ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকেই তৃণমূলে বিশ্লেষণ হচ্ছে জামায়াতের পরাজয় নিয়ে। নির্বাচনে জামায়াত ক্ষমতায় না গেলেও অন্তত ১২০টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল বলে মনে করছেন জামায়াতের বড় একটি অংশ। তবে দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতারা দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই নেতা আর রাজনৈতিক দুর্বলতাকে পরাজয়ের অন্যতম কারণ বলে অভিযোগ করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যে কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটি করা হয়েছিল তার আহ্বায়ক ছিলেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম ছিলেন সদস্য সচিব। কমিটিতে থাকা অধিকাংশ সদস্যের দাবি, দুই নেতার অসহযোগিতা ও রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণে জামায়াতের এই পরিণতি হয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি থেকে আসন পরিচালনা কমিটিতে নিয়মিত হয়নি সমন্বয়।
জানা যায়, নির্বাচনকালীন নিয়মিত সভা বাদ দিয়ে আমিরে জামায়াতের সঙ্গে বিভিন্ন জেলা সফরে ব্যস্ত ছিলেন জামায়াতের দুই নেতা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন শেষ হলেও এখন পর্যন্ত পর্যালোচনা সভার কথা আলোচনায় আসেনি জামায়াতের নির্বাহী সভায়। পর্যালোচনা কবে হবে বা আদৌ করা হবে কি না এটা নিয়েও আলোচনা হয়নি। শুক্রবার ভার্চুয়ালি কেন্দ্রীয় শূরা সভা হলেও সেখানেও স্পষ্ট করে নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ আদৌ করা হবে কি না, তা আলোচনায় আসেনি।
কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকা একটি সূত্র জনকণ্ঠকে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি করা হয়েছিল তার মধ্যে ছিল চরম সমন্বয়হীনতা। নিয়মিত কমিটির বৈঠক দূরের কথা, দায়িত্বপ্রাপ্ত আহ্বায়ক এটিএম মা’ছুম ও মাওলানা আবদুল হালিমকে ফোনে পায়নি কমিটির অন্য সদস্যরা।
একই অভিযোগ রয়েছে জেলা ও আসন পরিচালনা কমিটি থেকেও। বিভিন্ন জেলা থেকে নানাভাবে যোগাযোগ করা হলেও কোনো প্রকার দিকনির্দেশনা দেয়নি কেন্দ্রীয় কমিটি। কেন্দ্র কিভাবে পরিচালনা হবে, নির্বাচনের দিন কাজের ধরন কেমন হবে তার কোনো তথ্যই পায়নি জেলা-উপজেলার নেতারা। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্র ও তৃণমূল উভয় স্থানেই চলছে সমালোচনা। কিছু কিছু কেন্দ্রে দলের নেতারা মনোনয়ন প্রত্যাহার না করার কারণে সমালোচনা হচ্ছে জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে নরসিংদী-২ (পলাশ) আসনে মনোনয়ন জমা দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আমজাদ হোসাইন। পরবর্তীতে ১১ দলীয় জোটের সমঝোতার কারণে আসনটি দেওয়া হয় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মো. গোলাম সারোয়ার ওরফে সারোয়ার তুষারকে। এর পর থেকেই আসনটি নিয়ে টানাটানি শুরু হয় জামায়াতের নেতাকর্মীদের মাঝে। যেখানে জামায়াত সাংগঠনিক শৃঙ্খলা প্রমাণ করে বিভিন্ন আসনে অন্য দলের প্রার্থীদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করে নজির তৈরি করছিল, সেখানে উল্টো চিত্র দেখা যায় নরসিংদী-২ আসনে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বারবার মনোনয়ন প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও কেন্দ্রীয় জামায়াতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় নরসিংদী জেলা জামায়াতের সেই নেতা। হুমকি দেওয়া হয় নানাভাবে। বিষয়টি নিয়ে জামায়াত নেতা মাওলানা হালিমের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা। জামায়াত নেতা আমজাদ হোসাইনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে বিভিন্ন স্তর থেকে। কিন্তু জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখেন এনসিপির প্রথম সারির নেতারাও। তাদের দাবি, স্থানীয় জামায়াত বিএনপিকে আসন দেওয়ার জন্য আঁতাত করে। যেখানে জামায়াতের আমির তুষারের হাতে শাপলা কলি তুলে দেন, সেখানে জামায়াত নেতা আমজাদ থেমে থাকেননি। কখনো প্রকাশ্যে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চান, আবার কখনো গোপনে। এত কিছুর পরও জামায়াত তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়, বিএনপির সঙ্গে আঁতাত করেই নরসিংদীতে এমন কাজ করেছেন জামায়াতের এক নেতা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে কমিটি তৈরি করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই কমিটিতে মোট ছিলেন ২৮ জন। যেখানে আহ্বায়ক হিসেবে ছিলেন মাওলানা এটিএম মা’ছুম, সদস্য সচিব হিসেবে ছিলেন মাওলানা আবদুল হালিম। কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, অ্যাডভোকেট মোয়াযয্যম হোসাইন হেলাল, মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান, মোবারক হোসাইন, মো. আব্দুর রব, মাওলানা আফম আব্দুস সাত্তার, অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, প্রফেসর ডা. নজরুল ইসলাম, প্রফেসর ডা. একেএম ওয়ালিউল্লাহ, সাবেক অতিরিক্ত সচিব খন্দকার রাশেদুল হক, সাবেক সিনিয়র সচিব মু. সফিউল্লাহ, সাবেক সচিব আব্দুল কাইয়ুম, সাবেক সচিব আব্দুল্লাহ আল মামুন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) গোলাম মোস্তফা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সফিকুল ইসলাম, মেজর (অব.) মুহাম্মদ ইউনুস আলী, জাহিদুর রহমান, অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম, রাজিবুর রহমান পলাশ, ইঞ্জিনিয়ার ড. জুবায়ের আহমদ, ড. হাফিজুর রহমান, অধ্যাপক সাইফুল্লাহ মানছুর, মোস্তফা মনোয়ার, মঞ্জুরুল ইসলাম, জাহিদুল ইসলাম।
কমিটি গঠনের পর থেকে দুটি সভা করা হয় সব সদস্যকে নিয়ে। তারপর থেকে আবদুল হালিমের দেখা পাওয়া যায়নি। জানা যায়, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে বিভিন্ন সময় আমিরে জামায়াতের জনসভায় যেতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন এই নেতা। মাওলানা মা’ছুম জনসভাতে কম গেলেও কেন্দ্রীয় অফিসে উপস্থিতি একেবারেই লক্ষ্য করা যায়নি তার। বিভিন্ন জেলা থেকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যরা ঢাকায় এসেও দেখা পাননি এই দুই নেতার। অনেকটা ক্ষোভ নিয়ে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। এমন অভিযোগ ছিল দিনাজপুর জেলার আসন পরিচালকদের।
দিনাজপুর জেলার ৬টি আসনের ৩টি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধানের সঙ্গে কথা হয় জনকণ্ঠের। নির্বাচনে সব আসনেই পরাজিত হয়েছে ১১ দলীয় জোট। ৬টি আসনের মধ্যে ৫টি আসনে প্রার্থী ছিল জামায়াতের। দায়িত্বে থাকা ৩টি আসনের পরিচালক জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের উত্তরবঙ্গে দিনাজপুরের ৬টি আসনই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। একটু হিসাব করলেই দেখা যাবে অধিকাংশ আসনে অল্প ভোটের ব্যবধানে আমরা হেরেছি। এর কারণ ছিল সমন্বয়হীনতা। মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছে, কিন্তু আমরা তা ধরে রাখতে পারিনি। কেন্দ্রগুলো কিভাবে চলবে, শেষ মুহূর্তে এসে আমরা কোনো কূলকিনারা পাইনি। একাধিকবার কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও কোনো সমাধান পাইনি। নির্বাচনের দিন কিভাবে কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে, সমস্যা হলে কোথায় কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে তা নিয়েও কোনো বার্তা আমরা পাইনি। কেন্দ্রীয় ইলেকশন হেডকোয়ার্টার পরিচয়ে আমাদের একটি হটলাইন নম্বর দেওয়া হয়েছিল। এর বাইরে আর কোনো কেন্দ্রীয় নেতাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
ইলেকশন হেডকোয়ার্টারে যুক্ত ছিলেন এমন একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হলে তারা জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা আমাদের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেছি। নির্বাচনের আগের ১ সপ্তাহ দিন-রাত কাজ করেছি। আমিরে জামায়াত দুইবার আসলেও এটিএম মা’ছুম বা মাওলানা হালিমের দেখা আমরা পাইনি। অনেক সময় বিভিন্ন জেলা থেকে সমস্যা সম্পর্কিত কল আসলেও আমরা নিজ উদ্যোগে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম জনকণ্ঠকে বলেন, অনেক সময় হয়তো আসন পরিচালকদের ফোন ধরার সুযোগ হয়নি। তবে পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। ইলেকশন হেডকোয়ার্টারে না যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা প্রত্যেকে একেক কাজে ছিলাম। কিছু কিছু সমস্যা হয়তো হয়েছে। তা না হলে সব আসনেই ভালো ফলাফল দেখা যেত। আমাদের সমস্যাগুলো কী ছিল এগুলো আমরা পর্যালোচনা করলে হয়তো বের হয়ে আসবে। কার কোথায় ঘাটতি ছিল সব কিছুই দেখা যাবে।
নির্বাচন শেষ হওয়ার ৮ দিনেও পর্যালোচনা সভা হয়নি, কবে নাগাদ হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন শেষ হয়েছে, আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। খুব শীঘ্রই পর্যালোচনা সভা হবে। তখন জানিয়ে দেওয়া হবে।