জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবিরের নির্বাচনী গণসংযোগের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যায় ঢাকা-১৫ আসনের কোনো এক স্পটে জামায়াতের আমির ডা.শফিকুর রহমানের পোষ্টার হাতে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় প্রচারণা চালাচ্ছেন। এক সময় গলায় পানের ডালা ঝুলিয়ে পান-সিগারেট বিক্রী করা এক বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হয়। বৃদ্ধের কাছে শাহরিয়ার জানতে চান, কেমন আছেন? এ সময় জামায়াতের আমীরের দাড়িপাল্লা প্রতীকের লিফলেট ধরিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করা হয় কারা ক্ষমতায় এলে ভাল? রিজেকের মালিক কে? আপনি কতদিন বাঁচবেন? মরতে হবে তাই এবারের নির্বাচনে ভোট দিয়ে (বৃদ্ধের হাতে দাড়িপাল্লা প্রতীকের কাগজ) পরকালের কাজ করে যেতে হবে। বৃদ্ধ জবাবে বলেন, ‘নতুন কারা ক্ষমতায় আসলে ভাল হবে তা নতুন সরকার এলে বোঝা যাবে’। কথা বলার এক ফাঁকে শাহরিয়ার কবিরের কালো লম্বা আকৃতির মানিব্যাগ খুলে একটি এক হাজার টাকার নোট বের করে পান বিক্রেতা বৃদ্ধের হাতে গুঁজে দিয়ে হাঁটতে শুরু করেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল এ ভিডিও দেখে নির্বাচন কমিশন নীরবতা পালন করলেও নেটিজেনরা নানা মন্তব্য করছেন। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, জামায়াত বিগত এক বছর ধরে প্রতিটি আসনে লাখ লাখ টাকা খরচ করছে। দলটির মহিলা কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে নারী ভোটারদের ‘বেহস্তের লোভ দেখিয়ে’ মগজ ধোলাই করছে এবং এটা সেটা উপহার দিচ্ছে। দলটির প্রার্থীরা এবং দলটির সমর্থিত এনজিও ও সামাজিক সংগঠন জামায়াত প্রার্থীদের পক্ষে টাকা উড়াচ্ছে। সারাদেশের কৃষক-শ্রমিক তথা গরীব ভোটার ও ঢাকার বস্তির নিম্নবিত্ত ভোটার আইডি কার্ড নেয়া এবং বিকাশ নম্বর সংগ্রহের খবরতো ওপেন সিক্রেট।
রাজধানীর বনানীর করাইল বস্তি ও টিএন্ডটি বস্তির বাসিন্দাদের ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াত প্রার্থী ডা. খালেদুজ্জামানের অর্থ বিলির চিত্র কয়েকদিন আগে ভাইরাল হয়েছিল। জামায়াত নেতা শাহরিয়ার কবিরের মতো হাজার হাজার জামায়াত নেতাকর্মী সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনী প্রচারণায়। তারা এভাবেই ভোটারদের কাছে টাকা বিলাচ্ছেন। কখনো প্রকাশ্যে কখনো গোপনে জামায়াত প্রার্থীদের পক্ষে এই টাকা বিলির সচিত্র খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হলেও দলটির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থীরা এমন প্রচারণায় একেবারেই পিছিয়ে রয়েছেন।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের অনুচ্ছেদ ৪৪ (খ) এর দফা তিন অনুযায়ী, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়, তাকে মনোনয়ন প্রদানকারী রাজনৈতিক দল থেকে তার জন্য করা ব্যয়সহ ভোটার প্রতি ১০ টাকা হারে অথবা মোট ২৫ লাখ টাকার মধ্যে যা সর্বোচ্চ, তার অধিক হবে না। অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীরা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ থেকে ৮৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবেন। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর আসনের ভোটার সংখ্যার ওপর নির্ভর করবে তার ব্যয়সীমা। আর এই ব্যয়সীমা লংঘন করলে হতে পারে সাত বছর জেল ও জরিমানা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী তিনশ’ সংসদীয় আসনের সবচেয়ে বেশি ভোটার গাজীপুর-২ আসনে। আট লাখ চার হাজার ৩৩৩ জন ভোটারের এ আসনে মাথাপিছু ১০ টাকা করে ব্যয় হলে ব্যয় করা যাবে ৮৪ লাখ তিন হাজার ৩৩০ টাকা। অন্যদিকে সর্বনিম্ন ভোটার ঝালকাঠি-১ আসনে যেখানে ভোটার সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী তিনশ’ আসনে এবার ৪২ হাজার ৭৬১ টি ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে শেরপুরের একটি আসনে ভোট স্থগিত করা হয়েছে। দেশের সবচেয়ে বেশি ভোটারের গাজীপুর-২ আসনে ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ২৮০টি। আর সবচেয়ে কম ঝালকাঠি-১ আসনে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৭৭টি। তবে বেশির ভাগ আসনে ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১০০ থেকে ১৩০টির মধ্যে।
অনুসন্ধান করে এবং মাঠ পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারাদেশে নির্বাচনের জমজমাট প্রচারণা চলছে। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। গ্রামে গ্রামে উঠোন বৈঠক করছেন এবং গ্রামের হাটবাজারে ছোট ছোট জমায়েত সমাবেশ করছেন। এসব সমাবেশ ও প্রচারণায় জামায়াত প্রার্থী ও তাদের মনোনীত প্রচারকরা বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করছেন। ভোটারদের মধ্যে যাকে যেভাবে খুশি করা যায় তাকে সে ভাবেই খুশি করে দাড়িপাল্লার প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, জামায়াতের প্রার্থীদের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট নির্বাচনী ক্যাম্পে যারা যাচ্ছেন এবং যারা আড্ডা দিচ্ছেন তাদের খানাপিনা চলছে দেদারসে। অন্যদিকে বেশির ভাগ সংসদীয় আসনে বিএনপি তথা ধানের শীষের প্রার্থীরা অস্থায়ী নির্বাচনী অফিস স্থাপন এবং সে সব অফিসে কর্মী সমর্থকদের ব্যাপক আনাগোনা হলেও তাদের পিছনে প্রার্থী খরচ করছেন সামান্যই। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি আসনের গ্রাম পর্যায়ের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াতের কর্মী ও নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠ কর্মীদের দেখা হলেই চা-সিগারেট এবং কোথাও কোথাও নাস্তা খাওয়া দাওয়া নিশ্চিত। এছাড়াও কেউ কেউ গোপনে কচকচে এক হাজার টাকার নোটও দেন। কিন্তু বিএনপির প্রার্থীর লোকজন চা সিগারেট খাওয়ান খুবই কম। প্রার্থীরা যেন নির্বাচনে খরচ না করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন।
বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণায় রয়েছেন এমন কয়েকজন কর্মীও স্বীকার করেন তাদের খরচের জন্য সামান্য অর্থ দেয়া হয়। যা তাদের নিজেদের দিনের চাহিদা মেটে না। তারা ভোটারদের খুশি করতে চা-শিঙ্গারা-বিড়ি-সিগারেট খাওয়াবেন কেমন করে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাংবাদিক জানালেন, কিছুদিন আগে ডাকসুর আয়োজনে ক্যাম্পাসে কাওয়ালীর আয়োজন করা হয়েছিল। রাতের ওই গানের অনুষ্ঠানে দর্শকদের মধ্যে শত শত প্যাকেট সিগারেট প্রকাশ্যে বিলি করা হয়েছিল। ডাকসু নেতারা নিজেরা সিগারেট পান না করলেও ভোটের কারণে তারা সিগারেট বিলি করেছেন।
বেশ কয়েকটি সংসদীয় আসনে বিএনপিকে ভোট দেবেন এবং বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন এমন অনেকেই জানিয়েছেন তাদের প্রার্থী এখনো অতিরিক্ত খরচ দূরের কথা প্রয়োজনীয় খরচও করছেন না। তাদের মতে নির্বাচনের আগে অর্থ খরচ করা করার কারণে বিএনপির অনেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাবে না।
অতীতে কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন এমন একজন নেতা জানালেন, তিনি বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করলেও মনোনয়ন পাননি। তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রার্থীদের জন্য নির্বাচন কমিশন খরচের যে সীমা বেঁধে দেন অনেক প্রার্থীর সে পরিমাণ টাকা মনোনয়ন পত্র দাখিলের দিনই খরচ হয়ে যায়। অন্যান্য খরচ বাদ দিলেও বিজয়ী হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বি¦তা করবেন এমন প্রার্থীদের ভোটের দিনই প্রতিটি কেন্দ্রে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। দলের পুলিং এজেন্টদের তিন বেলা খাওয়া দাওয়া, কেন্দ্রের পাশের অস্থায়ী ক্যাম্প পরিচালনায় কর্মরতদের খাওয়া দাওয়া-চা-সিগারেট-পান খরচ, কিছু বয়স্ক ভোটার ও মহিলা ভোটারদের আনা নেয়ায় প্রচুর খরচ করতে হয়। এ ছাড়াও পর্দার আড়ালে বাঁকা পথে নিজেদের পক্ষে ভোট বাড়াতে হলে বহু টাকা খরচ করতে হয়। চার হাজার ভোটার রয়েছেন এমন ভোটকেন্দ্র একদিনের সাধারণ খরচ ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। ফলে বিজয়ী হবেন এমন টার্গেট নিয়ে যারা নির্বাচন করছেন সে প্রার্থীদের অতিরঞ্জিত খরচ না করলেও ভোটের দিন প্রতিটি কেন্দ্রে ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা খরচ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ভোটের দিন একজন প্রার্থীর খরচ করতে হবে কমপক্ষে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা।
জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে এক বছর ধরে দুই হাতে অর্থ ব্যয় করলেও বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের অনেক প্রার্থীই মনে করছেন মানুষ এমনিতেই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ধানের শীষে ভোট দেবেন। বয়স্ক ভোটার, নারী ভোটারদের আনা নেয়ার খরচ করে ভোটকেন্দ্রে আনা নেয়া নিয়ে যেন কোনো পরিকল্পনাই দেখা যাচ্ছে না। বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা করছেন এমন একাধিক নেতা জানান, খরচের জন্য তাদের হিসেবে করে টাকা দেয়া হয়। সামান্য সে টাকার হিসেবও নেয়া হয়। অতিরিক্ত খরচের জন্য জবাবদিহি করতে হয়। নির্বাচনে খরচের ব্যাপারে জামায়াতের মতো উদার না হলে অনেক আসনে বিএনপির নারী ও বৃদ্ধ ভোটারদের ভোাট হারাতে হতে পারে। বিএনপির প্রার্থীদের বিষয়টি নিয়ে আগেই চিন্তা ভাবনা করা উচিত।