সদ্য শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন তারেক রহমান। রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি তিনি মন্ত্রিসভায় জায়গা দিয়েছেন বিশিষ্ট কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদ ড. খলিলুর রহমান। তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে টেকনোক্র্যাট কোটায়।
খলিলুর রহমান বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। সিভিল সার্ভিস থেকে জাতিসংঘ—প্রতিটি স্তরেই তিনি দায়িত্বশীলতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বিএনপির মন্ত্রিসভায়
নির্বাচনের আগে খলিলুর রহমান দায়িত্ব পালন করেন মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে। নির্বাচিত সরকার গঠনের পর সেই অন্তর্বর্তী প্রশাসন বিলুপ্ত হলেও নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন তিনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর মন্ত্রিসভায় তাকে টেকনোক্র্যাট কোটায় নেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তিনি।
বিসিএসে প্রথম খলিলুর
খলিলুর রহমান ১৯৭৭ সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) নিয়মিত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন এবং একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।
১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ১৯৮০-৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে তিনি আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়া বিভাগ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৫ সালে তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে যোগ দেন। সেখানে সাধারণ পরিষদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
জাতিসংঘে দীর্ঘ ও সফল অধ্যায়
১৯৯১ সালে তিনি জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। জাতিসংঘে দীর্ঘ ২৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি অর্থনীতি, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-জাতিসংঘ মহাসচিবের নির্বাহী কার্যালয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক প্রধান এবং আঙ্কটাড-এর প্রযুক্তি বিভাগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি বিশ্লেষণ গ্রুপের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন।
২০০১ সালে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সম্মেলনে কর্মসূচির খসড়া প্রণয়নে নেতৃত্ব দেন খলিলুর রহমান। উন্নয়ন অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ইস্যুতে তার কাজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়।
ড. খলিলুর রহমান বেসরকারি ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমানে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। এছাড়া ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমান-এর একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
চব্বিশের গণঅভ্যুথানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান খলিলুর। পরবর্তীতে রোহিঙ্গা ইস্যুসহ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়গুলোতে প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।
টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে নতুন অধ্যায়
দীর্ঘ কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার সরাসরি রাজনৈতিক সরকারের অংশ হলেন ড. খলিলুর রহমান। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে এবার সামলাবেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।