কোথাও যাচ্ছি না, আমার শেকড় এই মাটিতেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা পরাজয় মেনে নিয়ে গঠনমূলক রাজনৈতিক ভূমিকা পালনের অঙ্গীকার করেছেন। নির্বাচন শেষে নিজের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া স্ট্যাটাসে তিনি এসব কথা জানান।
ঢাকা-৯ আসনে ফুটবল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সাবেক এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা এই নেত্রী । ভোটের ফলাফলে তিনি পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট। পরাজয় মেনে নিয়ে তিনি জানান, রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন না বরং মানুষের পাশে থেকেই গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবেন।
নির্বাচনে বিজয়ী দল বিএনপি এবং ঢাকা-৯ আসনের বিজয়ী প্রার্থী হাবিবুর রশীদ হাবিবকে অভিনন্দন জানান তাসনিম জারা। তিনি জানান, ফল ঘোষণার পর রাতেই বিজয়ী প্রার্থীকে ফোন করে ব্যক্তিগতভাবে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ঢাকা-৯ ও বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থে তাঁদের সাফল্য কামনা করি। আমরা একটি গঠনমূলক শক্তি হিসেবে কাজ করব। জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে আমাদের সমর্থন থাকবে। তবে মানুষের জন্য ক্ষতিকর কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার থাকব।
নারীদের অংশগ্রহণকে বড় অর্জন উল্লেখ করে তাসনিম জারা বলেন, তাদের ক্যাম্পেইনে নারীদের অভূতপূর্ব উপস্থিতি ছিল অনুপ্রেরণাদায়ক। সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নারীরা থাকলে আলোচনার মান বদলে যায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তরুণীদের উদ্দেশে তার বার্তা, স্বপ্ন দেখতে ভয় পেও না, ক্ষমতার কেন্দ্রে তোমাদেরও অধিকার আছে।
ভলান্টিয়ারদের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন রাজনীতির হৃদস্পন্দন তারাই। সাধারণ নাগরিকদের রাজনৈতিক সক্রিয়তার যে দৃষ্টান্ত তারা তৈরি করেছেন, তা বিরল। মন খারাপ না করে সংগঠিত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
অনেকে ভাবছেন নির্বাচন শেষ হলেই তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরে যাবেন এমন ধারণার জবাবে তাসনিম জারা বলেন, আমি কোথাও যাচ্ছি না। আমার শেকড় এই মাটিতে, আমার কাজও এখানে। একটি নির্বাচনের জন্য এই পথচলা শুরু হয়নি। লক্ষ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। এটি দীর্ঘ পথ।
তিনি আরও বলেন, পরিচ্ছন্ন রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে হলে শক্তিশালী সংগঠন দরকার। নির্বাচনের দিনে প্রতিটি বুথে সাহসী পোলিং এজেন্ট এবং কেন্দ্রের বাইরে সচেতন নাগরিকদের উপস্থিতি জরুরি। ভয়ভীতি মোকাবিলায় সক্ষম সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।
স্ট্যাটাসে তিনি জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়া অকুতোভয় যোদ্ধাদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। পাশাপাশি অধ্যাপক ইউনূস, তাঁর টিম এবং নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানান একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য।
৪৪ হাজার প্লাস ভোটকে বড় ভিত্তি উল্লেখ করে তাসনিম জারা বলেন, তাদের ক্যাম্পেইন প্রমাণ করেছে মানুষ ক্লিন পলিটিক্স চান। রাজনীতির পুরোনো ছক ভেঙে ঢাকা-৯ ও বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাবেন বলেও জানান তিনি।
শেষে তিনি লেখেন, আমাদের সেরা সময় এখনো সামনে।
নীচে তাঁর ফেসবুক স্টাটাসটি হুবুহু তুলে ধরা হলো
নির্বাচন পরবর্তী কিছু ভাবনা:
১. জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য আমি বিএনপিকে অভিনন্দন জানাই। ঢাকা-৯ আসনে বিজয়ী প্রার্থী হাবিবুর রশীদ হাবিবকেও অভিনন্দন। গতকাল রাতেই আমি তাঁকে ফোন করে ব্যক্তিগতভাবে শুভকামনা জানিয়েছি। ঢাকা-৯ ও বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থে তাঁদের সাফল্য কামনা করি। আমরা একটি গঠনমূলক শক্তি হিসেবে কাজ করব। জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে আমাদের সমর্থন থাকবে। কিন্তু মানুষের জন্য ক্ষতিকর কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার থাকব।
২. আমাদের ক্যাম্পেইনে নারীদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ ছিল এক বড় প্রাপ্তি। অনেক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় আমি দেখেছি যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নারীরা থাকলে আলোচনার মান বদলে যায়। যে কিশোরী বা তরুণীরা এই প্রচারণা আগ্রহ নিয়ে দেখেছো, তোমাদেরকে বলছি: স্বপ্ন দেখতে ভয় পেয়ো না। ক্ষমতার কেন্দ্রে তোমারও অধিকার আছে। আমাদের আরও বেশি করে সামনে আসতে হবে।
৩. আমাদের ভলান্টিয়াররা এই পরিচ্ছন্ন রাজনীতির হৃদস্পন্দন। সাধারণ নাগরিকদের রাজনৈতিক সক্রিয়তার যে অনন্য দৃষ্টান্ত আপনারা তৈরি করেছেন, তা সচরাচর দেখা যায় না। মন খারাপ করবেন না। আপনারা মানুষের মন জয় করেছেন, আর সেটাই রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন জয়। আমরা সংগঠিত থাকব, সোচ্চার থাকব, একসাথে থাকব।
৪. অনেকে ভাবছেন নির্বাচন শেষ হলেই হয়তো আমি যুক্তরাজ্যে ফিরে যাব। আমি কোথাও যাচ্ছি না। আমার শেকড় এই মাটিতে, আমার কাজও এখানে। একটিমাত্র নির্বাচনের জন্য আমরা এই পথচলা শুরু করিনি। আমাদের লক্ষ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। এটি দীর্ঘ পথ। আর আপনাদের সঙ্গে এই পথ চলা আমার জন্য সম্মানের।
৫. আমরা প্রমাণ করেছি পরিচ্ছন্ন প্রচারণায় মানুষের হৃদয় জয় করা যায়। তবে আমাদের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। পরিচ্ছন্ন রাজনীতি টিকে থাকতে হলে তাকে শক্তিশালী হতে হবে। নির্বাচনের দিনে প্রতিটি বুথে সাহসী পোলিং এজেন্ট এবং কেন্দ্রের বাইরে সচেতন নাগরিকদের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক মডেলকে রক্ষা করতে হলে আমাদের আরও শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে, যা যেকোনো ভয়ভীতি মোকাবিলা করতে সক্ষম।
৬. আজকের দিনটি সম্ভব হতো না যদি জুলাইয়ের অকুতোভয় যোদ্ধারা রাজপথে বুক পেতে না দাঁড়াতেন। গণতন্ত্রের যে স্বাদ আমরা পাচ্ছি, তা তাঁদের অকল্পনীয় আত্মত্যাগের ফসল। আমি ধন্যবাদ জানাই অধ্যাপক ইউনূস ও তাঁর টিম, এবং নির্বাচন কমিশনকে। এমন এক জটিল সময়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না; কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক জাতি হিসেবে টিকে থাকার জন্য এটি ছিল অত্যন্ত জরুরি একটি দায়িত্ব।
৭। ৪৪,০০০ প্লাস ভোট একটি বিশাল ফাউন্ডেশন। আমাদের ক্যাম্পেইন ও ফলাফল প্রমাণ করেছে যে মানুষ ক্লিন পলিটিক্স চান। আমরা রাজনীতির পুরোনো ছকটি ভেঙে দিতে পেরেছি। আমরা ঢাকা-৯ ও বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাব।
আমাদের সেরা সময় এখনো সামনে।
বিডি প্রতিদিন