Image description
সরকারে না থাকা নেতাদের দেওয়া হবে গুরুত্বপূর্ণ পদ ॥ ঈদের পর কাউন্সিলের প্রস্তুতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ে সরকার গঠনের পর এবার দল পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে বিএনপি। রোজা শেষে আসন্ন ঈদের পর দলের জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি শুরু করবে। দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে জাঁকজমকসহকারে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে করা হবে নতুন কমিটি। সরকারে স্থান না পাওয়া নেতাদের দেওয়া হবে গুরুত্বপূর্ণ পদ।

উল্লেখ্য, সদ্য ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক দল বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হয় না প্রায় ১০ বছর ধরে। এ পরিস্থিতিতে দল ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে দাবি ওঠে জাতীয় কাউন্সিলের। দলীয় হাইকমান্ডও চান সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলকেও যেন গতিশীল করা যায়। এমন তাগিদ থেকেই আসন্ন ঈদের পর জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি শুরু করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। এদিকে জাতীয় কাউন্সিলের আগে সারাদেশে দলের সর্বস্তরের কমিটিগুলোর মধ্যে যেগুলো এখনো মেয়াদোত্তীর্ণ সেগুলো দ্রুত পুনর্গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দলের ক’জন সিনিয়র নেতা ও বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের মাধ্যমে এসব কমিটি পুনর্গঠনের কাজ তদারকি করবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

বিএনপি সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন বৈরী পরিস্থিতি থাকায়, বিশেষ করে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়া এবং জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর গুরুতর অসুস্থ থাকা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের বাইরে থাকা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত দলের অসংখ্য নেতাকর্মী মামলা-হামলাসহ বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হওয়ায় জাতীয় কাউন্সিল করতে পারেনি বিএনপি। তবে এখন সেই পরিস্থিতি না থাকায় নতুন উদ্যমে জাতীয় কাউন্সিলের চিন্তা করছে বিএনপি। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন। তার নেতৃত্বেই সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছে বিএনপি। আর তার নেতৃত্বেই দলের জাতীয় কাউন্সিল হলে তা অধিকতর সফল হবে বলে দলের নেতাকর্মীরা প্রত্যাশা করছেন।

দল পুনর্গঠন কাজ সফল করতে বছরখানেক আগেই সিনিয়র নেতাদের নিয়ে ১০ সাংগঠনিক বিভাগের জন্য পৃথক কমিটি করেছিল বিএনপি। ওই কমিটি এ কাজে বেশ অগ্রসরও হয়েছিল। তবে সব সাংগঠনিক ইউনিটের কমিটি পুনর্গঠন শেষ করতে পারেনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগেই দল পুনর্গঠনের কাজের চেয়ে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ের পক্ষে কাজ করাকে অগ্রাধিকার দেয় বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা।

সূত্র জানায়, প্রায় ১০ বছর পর বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার আভাস পেয়ে সারাদেশে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। প্রতিটি সাংগঠনিক ইউনিট থেকে কাউন্সিলর হওয়ার জন্য নেতাদের মধ্যে চলছে প্রতিযোগিতা। এজন্য নিজ নিজ ইউনিটের কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে তারা দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত রেখেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনে বিজয়ের পর সরকার গঠন করলেও দলীয় কর্মকা- যাতে মন্থর হয়ে না পড়ে সেজন্য তৎপর রয়েছেন বিএনপি হাইকমান্ড। তাই আসন্ন ঈদের পর জাতীয় কাউন্সিলের জন্য প্রস্তুতি চলছে। এর আগে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সারাদেশের সকল জেলা-উপজেলা, পৌরসভাসহ সব ইউনিটের কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ হয়ে যাবে। এর পরই একটি সুবিধাজনক সময়ে জাতীয় কাউন্সিল করা হবে। আর এই কাউন্সিলের মাধ্যমেই দলের নতুন নির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে।

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল। তবে পরিস্থিতি প্রতিকূলে থাকায় দীর্ঘ ১০ বছর দলটির জাতীয় কাউন্সিল হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের পর পরিস্থিতি অনুকূলে আসায় নতুন উদ্যমে দলের জাতীয় কাউন্সিলের চিন্তা করা হয়। আর এ জাতীয় কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা অধিক সক্রিয় হবে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বিএনপি ভালো ফলাফল অর্জন করতে পারবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। 
অবশ্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা এখন চাঙ্গা। তাই তৃণমূল পর্যায়ে দল পুনর্গঠনের পর সকল কাউন্সিলরকে নিয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উৎসবমুখর পরিবেশে এবার দলের জাতীয় কাউন্সিল করতে পারবে। তাই সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন জাতীয় কাউন্সিলের জন্য। এছাড়া দীর্ঘদিন দলের জাতীয় কাউন্সিল না হওয়ায় অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতা কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাচ্ছেন না। জাতীয় কাউন্সিল হলে তাদের ভাগ্যের দ্বার উন্মোচন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বর্তমানে সারাদেশে বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক জেলাসহ তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন কমিটি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিলেন এমন ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করতে আগেই বলা হয়েছে দলীয় হাইকমান্ড থেকে। সেভাবেই নতুন কমিটিগুলো করা হচ্ছে বলে জানা যায়। তবে যারা দীর্ঘদিন দলীয় কর্মকা-ে নিষ্ক্রিয় তাদের পরিবর্তে সক্রিয় তরুণ নেতাদের নতুন কমিটিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানা যায়।

প্রায় ১০ বছর জাতীয় কাউন্সিল না হওয়ায় এখনো ১০ বছর আগে করা কমিটি দিয়েই চলছে বিএনপি। ৫৯২ সদস্যের পুরানো কমিটিতে শূন্য পদ রয়েছে অর্ধশতাধিক। এছাড়া এ কমিটির শতাধিক নেতা দলীয় কর্মকা-ে নিষ্ক্রিয়। জাতীয় কাউন্সিল হলে নতুন কমিটির বিভিন্ন পদে স্থান পাওয়ার সুযোগ পাবেন দেড়শতাধিক নেতা। তাই দীর্ঘদিন কাউন্সিল না হওয়ায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির পদপ্রত্যাশীরা মনোক্ষুণœœ। তবে এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই দলের ক’জন নেতাকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। আর জাতীয় কাউন্সিলের পর যোগ্য সবাইকে নিয়েই নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে নতুন নির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে। তাই নতুন কমিটিতে স্থান পেতে অনেক নেতা এখন থেকেই দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন বলে জানা যায়। 
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুসারে তিন বছর পর পর দলের জাতীয় কাউন্সিল করে নতুন কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় প্রায় ১০ বছর ধরে জাতীয় কাউন্সিল করতে পারেনি দলটি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর ৩ বছর পর পর জাতীয় কাউন্সিল করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিএনপি বিভিন্ন কারণে তা করতে পারেনি। তবে বিএনপি বেশ ক’দফা নির্বাচন কমিশনে গিয়ে জাতীয় কাউন্সিল না করতে পারার কারণ জানিয়ে রাখে।

জানা যায়, ঈদের পর দলের কিছু সিনিয়র ও মধ্যম সারির নেতাকে নিয়ে একটি জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটি দলের সর্বস্তরের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাউন্সিলের প্রস্তুতি এগিয়ে নেবে। এবারের জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভাপতিত্ব করবেন।

এর আগে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বেশ ক’দফা জাতীয় কাউন্সিল করার কথা দলের বিভিন্ন স্তর থেকে জোরেশোরে উচ্চারিত হলেও পরিবেশ প্রতিকূলে থাকায় শেষ পর্যন্ত তা আর সম্ভব হয়নি। এর পর ২০২০ সালে দেশে ভয়াবহ করোনা শুরু হলে নির্বাচন কমিশন থেকে জাতীয় কাউন্সিল করতে সময় বাড়িয়ে নেওয়া হয়। তবে দেশে করোনা পরিস্থিতি ভালো হলে জাতীয় কাউন্সিল করবে বলে জানালেও পরে সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় তখন জাতীয় কাউন্সিল করেনি বিএনপি। এ বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকেও অবহিত করা হয়।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দি হওয়ার আগে দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে সর্বস্তরে দল গুছিয়ে জাতীয় কাউন্সিল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এরপর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলকে ঢেলে সাজাতে সর্বস্তরের নেতাকর্মী জাতীয় কাউন্সিলের দাবি তুললেও পরিবেশ প্রতিকূলে থাকায় তা করা সম্ভব হয়নি। তবে এখন অনুকূল পরিবেশ থাকায় সারাদেশের সর্বস্তরে দল পুনর্গঠন করার কাজ দ্রুত অগ্রসর করে জাতীয় কাউন্সিল করা সম্ভব হবে। এছাড়া এবারের জাতীয় কাউন্সিল আগের ৬টি কাউন্সিলের চেয়ে বেশি জাঁকজমকভাবে করা হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।