আমার জীবনে যাদেরকে আমি আবে হায়াতের মত পেয়েছি, শায়খ Ahmadullah হাফিযাহুল্লাহ তাদের মধ্যে অন্যতম। অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাওয়ার বিশেষ যে সব কারণ আছে, তন্মধ্যে তাঁর সততা, নিরবচ্ছিন্নতা, দীনের প্রতি নিষ্ঠা, এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দক্ষতা, প্রফেশনালিজম এবং বিনয় নম্রতা।
আমি বাংলাদেশে গেলে ঢাকায় এক মিনিটও অবস্থান করতে ইচ্ছা হয়না, কারণ তার রাস্তার জ্যাম, ধুলিময় এবং মবিল ময় বাতাস, আস্তরণ পড়া আকাশ, এবং ঘিঞ্জির চিৎকার-উতপাত-ঘামময় দূর্গন্ধ। এরপরেও অন্ততঃ তিনবার সেখানে থেকেছি শুধু শায়খ আহমাদুল্লাহ ভায়ের সাথে দেখা করতে। দুইবার দেখা করতে সামর্থ্য হয়েছি, একবার মাঝপথ পর্যন্ত যেয়ে ফিরে এসেছিলাম, কারণ ৪ ঘন্টা গাড়িতে কাটিয়ে শেষে যদি যেতামই তাহকে আমার ভাতিজির বিয়েতে থাকতে পারতাম না। শেষে শায়খের কাছ থেকে মাফ চেয়ে নিয়ে গাড়ি ইউ-টার্ণ করিয়েছিলাম।
প্রথমবার দেখা করতে যেয়ে সবচেয়ে ভালো লেগেছিলো এলাকার এমপির সাথে দেখা করা, আরিফ আজাদের গল্প শোনা, এবং বাংলাদেশে তার স্থায়ী ভাবে থাকার সিদ্ধান্ত জানা এবং একটা বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরে তার দাওয়াতি কাজের উদ্দেশ্যে বানানো স্টুডিও দেখা। তাঁর আন্তরিকতা, বিনয়, ভালোবাসা, ভাবির নিজ হাতের বানানো নানা রকম খাবার আমাকে শুধু মুগ্ধ করেনি, সিদ্ধান্ত নিয়েছি, হায়াত যতদিন আছে, এই ছোট ভায়ের সাথে থাকাও সুহবতে সালেহের মধ্যে গণ্য। ঐ দিনেই বলে এসেছিলাম, "সভ্যতা সৃষ্টির নতুন প্রজেক্ট বাংলাদেশের কোন আলিম শুরু করতে পারে তা আপনাকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না"।
গত ২০২৫ এর ফেব্রুয়ারীতে আবার আমাকে নেয়া হলো। এইদিন শায়খের সাথে সময় কাটানোর চেয়ে সময় কাটালাম তার ভুরি ভুরি প্রকল্প দেখতে। সাথে নিলাম আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশানের প্রাণ-পুরুষ আমার একান্ত প্রিয় সাব্বির আহমাদকে। তিনি একেবারে আপন মানুষের মত তার শশুরের বন্ধুকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন শত প্রজেক্ট।
কোথাও টিন শেডের বিল্ডিং, কোথাও বিঘার পর বিঘা জমির উপরে ওঠানো কোটি কোটি টাকার দেশ গড়ার কারিগর তৈরির ক্লাশ বিল্ডিং ও ছাত্রাবাস। বড়দের অনেক বড় হতে হবে সেই জন্য আধুনিকতম AI জেনারেশান, প্রশিদ্ধতম কম্পিউটার লিটারেসি, লীডারশীপ ট্রেইনিং, বহির্বিশ্বে কর্ম সংস্থানের লক্ষ্যে ম্যানপাওয়ার ডেভালেপমেন্ট প্রকল্প, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদেরকে নিজ পারে দাঁড়ানোর গোটা দশেক প্রোগ্রাম, নারীদের উন্নয়নের ব্যাপক কার্যক্রম দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
নারীদের কাজ দেখতে সাব্বির নিয়ে গেলো এক কলেজের সর্বোচ্চ তলায়। সব দেখে শুনে মূল অফিসে নিয়ে বললেনঃ বোনেরা আপনার জন্য এই বুটিক শাড়ি উপহার দিয়েছে, এবং এর ভিতরে দিয়েছে একটা চিঠি। মেয়েরা উপহার দেবেন আবার চিঠি দেবেন?! আমি শাড়ি দেখে চিঠিটা নিয়ে পড়লাম, শাড়ী বানানো শেখার ইতিহাস ও দোয়ার মিনতি ছিলো তাতে। আমার চোখে পানি এলো, আমি কত নামকরা শায়খের কাছে গেছি, তাদের প্রোজেক্ট দেখেছি, কিন্তু এমন দীনি পরিবেশ আমি কোথাও দেখিনি। শুধু মনে হলো মালায়েশিয়ার কেলান্তনের মুখ্য মন্ত্রী নিক আব্দুল আজীজ নিক মাত (রহ) এর মতোই হতে চলেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ, শুধু রাজনৈতিক হবার ইচ্ছাটা নেই। আসতে পথে দেখলাম শেফ বানানোর প্রকল্প। সারা দেশে এমনকি বহির্বিশ্বে দীনদার দক্ষ পাচক বানানোর প্রকল্প। ম্যনেজার হলেন আর্মি থেকে স্বেচ্ছায় রিটায়ার্ড হয়ে আসা অভিজ্ঞ এক রান্নার কারিগর। দৈনিক ১৫০০ লোকের রান্না হয় এখানে কর্মচারি ও শিক্ষার্থীদের জন্য।
আমাকে নেয়া হলো আধুনিকতার পরশ ছোঁয়া নতুন অফিস, লাইব্রেরি, গবেষণা ও শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ডিজিটালাইজড ক্লাশরূমে। আমাকে একটা ক্লাশের মঞ্চে তুলে দেয়া হলো কিছু কথা বলতে। সামনে বসা বুয়েট, ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়, আশে পাশের নানা বিশ্ববিদ্যালয়, কওমি মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা থেকে হয় পাশ করা নতুবা অধ্যায়নরত দাঈ হবার মানসে আসা একঝাঁক আল্লাহর বান্দাহ। তাদের চোখে দেখলাম জ্ঞানের দ্যুতি, চরিত্রে পেলাম ইসলামের শ্বাশত সুরভি, মননে প্রতিভাত হলো ইসলামের সেবক হবার দূর্দম অভীপ্সা। আমি ইংরেজিতে তাদের কথা শুনলাম, আরবিতে তাদের সাথে বক্তব্য চালাচালি করলাম, উর্দুতে তাদের অনেককে গতিশীল পেলাম, আর বাংলায় তাদের মধ্যে শায়খের মত সাবলীল পেলাম। গোঁড়ামি নেই, ভাঁড়ামি নেই, জড়তা নেই, উদ্দেশের প্রতি অনীহা নেই, জগতের প্রতি মোহ নেই, আপনাকে উঁচুতে ওঠানোর দম্ভ নেই, নেই ইসলামি লেবাস পোষাক ও ধার্মিকতা গ্রহনে কোন ইনফেরিওরিটী বা হীনমন্যতা। এই সব স্কলারময় দাঈদের দেখে হেরার রাজ তোরণের স্বপ্নে বিভোর হলাম।
ঘুরতে ঘুরতে নাকাল হয়ে গেলাম। মনটাও ব্যস্ত হয়ে গেছে শায়খকে দেখতে। সাব্বির বললেন, শায়খ আপনার অপেক্ষায় আছেন মসজিদের পাশে। গেলাম, চোখ জুড়িয়ে গেলো তাঁকে দেখে, আর পাশে গড়ে ওঠা মসজিদ ও মাদ্রাসা দেখে। বিশাল মসজিদ প্রকল্প, চতুরপাশে হবে মাদ্রাসা। কাজ শুরু হয়ে অনেক এগিয়েছে। দরকার কয়েক কোটি টাকার।
অর্থের ব্যাপারে আলোচনা এলেই শায়খ বললেনঃ "শায়খানা, টাকা পয়সার বিষয়ে আল্লাহ দেখবেন"। তাঁর এই কথায় আমি আমার শায়খ ইমাম আবুল হাসান আন-নাদাওয়ীর তাওয়াক্কুল ও ক্বানাআত খুঁজে পেলাম। একবার শায়খ নাদাওয়ী (রহ) কাতারে গেলে ডঃ ইউসুফ আল-ক্বারাদ্বাওয়ী শায়খকে ধরলেন কাতারের কিছু ধনীদের কাছে নেবেন। নাদওয়াতুল উলামা প্রতিষ্ঠানে চালাতে তখন তিনি অর্থনৈতিক ভাবে খুব সংকীর্ণতায় ভুগছেন। অথচ তিনি টাকার আশায় কারো কাছে যাবেন না বলে দিলেন। বললেনঃ "ইউসুফ, আমি মানুষের দ্বারে দ্বারে যেয়ে টাকা চাওয়া পছন্দ করিনা। আমি জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে বরং চাইতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ফীল করি।" ডঃ ইউসুফ কারাদ্বাওয়ী লিখেছেন, "আমি শায়খকে কারো কাছে নেই নি, নিজেও যাইনি। শুধু টেলিফোন করলাম। তাতেই শায়খকে প্রতিষ্ঠান চালাতে ঐ বছরের সমস্ত খরচের টাকা দিতে পারলাম"।
আমি দুয়া করলাম, আল্লাহ, দেয়ার মত আমার কিছু নেই। আছে সারা বিশ্ব জুড়ে হাজার দশেক ছাত্র ছাত্রী। তারা যেন আমার ছোট ভাই শায়খ আহমাদুল্লাহর এই সব প্রজেক্টে সাদাক্বায়ে জারিয়াহ, নর্মাল সাদাক্বাহ, তাদের সমূহ যাকাত দান করেন। শুধু বাংলাদেশ না, শায়খের নজর এখন আফরিকা ও ইউরোপের দিকেও গেছে। তিনি যেখানে যাচ্ছেন, তাঁর প্রভাবে সেখানে গড়ে উঠছে মসজিদ মাদ্রাসা এবং আধুনিকতা ও ইসলামের সংমিশ্রনে শিক্ষালয়।
ছোটদের মাদ্রাসায় গেলাম। ছাত্র ছাত্রীদের দেখলাম, শিক্ষক গণের সাথে পরিচিত হলাম। রূমে রূমে গেলাম। এক অনিন্দ্য সুন্দর সিলেবাস কারিক্যুলাম এখানে পরিচিত করা হয়েছে। বৃটেইনের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করা হয়েছে আরব ও ইসলামি বিশ্বের সেরা সিলেবাস। মালয়েশিয়া, সাঊদি আরব, আল-আযহার ইত্যাদির সংযোগ সেখানে আছে। অস্ট্রেলিয়া ত্যাগ করে আসা এক যুবককে লোভনীয় হাতছানী ছেড়ে আসার কারণ জিগালাম। তাঁর মনে হয়েছে শায়খের সাথে সভ্যতা নির্মানের এই প্রজেক্টে কাজ করা ইসলামি কাজের অন্যতম প্রচেষ্টা। অস্ট্রেলিয়া তাকে এই জিনিষ কোত্থেকে দেবে? সাব্বির আমাকে বললেন, শায়খ আমরা চাই এই স্কুলে আরবী পড়াবে আরব শিক্ষক, ইংলিশ পড়াবে এই রকম ইউরোপ আমেরিকা ও বৃটেইন থেকে আসা ভাই বোনেরা। আর পড়াবেন যারা, তারা হবেন ইসলামের একেকজন রেফারেন্স পার্সোন।
শায়খের সাথে ঘুরলাম, খেলাম দালাম এবং মিষ্টি এক বাক্য আমার কান থেকে বুকে ধারণ করে ইচ্ছা না থাকলেও ফিরে আসলাম। তিনি বললেনঃ শায়খানা, ঢাকায় এলে এখানে থাকবে আপনার থাকার যায়গা। এখানেই আপনি মেহমান না, নিজের বাসায় থাকবেন”। আমার জীবনে পাওয়া এ এক অনাস্বাদিত ভালোবাসা। সিদ্ধান্ত নিলাম জীবন কাটানোর জন্য মদীনায় একটু সুযোগ খুঁজবো, না পেলে ঢাকায় আফতাবনগরে শায়খ আহমাদুল্লাহর এই সব জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া সভ্যতা প্রকল্পের সাথী হয়ে থাকবো ইন শা আল্লাহ।

