Image description
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে (এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড) সই করেছে বাংলাদেশ। চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য প্রবেশে বিদ্যমান সাধারণ গড় শুল্কহার সাড়ে ১৫ শতাংশ। এর ওপর বাড়তি পাল্টা শুল্ক আরোপ হবে ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্যে মোট শুল্কের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে সাড়ে ৩৪ শতাংশ।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তিতে এমন কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যাতে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও ডিজিটাল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বাড়ার যথেষ্ট উপাদান রয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ দেশের ভালোর থেকে খারাপই হয়েছে বেশি। তারা জানান, চুক্তির ফলে দেশের রপ্তানি বাড়বে না; উল্টো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতির লঙ্ঘন হওয়ায় অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যে ‘পাল্টা শুল্ক’ অব্যাহতি পাবে বলে প্রচার করা হচ্ছে, তা বহু শর্তযুক্ত। ওই শর্ত মেনে আদৌ বাংলাদেশ সুবিধা করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। 

চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে যা দেবে: এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেডের আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে- রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সরঞ্জাম, জ্বালানি পণ্য, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, পোলট্রি, বাদাম ও ফল। এছাড়া বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকারকদের জন্য দীর্ঘদিনের কিছু অশুল্ক বাধা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ মার্কিন নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান অনুযায়ী তৈরি গাড়ি গ্রহণ করবে, মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদিত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম গ্রহণ করবে এবং পুনর্নির্মিত (রিম্যানুফ্যাকচারড) পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা ও লাইসেন্সিং বাধা তুলে নেবে।

ডিজিটাল বাণিজ্য সহজ করতে বাংলাদেশ সীমান্ত পাড়ের তথ্য প্রবাহের অনুমতি দেবে এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর শুল্কমুক্ত নীতি বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেবে। পাশাপাশি কাস্টমস প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে বাংলাদেশ যা পাবে: চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ শুল্ক সুবিধা দেয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যের জন্য বিশেষ শুল্ক সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্য পারস্পরিক শুল্কের ক্ষেত্রে শূন্য হারের সুবিধা পাবে। এই ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও বস্ত্রপণ্য হ্রাসকৃত এই শুল্কহারে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে। তবে এই পরিমাণ নির্ধারিত হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রপ্তানিকৃত বস্ত্রজাত পণ্যের রপ্তানি পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে-যেমন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা এবং কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক বস্ত্র উপকরণ।

বাংলাদেশকে যা করতে হবে: চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার এবং যৌথ দর কষাকষির সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একইসঙ্গে জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ সুরক্ষা জোরদার, পরিবেশ আইন কার্যকর প্রয়োগ, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও ভর্তুকি সংক্রান্ত বাজার বিকৃতি কমানোর বিষয়েও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী মেধাস্বত্ব সুরক্ষা জোরদার এবং দুর্নীতি দমন আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েকটি বড় বাণিজ্যিক ক্রয়ের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-বিমান ক্রয়, প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা) আমদানি। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং আগামী ১৫ বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য ক্রয়। চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ সরবরাহ চেইন নিরাপত্তা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধ এবং অন্যায্য বাণিজ্য কার্যক্রম মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কোনো ‘নন-মার্কেট ইকোনমির’ সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে না। ফলে বাংলাদেশ চীন বা রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা অন্য কোনো ধরনের চুক্তি করতে পারবে না বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আর এসব দেশের সঙ্গে কোনো রকম চুক্তি করলে যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের উপর প্রথম যে ৩৭ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেছিল, তা কার্যকর করবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা যেভাবে দেখছেন: ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক থাকে কি না, তা বিবেচনায় নিয়ে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কৌশলে বিষয়টি সামাল দিতে হবে। অন্যথায় হিতে-বিপরীত হতে পারে।

সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে সরকার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা ৮৫ থেকে ৮৬ শতাংশ পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা মিলবে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা বা সুতা নিয়ে পোশাক তৈরি করে সে দেশে রপ্তানিতে পাল্টা শুল্ক শূন্য করার কথা বলা হয়েছে। তবে তা পুরো মূল্যের ওপর, নাকি কেবল সুতার দামের ওপর তা পরিষ্কার নয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়বে বলে ধারণা দেয়া হচ্ছে, তা ঠিক নয়। রপ্তানি বাড়লেও তা ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি হবে না। অথচ এ সুবিধা নিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল সংখ্যক পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হয়েছে। যে পরিমাণ কৃষি, জ্বালানি, অস্ত্র কেনার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তাতে বাংলাদেশ কতোটা লাভবান হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

অবশ্য বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যে পারস্পরিক শুল্ক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, তা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নয়। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি না হলে এই সুবিধা অন্য দেশকেও দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক পণ্য আমদানিতে শুল্কসুবিধার প্রভাবে আমদানি পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ে বিরাট চাপ তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, এটি বাণিজ্য চুক্তি ভাবলে ভুল হবে। বাণিজ্য চুক্তির চেয়েও বেশি কিছু। চুক্তিতে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। চুক্তি লঙ্ঘন করলে গত বছরের এপ্রিলে আরোপিত ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়া হয়েছে। 

চুক্তিটি এখনও কার্যকর হয়নি। উভয় দেশের সংসদে তা পাস করতে হবে। এর আগে বাংলাদেশকে আইন সংশোধন করতে হবে। এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে পাল্টা শুল্ক আরোপ করার বৈধতা নিয়ে মামলা হয়েছে।

ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান বলেন, এ চুক্তি এমন এক চুক্তি, যার থেকে বের হওয়া কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য সব দেশ চুক্তি করেছে, বিশেষত কম্বোডিয়া বা মালয়েশিয়া যে চুক্তি করেছে তাতে নমনীয় শব্দ ব্যবহার হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার পক্ষে কঠোর নীতি আরোপ করেছে। এর সংশোধনে সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এমসিসিআইর সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, এটা একটা আইনগত চুক্তি। ফলে জোর করে চুক্তি বদল করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে এগোতে হবে। চুক্তিতে ‘রুলস অব অরিজিন’-এর বিষয়টি যেভাবে এসেছে, তাতে বাংলাদেশের বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষিত হয়নি।