Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট চলতি রমজান মাসেই করার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শিগগিরই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হতে বিএনপির নারী নেত্রীরা ইতোমধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। দলের নীতিনির্ধারক সিনিয়র নেতাদের কাছে তদ্বির চালিয়ে যাচ্ছেন। সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদে ৫০টি নারী আসন সংরক্ষিত রয়েছে।

আইন অনুযায়ী, শপথ নেওয়া সংসদ সদস্যদের তথ্য তিন কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ সচিবালয় থেকে ইসিতে পাঠানো হয়। সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল গেজেট প্রকাশের ২১ কার্যদিবসের মধ্যে দল বা জোট তাদের প্রার্থী তালিকা ইসিতে জমা দেয়। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ইসি সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের জন্য শপথ গ্রহণ করা সদস্যদের দলভিত্তিক তালিকা প্রস্তুত করে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন শিগগিরই অনুষ্ঠিত হবে। রোজার মধ্যেই আমাদের এই নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

এবারের সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৬টি আসনের গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে বিএনপি আসন পেয়েছে ২০৯টি, জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি, এনসিপি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুইটি এবং খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও গণসংহতি আন্দোলন পেয়েছে একটি করে আসন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছে ৭টি আসন।

নির্বাচন কমিশনের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী যে দল সাধারণ আসনে যতটি আসন পায় সে অনুপাতে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতি ছয়জনের বিপরীতে একটি নারী আসন পাওয়া যায়। দলগুলোর এবারের প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে বিএনপি পাচ্ছে ৩৫টি সংরক্ষিত নারী আসন। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পাচ্ছে ১৩টি আসন। স্বতন্ত্ররা এককভাবে নারী আসন পান না। তবে তারা জোট করে আবেদন করলে এবার ১টি নারী আসন পেতে পারেন।

বিএনপি থেকে সংরক্ষিত নারী আসনে আলোচনায় যারা এবারের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করছে বিএনপি। এরই ধারাবাহিকতায় আলোচনায় এবার সংরক্ষিত নারী আসনে কারা হতে যাচ্ছেন সংসদ সদস্য। এবারের নির্বাচনে সরাসরি ভোটে জয়ী হয়েছেন সাত নারী প্রার্থী। ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৮১ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তাদের মধ্যে মাত্র ৭ জন জয়ী হয়েছেন। তাদের বাইরেও অনেক নারী নেত্রী এবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই এবার সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হতে পারেন। বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে বিজয়ী হওয়ার কারণে তারা ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে ৩৫টি আসন পাবেন। সেক্ষেত্রে কারা এই আসনগুলোতে মনোনয়ন পাবেন তা নির্ভর করছে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তের ওপর। তবে বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে যেসব নারী রাজপথে ছিলেন তারাই এই ৩৫ আসনের দাবিদার এমনটি বলেছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের নেত্রীরা। তবে এই ৩৫টি আসনের জন্য প্রার্থী শতাধিক। দৌড়ঝাঁপ চলছে, চলছে হিসাব-নিকাশ। কারা পাচ্ছেন এই মহিলা এমপির ‘সোনার টিকিট’।

এবার সংরক্ষিত নারী আসনে মহিলা দলের ত্যাগী নেত্রী ও অপেক্ষাকৃত তরুণদের জায়গা দেবেন হাইকমান্ড। তাদের সঙ্গে প্রবীণ নেত্রীরাও জায়গা পাবেন। ২০০১ সালে যারা সংক্ষিত আসনের এমপি ছিলেন তাদের অনেকে বয়সের কারণে রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছেন। কেউ কেউ এখনো রাজনীতির মাঠে আছেন। তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ এবারও জায়গা করে নিতে পারেন।

বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর নিয়ে জানা গেছে, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান আলোচনায় আছেন। তিনি ২০০১ সালে সংরক্ষিত আসনে এমপি এবং মন্ত্রী ছিলেন। দলীয় সূত্রের দাবি, শতাধিক নেত্রী ইতোমধ্যেই সক্রিয়। তৃণমূলের অনেক ত্যাগী নেত্রী এরই মধ্যে ঢাকায় চলে এসেছেন। শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। তবে যাদের নাম আলোচিত হচ্ছে তারা হলেনÑ বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আকতার জাহান শিরিন, কেন্দ্রীয় নেত্রী শিরিন সুলতানা, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান এবং সহ-সভাপতি নাজমুন নাহার বেবী তাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে জোরালোভাবে। এ ছাড়া সাবেক এমপিদের মধ্যে রয়েছেনÑ শাম্মী আক্তার, নিলোফার চৌধুরী মনি, আসিফা আশরাফী পাপিয়া, রাশেদা বেগম হীরা, রেহেনা আক্তার রানু, ইয়াসমিন আরা হক, জাহান পান্না, বিলকিস ইসলাম। নতুন ও তরুণদের মধ্যে আলোচনায় যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে মাহমুদা হাবিবা, নিপুণ রায় চৌধুরী, অধ্যাপিকা রোকেয়া চৌধুরী বেবী, শাহানা আক্তার শানু, আরিফা সুলতানা রুমা, নাদিয়া পাঠান পাপন, অ্যাডভোকেট আরিফা জেসমিন নাহিন, সেলিনা সুলতানা নিশিতা, শওকত আরা উর্মি, নাসিমা আক্তার কেয়া, মনিরা আক্তার রিক্তা, আফরোজা খানম নাসরিন, বীথিকা বিনতে হুসেইন, রুকসানা খানম মিতু, আইসা সিদ্দিকা মানি, হেনা আলা উদ্দিন, ফরিদা ইয়াসমিন, সালমা আক্তার সোমা, শাহিনুর নার্গিস, শাহিনুর বেগম সাগর। অন্যদের মধ্যে রওশন আরা রতœা, রহিমা আক্তার হাসি, হাসনা জসিম উদ্দিন মওদুদ, অপর্ণা রায়, রাবেয়া আলম, জেবা আমিন খান, তানজিন চৌধুরী লিলি, সানজিদা ইসলাম (তুলি), বীথিকা বিনতে হুসেইন, ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, সামিরা তানজিনা চৌধুরী, সৈয়দা আদিবা হোসেন, হাসিনা আহমদ, শাকিলা ফারজানা, ফাতেমা বাদশা, মনোয়ারা বেগম মনি, জেলী চৌধুরী, মেহেরুন নেছা নার্গিস, জান্নাতুল নাঈম রিকু, জেসমিনা খানম, নাজমা সাঈদ, সুলতানা পারভীন। সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেনÑ কনক চাঁপা, বেবী নাজনীন, রিজিয়া পারভিন, সাংবাদিক সাবরিনা আহমেদ শুভ্রা, কাজী জেসিন।

জামায়াতে ইসলামীর মহিলা এমপি হিসেবে আলোচিত যারা

নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে জামায়াত পাচ্ছে ১২টি সংরক্ষিত নারী আসন। ফলে জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য নারী প্রার্থীদের নাম নিয়ে দলীয়ভাবে আলোচনা চলছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপিকা নুরুন্নিসা সিদ্দিকা, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সাবেক এমপি ডা. আমিনা বেগম রহমান (শফিকুর রহমানের স্ত্রী), ঢাকা মহানগর দক্ষিণের মহিলা বিভাগ জামায়াতের সিনিয়র সদস্য ও কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য সাবেক এমপি শাহান আরা বেগম, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি ব্যারিস্টার সাবিকুন্নাহার মুন্নী। তিনি ছিলেন ইসলামী ছাত্রী সংস্থার কেন্দ্রীয় সভাপতি। এ ছাড়া দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দের স্ত্রীর নামও রয়েছে জামায়াতের সংরক্ষিত আসনের তালিকায়। এ ছাড়া আলোচনায় আছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি সাঈদা রুম্মান, মহিলা বিভাগের নেত্রী মার্জিয়া বেগম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য খন্দকার আয়েশা খাতুন এবং কেন্দ্রীয় পরিষদ সদস্য ডা. হাবিবা চৌধুরী সুইট, জামায়াতে ইসলামীর রুকন ও নারী নেত্রী কাজী মারিয়া ইসলাম বেবি, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য রাবেয়া খানমের নামও শোনা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় মজলিসের শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ডা. শিরিন আক্তার রুনা, মহানগরীর মহিলা বিভাগের কর্মপরিষদ সদস্য তানহা আজমি। মহানগরী কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা-৪ আসন সদস্য সচিব নার্গিস খান, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য কানিজ ফাতেমা, সেলিনা আক্তার, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি আয়েশা সিদ্দিকা পারভীনেরও নাম আলোচনায় রয়েছে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যের কোটায়। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে নেওয়া হবে।

এনসিপির সংরক্ষিত নারী এমপি হিসেবে আলোচিত ৪ জন

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬টি আসনে জয়লাভ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ফলে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনে একজন নারী প্রার্থী পাচ্ছে দলটি। এনসিপি নেত্রীদের মধ্যে কে যাচ্ছেন সংসদে তা নিয়ে চলছে দলটির ভেতরে-বাইরে জোর আলোচনা। জানা গেছে, এনসিপির নেত্রীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আলোচনায় রয়েছেন। এনসিপির বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, জাতীয় সংসদে এনসিপি থেকে সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে আলোচনায় আছেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন, ঢাকা-১৯ আসনে শাপলা কলি প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা দিলাশানা পারুল, ঢাকা-২০ আসনে শাপলা কলি প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নাবিলা তাসনিদ ও দলটির যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতু। তবে দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলের পক্ষ থেকে সংসদে ডা. মাহমুদা মিতুর কথাই চিন্তা করা হচ্ছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা। দলের শীর্ষ নেতৃত্বও তার প্রয়োজন মনে করছে সংসদে। বিশেষ করে ঝালকাঠি-১ আসন থেকে শাপলা কলি প্রতীকে নির্বাচন করার কথা ডা. মাহমুদা মিতুর। পরে দলীয় সিদ্ধান্তে জোটের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়ান তিনি। সে সময় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাকে সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য করার আশ্বাস দিয়েছিল বলেও জানা গেছে। এছাড়া নির্বাচনী প্রচারণাকালে সারাদেশে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন জনসভায় ও পথসভায় অংশ নিয়ে তিনি ব্যাপক আলোচনায় আসেন।