এবারের নির্বাচন অনেক দিক থেকেই আলাদা। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ও বড় দল আওয়ামীলীগ নেই। এবার সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট দেবে বাংলাদেশের মানুষ। এবারের নির্বাচন না কোনও দলীয় সরকার, না কোনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপস্থিতিতে হচ্ছে। নির্বাচনের প্রতিটি স্তর যেন স্বচ্ছ থাকে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতার কথা বলে আসছে অন্তর্বর্তী সরকার। সর্বকালের সেরা নির্বাচন করে দেখাবেন তারা।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ গণতন্ত্রে প্রবেশ করবে বলেও মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই নির্বাচনে পাল্লা কার ভারী হবে? শেষ সময়ের সেই আলোচনার বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে—যার দিকে জেন-জি এবং নারীরা ঝুঁকবেন, শেষ হাসি তারাই হাসবেন।
২০২৪ সালে একটা বড় আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন ঘটিয়ে একটা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটানো প্রজন্ম এবার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে—দেশ পরিচালনাকারী কারা হবেন তাদের বিষয়ে। আর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে নারী ভোটারদের সিদ্ধান্ত, যারা বর্তমানে পারিবারিক-রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরেও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে মনে করেন। সারা দেশের বিভাগীয় শহর ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকদের আসনগুলোর ভোটার ও সুশীল সমাজের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—প্রার্থীরা বুঝতেই পারছেন এলাকার নারী ভোটারদের ওপরই নির্ভর করছে, নির্বাচনের ফলাফল কী হবে। সে কারণে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে জয়-পরাজয়ও বলতে পারছেন না অনেকে, নারী ভোটারদের নিয়েই বেশি ‘শঙ্কার’ মধ্যে আছেন প্রার্থীরা।
দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বদলে দিতে পারে ‘তরুণ ও নারীশক্তি’। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা এখন প্রায় পাঁচ কোটি। অপরদিকে নারী ভোটার ৬ কোটিরও বেশি—যা পুরুষ ভোটারের কাছাকাছি। ফলে এই বিশাল ভোটারের রায় পালটে দিতে পারে ভোটের ফল। এ কারণেই তরুণ ও নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ নজর রাজনৈতিক দলগুলোর। তার পাশাপাশি আছে নতুন ভোটারের হিসাব নিকাশ। দেশে বর্তমানে মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে নতুন ভোটার রয়েছেন প্রায় ১ কোটি। তারা এবারই প্রথম ভোট দেবেন। এছাড়া ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা ৪ কোটি ৩৩ লাখ। ১৮-৩৭ বছর বয়সী নারী ভোটার ২ কোটি ৬৭ লাখ।
নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য রাখছেন তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমাননারীদের আকৃষ্ট করতে প্রতিশ্রুতির অভাব ছিল না
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের ভোট টানতে তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছে। নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, স্নাতকোত্তর পর্যন্ত ফ্রি পড়াশোনা, নারী সাপোর্ট সেল, উদ্যোক্তা সহায়তা, ডে-কেয়ার, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। প্রতিটি জনসভায় তারেক রহমান নারীদের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন। ঢাকায় আসার পর থেকে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জায়মা রহমান নারী ও জেন-জি গোষ্ঠীর সঙ্গে নানা বিষয়ে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছেন—সেমিনার ও আলোচনা সভায় নারীর অধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন।
অপরদিকে জামায়াতের ইশতেহারে জাতীয় নারী সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠনের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি নারীদের ঘরে-বাইরে নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া এনসিপি বলেছে, নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। কর্মজীবী নারীদের নিয়ে একাধিক বিতর্কিত বিষয় জামায়াতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হওয়াকে কেন্দ্র করে এক ধরনের হতাশাও তৈরি হয়েছে।
তবে ইশতেহার দিয়ে নারীদের কতটা আকৃষ্ট করা গেছে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ‘উই ক্যান’র সমন্বয়ক জানিত আরা হক। তিনি বলেন, ‘‘এবারের ইশতেহারে নারীর জন্য নতুন বা বিশেষ কিছু প্রতিশ্রুতি দিতে পেরেছে এমনটা নজরে আসেনি। অথচ নারী ভোটাররা বরাবরই একটা বড় ফ্যাক্টর। নারীকে নিয়ে কোনও ধরনের পরিকল্পনা করা দরকার এবং কীভাবে সেটা বাস্তবায়ন হবে—সে রকম কোনও গবেষণা দলগুলোর সামনে নেই বলেই এত গড়পরতা ইশতেহার দেখা গেছে।’’ তবে কর্মজীবী নারীদের ভোট বড় প্রভাব ফেলবে এবং হিসাব-নিকাশ বদলে দেবে বলে তিনি মনে করেন। ‘‘এখন দেখার বিষয়, এই কর্মজীবী নারীরা আসলে কোনদিকে নিজেকে নিরাপদ মনে করেন।’’
চোখ তৃণমূল নারীদের ভোটের দিকে
গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের নির্বাচনে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। কেবল সেই নারীরা নয়—নারীর নিজস্ব মতামত দেওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে তৃণমূলে। রাজশাহীর গোদাগাড়ি তানোর আসনটি বরাবরই বিএনপির আসন হিসেবে চিহ্নিত। এখানকার নারী ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়। এই এলাকার ভোটার সুরভী আখতার বলেন, ‘‘অনেক দিন পরে আমরা ভোট দিতে ঢাকা থেকে এলাকায় এসেছি। এখানকার নারীদের মধ্যে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটা পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। বিষয়টা খুবই নতুন আমার কাছে। এলাকার রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য আবু তাহের তার পর্যবেক্ষণ জানাতে গিয়ে বলেন, ‘‘আমাদের পরিবারের নারীদের আজীবন দেখেছি পরিবারের পুরুষদের পরামর্শক্রমে ভোট দেওয়া, এবার এর ভিন্নতা আছে। এখন আমাদের পরিবারের নারীরা মতামত দিয়ে থাকেন। ফলে ভোটের হিসাব বদলেছে।’’
খুলনায় কোন আসনে কে এগিয়ে সেই হিসাব করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে, জেন-জি আর নারী ভোটারদের ঝোঁকটা বুঝতে না পারার কারণে। শ্রমিক এলাকাগুলোতে নারীদের ভোট সবচেয়ে বেশি সুইং করতে পারে উল্লেখ করে এখানকার রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে। তবে এখানেও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, নারী ও তরুণরা যে দলের কাছে দেশকে বেশি নিরাপদ মনে করবে, শেষ বিচারে তারা সেদিকেই ঝুঁকবেন।
বরিশাল সব সময়ই নারী ভোটারদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানে বিএনপির দিকে প্রবণতা সবসময়ই বেশি। এছাড়া কিছু ধর্মভিত্তিক দলের জনপ্রিয়তা দেখা যায়—চরমোনাইয়ের হাতপাখা ও জামায়াত ইসলামীর দাঁড়িপাল্লার। সেটা খুব বেশি চোখে পড়ার মতো না এবং এই এলাকার নারী ভোটও বিএনপির দিকেই বেশি। বাংলা ট্রিবিউনের বরিশাল প্রতিনিধি জানান, এখানকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবারের একজন রাজনীতিতে জড়ালে, এখনও সেই একই রাজনীতিতে গণ্ডি থেকে নারীরা বের হওয়ার কথা ভাবে না।
অনলাইনে প্রতিবাদ, নারী বিদ্বেষের জবাব ব্যালটে (কার্ড)শেষ সময়ে ‘জবাব দেবো ব্যালটে’
নারীর অধিকার সমুন্নত রাখতে ও নারীবিদ্বেষীদের ক্ষমতায় না আনতে অনলাইনে প্রচারণা লক্ষ করা গেছে শেষ সময়ে।
‘নারীবিদ্বেষী ও অবমাননাকর’ বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনে (ইসি) স্মারকলিপি দেয় নারী পক্ষ, নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম এবং গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনসহ ১১টি নারী সংগঠন। ‘নারীবিদ্বেষী ও অবমাননাকর’ বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে সেখানে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু বলেন, ‘‘গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে নারীরা নিরাপদ নয়।’’ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিতেও তিনি ইসিকে আহ্বান জানান। এই পরিস্থিতিতে নারী ভোট কীভাবে ফ্যাক্টর বলতে গিয়ে অ্যাক্টিভিস্ট মার্জিয়া প্রভা বলেন, ‘‘নারী ভোট ফ্যাক্টর মনে করি। আমি চাই, নারীরা ভোট দিক বেশি বেশি। নারীবিদ্বেষীদের জবাব দিক ব্যালটে। কিন্তু এ কথা সত্য যে জামায়াতের যে নারী ভোট ব্যাংক, সেই ব্যাংক কোনোমতেই নারীবিদ্বেষী প্রচারণায় জামায়াতকে ভোট দেবে না—এমন অবস্থানে যাবে না নৈতিকভাবেই। কারণ ডাকসু নির্বাচনে যে প্রার্থী নারীদের ছবি তুলে সাইবার হয়রানি করেছিল, তাকেও নারীরা সর্বোচ্চ ভোট দিয়েছে। আমরা দেখেছি, জামায়াতের নারীরা তাদের সমাবেশে জায়গা না পেলেও মনে করছে— ওইটা সম্মানের। তারা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার জয়গান গাচ্ছে। এই ভোট ব্যাংক বাদ দিয়ে এর বাইরে বিপুল শ্রমিক কর্মজীবী নারীর ভোট আসলে ভোটের মাঠে বদলটা আনতে পারে। সেক্ষেত্রে আমি আশাবাদী। তবে আরেকটা বিষয়, জামায়াত যে নারীকে হেয় করছে, অবমাননাকর কথা বলছে—এ তথ্য অনেক নারীর কাছে পৌঁছায়নি এখনও। সেটা পৌঁছাতে পারলে এই ভোটের মাঠ আরও প্রতিযোগিতামূলক হতো নারীদের অর্থবহ অংশগ্রহণে।’’