের রায়ে আমি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। অন্য সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন না। মেয়র না থাকায় আপাতত প্রশাসক দিয়ে সেগুলো পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কারণ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নিজ নিজ এলাকার সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবহিত থাকেন, ফলে তার পক্ষে সেগুলো সমাধান করা সহজ হয়। নির্বাচিত মেয়র না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় সমস্যা হচ্ছে। যেমন আমি বাংলাদেশে একমাত্র মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনরত থাকলেও আমার সঙ্গে ৪১ জন সাধারণ কাউন্সিলর এবং ১৪ জন সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর থাকার কথা। কাউন্সিলর না থাকায় এত বড় শহরে সেবা দেয়া খুবই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যাচ্ছে, একই দিনে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটতে হচ্ছে। এ জন্য আমি মনে করি দ্রুততম সময়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। বিএনপি সরকারের উন্নয়নের যে মিশন ও ভিশন তা বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন যতটা সহজভাবে বিএনপি উতরে গেছে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন ততটা সহজ হবে না। কারণ স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়, এটি সরাসরি জনগণের সেবার সাথে সম্পৃক্ত। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয় লাভ করলেও ভোটের হারে খুব বেশি পিছিয়ে নেই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এমনকি রংপুর বিভাগের নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা (একটি আসন বাদে) জেলার সবকটি আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত। রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সব আসনে, পাবনার তিনটিতে, সিরাজগঞ্জে একটি আসনে জয় পেয়েছে দলটি। আবার খুলনায় মেহেরপুর, সাতক্ষীরায় সবকটি আসনে, বাগের হাটে চারটির মধ্যে তিনটি, যশোরের ছয়টির মধ্যে পাঁচটি, খুলনার দুটি, কুষ্টিয়াতে চারটির তিনটি, ঝিনাইদহের চারটির তিনটিতে, নড়াইলের দুটির একটিতেসহ এসব অঞ্চলে নিজেদের প্রভাবের জানান দিয়েছে জামায়াত।
এই নির্বাচনে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল যেই জামায়াত রাজধানীতে কোনো দিনও সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেনি সেই দলটি এবার রাজধানীতে ব্যাপক চমক দেখিয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৫টি আসনের মধ্যে সাতটিতে জয় পেয়েছে ১১ দলীয় জোট। আর তিনটিতে হেরেছে খুবই অল্প ব্যবধানে। ফলে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারে জামায়াত।
তবে বিএনপি ঠিক কিভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে বা করণীয় ঠিক করতে এখনো আলোচনা শুরুই করেনি। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো দলের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি। যখন আলোচনা হবে তখন দল নিশ্চয়ই সময়োপযোগী ও পরিপক্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে কি-না এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলছে না নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসউদ বলেন, সামনে একের পর এক স্থানীয় নির্বাচন করতে হবে ইসিকে। সংসদের দুটি আসনের ভোট গ্রহণের পর সিটি করপোরেশন দিয়ে স্থানীয় নির্বাচন শুরু হতে পারে। পর্যায়ক্রমে সব স্থানীয় নির্বাচন সেরে ফেলতে হবে। আমরা সব নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে প্রস্তুত হচ্ছি।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে স্থানীয় ভোটে দলীয় প্রতীক বাদ দেয়া হয়েছে। এখন সংসদ এটি অনুমোদন করলে বা কোনো পরিবর্তন আনলে সেই অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা মূলত সংসদ অধিবেশনের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছি।
বর্তমানে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় পাঁচটি স্তর রয়েছে। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ চার হাজার ৫৮১টি। এ ছাড়া ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৬৪টি জেলা পরিষদ (তিন পার্বত্য জেলাসহ), ৩৩০টি পৌরসভা এবং ১২টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে মেয়র, চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করা হয়। এরপর থেকেই এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চলছে প্রশাসক দিয়ে। তবে দেশের চার হাজার ৫৭৫টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের অপসারণ না করা হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেড় হাজারের বেশি চেয়ারম্যান ও মেম্বার পলাতক বা অনুপস্থিত। এদের মধ্যে প্রায় ৯০০ ইউনিয়নে প্যানেল চেয়ারম্যান এবং ৫০০টির বেশি ইউনিয়নে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। ২০২১ সালের জুন থেকে ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় ধাপে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনগুলোর মেয়াদ চলতি বছরের জুন থেকে শেষ হতে শুরু করবে। ফলে উন্নয়ন কাজ থমকে যাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ কাক্সিক্ষত নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সরকার নিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রতিশ্রুতি : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্র মেরামতের যে ৩১ দফা প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়েছিল তার ২০ দফাতে বলা আছে: ‘ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকতর স্বাধীন, শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান করা হবে। এই সব প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে যেন তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান ও উন্নয়ন কার্যক্রমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও অন্য কোনো জনপ্রতিনিধির খবরদারিমুক্ত স্বাধীন স্থানীয় সরকার নিশ্চিত করা হবে। মৃত্যুজনিত কারণ কিংবা আদালতের আদেশে পদ শূন্য না হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না। আদালত কর্তৃক দ-প্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নির্বাহী আদেশ বলে সাসপেন্ড/বরখাস্ত/অপসারণ করা হবে না।’
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও বলা হয়েছে: ‘নির্বাচন কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যকর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এরূপ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও তহবিল ব্যবস্থাপনার জন্য যথাযথ আইন প্রণয়ন করা হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে এরূপ প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক যথাযথ আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে।’
এদিকে জাতীয় নির্বাচনে প্রত্যাশিত (দলের প্রত্যাশা ছিল সরকার গঠন করার) ফলাফল করতে ব্যর্থ হলেও জামায়াত ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ শুরু করেছে। দলটি যেসব আসনে বিজয়ী হয়েছে সেগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য সব আসনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য তাদের অঘোষিত প্রার্থীদের নিয়ে মাঠে নেমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনীতিতে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যা যা করা প্রয়োজন জামায়াত এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার সবই করেছে। যা অন্য দলগুলোর জন্য অনুকরণীয়ও হতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখেও দলটি পবিত্র রমজান মাসে ইফতার মাহফিলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে, এলাকায় এলাকায় ইফতার সামগ্রি বিতরণ, খাদ্যপণ্য বিতরণ করছে জামায়াত। এছাড়া ঈদুল ফিতরের সময় ঈদের সামগ্রি বিতরণসহ দলটি নানামুখী কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বলেও জানা গেছে। দলটির একাধিক নেতা জানান, তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা ভালো ফল করতে চায়। বিশেষ করে ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনে বিজয়ী হতে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগের কথা ভাবছে দলটি। তাদের পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিও জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়া ৩০টি আসনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শক্ত অবস্থান করতে চায়।