Image description

বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম থাকা নিয়ে চলছে সমালোচনা। কেবল প্রার্থী নয়, নির্বাচনি প্রচারণায়ও নারীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো কম। যদিও ভোটের মাঠে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ‘টার্গেট গ্রুপ’, সেখানে নেতৃত্বের জায়গায় তারা প্রায় অনুপস্থিত হওয়াটা নারীর এগিয়ে যাওয়ার চলমান প্রবণতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে—নারী অধিকারকর্মীদের নির্বাচনপূর্ব সময়ের পর্যবেক্ষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। আর যে প্রার্থীরা প্রচারণায় দৃশ্যমান ছিলেন, তারা বলছেন প্রতিকূলতার মধ্যে যে নারীরা এবার প্রার্থী হয়েছেন, তারাই আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবেন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি হলেও প্রার্থী তালিকায় নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। আর ভোটারের অনুপাতে সেই হার ৪৯.২৬ শতাংশ, ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থী ১৯৮১ জন। তাদের মধ্যে দলীয়ভাবে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৩৮ জন। বিএনপি ও বাসদ (মার্কসবাদী) সর্বোচ্চ ১০ জন করে প্রার্থী দিয়েছে। মোট নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৫ জন। এর বাইরে ১ জন প্রার্থী হিজড়া জনগোষ্ঠীর। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার নারী প্রার্থীর সংখ্যা কমেছে। ওই নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিলেন ১০১ জন, যা মোট প্রার্থীর ৫ শতাংশের বেশি।

এবারের নির্বাচনি প্রচারণায় গুরুত্ব দিয়ে মা-বোনেদের জন্য কী কী করবেন—তার তালিকা হাজির করেছে সবকটি বড় দল। নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে নানা বার্তা, প্রতিশ্রুতি ও সামাজিক-ধর্মীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা কিছুই বাদ পড়েনি। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলীয় প্রার্থী কম থাকার বিষয়টি কোনোভাবেই জায়েজ হয় না বলে মনে করেন অধিকারকর্মীরা। প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই আন্তর্জাতিকভাবে অধিকার আন্দোলনের চলমান ধারাকে ধরতে ব্যর্থ ও পুরোনো বলে উল্লেখ করেন তারা।

শুরুটা এমন হওয়ার শঙ্কা ছিল না। গত ডিসেম্বরে এনসিপি যখন ১২৫টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে, সেখানে ১৪ জন নারীকে মনোনয়ন দেয় দলটি। কিন্তু এরপর ঘটনা ঘুরে যায় দলটির জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে। জোটের আগেই দলটির নারী সদস্যদের প্রধান কয়েকজন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন। কেউ কেউ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান, কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনের মাঠে নামেন। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব পদ থেকে পদত্যাগ করে ডা. তাসনিম জারা ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপির মতো বড় একটি দলও মাত্র ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিলেও জামায়াত বা জামায়াত জোট থেকে কোনও নারীকে প্রার্থী দেওয়া হয়নি।

আমাদের দলগুলো কেন বেশি নারীকে প্রার্থী দেয় না এবং নারী প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে প্রচারণাকালের অভিজ্ঞতা কী বলে, জানতে চাইলে ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এবার আমরা চেয়েছিলাম সরাসরি ভোটে একশত নারী আসুক। কিন্তু মনোনয়ন দেখে আশাহত হয়েছি। যে কয়জন নারী অংশ নিয়েছেন—এটা সামনের দিনে নতুনদের উৎসাহিত করবে। নারীবিদ্বেষী যে মনোভাব সমাজে ও কিছু রাজনৈতিক দলের মধ্য আছে, সেটাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে যে নারীরা নির্বাচন করছেন, তারা সামনে নেতৃত্ব দেবেন।’’ তার নিজের রাজনীতি করার অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। নিয়মিত তার আসনে তাকে প্রচারণায় সরব উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।

নারীদের নিয়ে উন্নাসিকতা থাকবে, কিন্তু ভোটের মূল টার্গেট আবার সেই নারী ভোটাররাই— বিষয়টি অনেকটা একদিকে নারীকে সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে, আরেক দিকে নারীকে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে দেখতে চাচ্ছে না। এটাকে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক উল্লেখ করে ‘উই ক্যান’র সমন্বয়ক জিনাত আরা হক বলেন, ‘‘নারীকে যে এই জায়গায় তার পুরুষ সহ-রাজনৈতিক কর্মীরা দেখতে চান না, এটা জেনেই এই নারীরা ভোট দেবেন। গত কয়েক বছরে একটা বিষয় জনপ্রিয় করা সম্ভব হয়েছে, নারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় না থাকলেও পারে। এবারে যেটা নতুনত্ব লক্ষ করছি সেটা হলো—এতদিন এটা পুরুষরা বিশ্বাস করতো, এবার কিছু দলের নারীরাও রায় দিচ্ছে যে তারা এটা মেনে নিয়েই রাজনীতি করছেন।’’ বড় রাজনৈতিক দল নারী ইস্যুতে পুরোনো কথাই বলছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক পরিসের নারী অধিকার যে লাইনে ছিল, নতুনরা সেই লাইনের থেকে পিছিয়ে গিয়ে পুরোনো কথাগুলো বলছে। যা যা নারীর জন্য করবে বলা হচ্ছে, সেটিও যে বাস্তবায়ন হবে, তা বলা যাচ্ছে না।’’