Image description

পরীক্ষার পর পরীক্ষা। ফের ব্যালটের পরীক্ষায় দেশ। নির্বাচনের আগে হাইপ উঠেছে এবার কে এগিয়ে? কে হাল ধরবেন? লাইনচ্যুত ট্রেনটি কে তুলবেন ট্র্যাকে? আর কে বাজাবেন হুইসেল?

এক নতুন প্রেক্ষাপট। জুলাইয়ের পট পরিবর্তন বা বর্ষা বিপ্লব তৈরি করেছে এক নতুন অধ্যায়। সন্দেহ আর দ্বিধা শেষে আজ কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন। এবারের ভোটে রয়েছে ভিন্নতা। একসঙ্গে দু’টি ব্যালটের মুখোমুখি হবেন ভোটাররা। একটি গণভোট আর অন্যটি জাতীয় নির্বাচন। একটি ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর মাধ্যমে নির্ধারিত হবে সংস্কারের পক্ষে দেশের মানুষ আছে কি নেই? অপর ব্যালটে নির্ধারিত হবে দেশের পরবর্তী নেতৃত্ব দেবে কোন দল?

প্রচারণা চলেছে টানা বিশদিন। এখন অপেক্ষার পালা। জনতার রায় কি? আজ দিন শেষে তা নির্ধারিত হবে। এবার ভোটের লড়াইয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি জোট ও জামায়াতে ইসলামী জোটের মধ্যে। নির্বাচনে মোট ভোটকেন্দ্র ৪২,৭৭৯। পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ রাখ ২৫ হাজার। নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ রাখ ৮৫ হাজার দুইশত। দেশের ১২ কোটি ৯০ লাখ ভোটারের মধ্যে ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী ভোটার প্রায় ৪৪ শতাংশ। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকছে ৪০ দেশ ও ৮ আন্তর্জাতিক সংস্থা।ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ে পা দিচ্ছে। নব্বইয়ের দশক থেকে নির্বাচনে দু’নেত্রীর দৌড়ঝাঁপ ছিল অনিবার্য। তখন মাঠের লড়াইয়ে খালেদা জিয়া আর শেখ হাসিনার পাল্টাপাল্টি ছিল অবধারিত। সময় বদলেছে। একজন প্রয়াত আর অন্যজন নির্বাসিত।

হাসিনার শাসনামলে পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন উপহার দেয়ায় প্রশ্নবিব্ধ হয়ে পড়ে গণতন্ত্র ও দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা। এ সময়কালে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই মুখ থুবড়ে ফেলে দেয় আওয়ামী লীগ।

চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হন। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে সর্বাধিক আলোচনার বিষয় ‘নির্বাচন’। ১২ই ফ্রেব্রুয়ারির আগের রাত পর্যন্ত মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন ছিল, নির্বাচন হচ্ছে তো? টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এটিই ছিল কৌতূহল। সব সন্দেহ আর প্রশ্নের ইতি ঘটিয়ে নতুন প্রেক্ষাপটে আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।


এবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দুই জোটের প্রধান বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আর জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান টানা বিশদিন চষে বেড়িয়েছেন দেশের নানা প্রান্তে। নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়েছিল ২২শে জানুয়ারি। চলে ৯ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এ সময়কালে দু’নেতাই তুলে ধরেছেন দুই জোটের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি। দায়িত্ব পেলে দেশকে কোন দল কোথায় নিতে চায়?

এবারের লড়াইয়ে দৃশ্যমান হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, বেকারত্ব নিরসন, দুর্নীতি দমন, অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনাসহ বেশকিছু ইস্যু। এর বাইরে আলোচনায় এসেছে ধর্ম-নির্ভর প্রচার কৌশলও। প্রতিপক্ষকে শব্দবাণে পরাস্থ করতে দু’দলই একাধিক জনসভায় বিষোদগার করেছেন, যুক্তিও তুলে ধরেছেন। খেলেছেন কৌশলের খেলাও। প্রচারণায় নানান অপতথ্যও কোনো কোনো দলের পক্ষ থেকে ছড়ানো হয়েছে। এবারের প্রচারণায় লক্ষ্যণীয় হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার। কোথায় কোথায় এআইয়ের ব্যবহারও লক্ষ্য করা গেছে।

নির্বাচনের শুরু থেকেই বেশকিছু ইস্যুতে বিতর্কও লক্ষ করা গেছে। গণভোটের পক্ষে সরকার প্রথম থেকেই প্রচারে নেমেছে। ইসি প্রথমদিকে বিষয়টি নিয়ে চোখে কুলুপ আঁটলেও একেবারে শেষদিকে এ বিষয়ে সজাগ হয়। এ নিয়ে বিতর্ক শেষ পর্যন্ত রয়ে গেছে। আরপিও সংশোধন, পোস্টাল ব্যালট, পর্যবেক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় নির্বাচনে বিতর্ক জারি থাকছেই। নির্বাচনে বিতর্ক চলেছে ‘কার্ড’ বনাম ‘ইনসাফ’ নিয়ে। বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী ময়দানে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ নিয়ে সরব থেকেছেন পুরো সময়জুড়ে। অন্যদিকে শফিকুর রহমান ‘ইনসাফ’ কায়েম নিয়ে সরব ছিলেন।

নির্বাচনের নাটাই দু’জনের হাতে। একজন তারেক রহমান। অন্যজন শফিকুর রহমান। ওয়ান-ইলেভেনে জেলজীবন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে তারেক রহমান নির্বাসনে ছিলেন সতেরো বছর। পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মাতা প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যিনি দীর্ঘদিন বিনাবিচারে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেছেন কারাগারেই। উন্নত চিকিৎসার অভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয় তাকে। ছোট ভাই কোকোকেও হারান বাইরে থাকার সময়। সবশেষ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে তারেক রহমান অতীতের ভুলত্রুটির জন্য দুঃখপ্রকাশ করে জনতার সমর্থন চেয়েছেন।

শফিকুর রহমানের রাজনীতি শুরু জাসদ ছাত্রলীগের মাধ্যমে। পরে যোগ দেন ছাত্রশিবিরে। সিলেট মহানগরেই কেটেছে দীর্ঘ সময়। পরে দলের বিশেষ পরিস্থিতিতে নেতৃত্বে আসেন। জুলাইয়ের পট পরিবর্তন ডা. শফিকুর রহমানকে নিয়ে যায় রাজনীতির মূল কেন্দ্রে।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বরাবরই বলছেন- পৃথিবীর সেরা নির্বাচন তিনি উপহার দিতে চান। সেই ক্ষণগণনাও সমাপ্ত। এখন বাস্তবতার মুখোমুখি। যেমনটি নিকট অতীতে আমাদের এখানে ঘটেছে, নির্বাচন শেষেই কখনো স্থ্থূল, কখনো সূক্ষ কারচুপির অভিযোগ। এবার নির্বাচনের তফসিল দেয়ার পর থেকেই বেশকিছু ইস্যুতে বিতর্কের মুখে ইসি। প্রশ্ন উঠেছে এবারও কি প্রশাসনিক ক্যু হতে পারে নির্বাচনে? নানা নির্বাচনী ছকের খসড়া নিয়েও আলোচনা আছে টেবিলে টেবিলে। আমরা বিশ্বাস করি, একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এটি শেষপর্যন্ত অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলেও জালিয়াতিমুক্ত হয়েছে। সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ হয়েছে। অংশ নেয়া দলগুলো যেন কোনো অভিযোগ না করতে পারে।

ছিয়াশির বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের পর বিতর্ক ওঠে গোল দেয়া নিয়ে। সাংবাদিকদের প্রশ্নে দিয়াগো ম্যারাডোনা বলেছিলেন, এই হাত ছিল অদৃশ্য হাত। এটি ছিল ‘গডস হ্যান্ড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’। খেলার মাঠ থেকে ফিরি রাজনীতির মাঠে। এবার নির্বাচনের মাঠে কেউ যেনো অদৃশ্য ব্যালটে জয় ছিনিয়ে না নিতে পারে। সে ব্যাপারে সকলের সজাগ দৃষ্টিই একটি বিতর্ক মুক্ত নির্বাচন উপহার দিতে পারে। সত্যিকার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে নতুন মাত্রা সংযোজন করবে- এমনটাই প্রত্যাশা।
শেষ কথা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন বলেছিলেন, যে ভোটহীন, সে সুরক্ষাবিহীন। আমরা যেন কেউ আমাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হই।

ভোট নিয়ে যত আয়োজন: এবার শুধু সংসদ নির্বাচনই নয়। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গণভোট। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৯৯ আসনে একটানা ভোটগ্রহণ চলবে। এ নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫০টি দল অংশ নিচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ২৮ জন। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৭৫৫ জন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ২৭৩ জন।

ভোট নিয়ে নানা শঙ্কা থাকলেও নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণের সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঠে রয়েছেন। গতকাল বুধবার দিনভর কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে নির্বাচনী মালামাল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত নজরদারিসহ সব দিক থেকেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন। নির্বাচন কমিশন বলছে, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার বেশিসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে। ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতির বিষয়ে আশাবাদ ইসির। সংস্থাটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ভোটারদের মাঝে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে।

ভোটের আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন গতকাল সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। এ সময় তিনি বলেন, নির্বাচনে ভোটদান আমাদের শুধু নাগরিক অধিকারই নয়, বরং এটি একটি দায়িত্ব। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের ভোটাররা সচেতনভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের প্রতি শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভিন্নমত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক অংশ। এই বিষয়টি মাথায় রেখে উৎসবমুখর পরিবেশে কেন্দ্রে এসে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

জয়-পরাজয় মেনে নেয়ার মানসিকতা ও নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে জয়-পরাজয়কে সবাইকে সহজভাবে মেনে নিতে হবে। তিনি ব্যক্তিগত কষ্ট বা সীমাবদ্ধতাকে তুচ্ছজ্ঞান করে জাতীয় নির্বাচনের এই মহতি কর্মযজ্ঞকে সফল করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।

ইসি জানিয়েছে, ৩০০ আসনের মধ্যে শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত থাকছে। ফলে ২৯৯ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একযোগে অনুষ্ঠিত হবে।

এবার নির্বাচনে ৫০টি রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র ২৭৩ জন, দলীয় ১ হাজার ৭৫৫ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮৩ জন। সারা দেশে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার প্রায় ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং নারী ভোটার প্রায় ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। হিজড়া ১ হাজার ২৩২ জন। মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণ ২১ হাজার ২৭৩ কেন্দ্র। ঝুঁকিপূর্ণ ২১ হাজার ৫০৬ কেন্দ্র। ২৯৯টি কেন্দ্রে পোস্টাল ভোটের গণনা হবে। প্রায় ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক: নির্বাচন পর্যবেক্ষণে রয়েছেন ৪৫ হাজার ৩৩০ জন দেশীয় পর্যবেক্ষক এবং প্রায় ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক। এ ছাড়া প্রায় ৯ হাজার ৭০০ জন সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন, যার মধ্যে বিদেশি সাংবাদিক রয়েছেন প্রায় ১৫৬ জন।

আইনশৃঙ্খলা ও প্রযুক্তি: নির্বাচনের নিরাপত্তায় সারা দেশে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় ২ হাজার ১০০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচনে ড্রোন, বডি ওর্ন ক্যামেরা ও ব্যাপকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। ইসি জানিয়েছে, ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে।

ভোট গণনা ও ফলাফল: জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দু’টি ব্যালট একইসঙ্গে গণনা করা হবে। কেন্দ্র পর্যায়ে প্রাথমিক ফল প্রকাশের পর তা রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। বেশির ভাগ আসনের ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে আশা করছে কমিশন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, এই পর্যন্ত যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আছে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। যে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো ঘটেছে এগুলো না ঘটলে আরও ভালো হতো। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। সারা দেশে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ডেপ্লয় হয়েছে।


ভোটের আগেও দুই দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ: ভোটের ঠিক ১৪ ঘণ্টা আগে একগুচ্ছ অভিযোগ নিয়ে ইসিতে হাজির হয় বিএনপি ও জামায়াত। সন্ধ্যা সাতটার পর বিএনপি’র নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে ইসিতে আসেন ৩ সদস্যের প্রতিনিধিদল।

এ সময় নজরুল ইসলাম খান বলেন, মেজর কয়েকটি আমাদের অপছন্দনীয় ঘটনা ঘটেছে। আমরা ভেবেছি বিষয়টি ইসিকে জানানো দরকার, যাতে এই ধরনের কাজ আর না ঘটে। বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা আর অভিযোগ জানিয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, অভিযোগের একটা হচ্ছে সৈয়দপুর এয়ারপোর্টে একজনের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া গেছে। আমরা ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করছি না, কিন্তু এটা যে সময়ে ঘটেছে সেটি প্রশ্নবোধক হয়ে রয়ে যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে টাকা বিতরণকালে জামায়াত নেতা আটক, সিরাজগঞ্জের ভোট কেনার সময় জনগণের হাতে জামায়াত নেতা আটক, বরগুনা-২ এ টাকা এবং অস্ত্রসহ ২ জন আটক, নোয়াখালীতে টাকা এবং হ্যান্ডবেল্টসহ আটক, ময়মনসিংহে সাবান-শ্যাম্পু বিতরণের সময় আটক, চট্টগ্রাম-৯ এ জামায়াত নেতা কর্তৃক চাল, ডাল, তেল বিতরণকালে আটক, রাজশাহীতে টাকা নিয়ে ভোট কিনতে আসা জামায়াত নেতা আটক, সিলেট খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মসলেহ উদ্দিনের পক্ষে অর্থ বিতরণকালে জামায়াত নেতা আটক, ফেনী-১ এ জামায়াত প্রার্থীর এক নারী ভোটারকে টাকা দেয়ার ভিডিও আটকসহ এরকম বেশকিছু খবর এবং ভিডিও ইসিতে আমরা দিয়েছি।

এর আগে বিকালে নির্বাচন কমিশনে আসেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জামায়াতের জনসমর্থনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটি দল ঘৃণিত অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি বলেন, যদি ভোটের দিন হামলা অব্যাহত থাকে তাহলে আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিরোধ করবো ইনশাআল্লাহ। এছাড়া প্রতিটি সেন্টারে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলবো। আমরা ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ফ্যাসিবাদকে তাড়িয়েছি। সেই দেশ আর কখনো মাথানত করবে না। কেউ পারবে না। যদি হামলা হয় তাহলে নির্বাচন থেকে সরে আসবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রশ্নই আসে না। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ করবো। কোনো অবস্থাতেই মাঠ ছাড়বো না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে একটি সুস্থ ও সুন্দর নির্বাচন উপহার দেবো। তিনি আরও বলেন, আমরা বডি ক্যামেরার তালিকা দেখেছি। সেখানে দেখা গেছে, কিছু কিছু আসনে অস্বাভাবিকভাবে বেশি ক্যামেরা এবং কিছু আসনে অস্বাভাবিকভাবে কম। বিএনপি’র অবস্থান ভালো, সেখানে কম ক্যামেরা দেয়া হয়েছে। আর যেখানে আমাদের অবস্থান ভালো, সেখানে বেশি বেশি বডি ওর্ন ক্যামেরা দেয়া হয়েছে। ১১ দলীয় জোটের এই নির্বাচনী সমন্বয়ক বলেন, ঢাকা বিমানবন্দর থেকে জামায়াতের একজন নেতা সৈয়দপুর বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি নাটক সাজানো হয়েছে।

ইসি জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র মনোনয়নে বেশ কয়েকটি দলের নেতারা প্রার্থী হয়েছেন। এ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে দলটির প্রার্থী রয়েছেন ২৯১ জন। অপরদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১টি দল জোট গঠন করেছে। দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে জামায়াতের প্রার্থী রয়েছেন ২২৮ জন। জোটের শরিকদের মধ্যে এনসিপি’র ৩২ জন, এবি পার্টির ৩০ জন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন ও জাতীয় পার্টির ২০০ জন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।

হেভিওয়েট প্রার্থীরা ঢাকায়: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতা ঢাকায় নির্বাচন করছেন। ঢাকা-১৭ আসনে লড়ছেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী স. ম. খালিদুজ্জামান। প্রায় এক ডজন প্রার্থী রয়েছে এই আসনে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঢাকা-১৫ আসনে। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন মো. শফিকুল ইসলাম খান। ঢাকা-১৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৮ জন প্রার্থী। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মো. মামুনুল হক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঢাকা-১৩ আসনে। তার সঙ্গে ভোট করছেন বিএনপি’র ববি হাজ্জাজসহ নয়জন।