এবারের জাতীয় নির্বাচনে স্বল্পসংখ্যক নারীকে প্রার্থী করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। প্রচারণায় বাধা, ঝুঁকি, সাইবার বুলিংসহ নানারকম অভিযোগ রয়েছে নারী প্রার্থীদের। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই। বড় দলগুলোর মধ্যে জামায়াত কোনো নারীকে মনোনয়ন না দিলেও সর্বোচ্চ ৯ জন নারীকে প্রার্থী করেছে বিএনপি। এছাড়া এনসিপি, গণঅধিকার, এবি পার্টিসহ বেশ কয়েকটি দলের রয়েছে নারী প্রার্থী।
নারী প্রার্থীর হার মাত্র সাড়ে তিন শতাংশের কাছাকাছি। শর্ত অনুযায়ী, দলীয় পদে নির্দিষ্ট হারে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা থাকলেও নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। ফলে দলগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণ নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ না করিয়েও নির্বাচনে বৈধতা পেয়েছেন।
ওদিকে, নারী প্রার্থীরা নানা অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনে ইশতেহার প্রণয়নের পর থেকেই তারা বিভিন্নভাবে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। নির্বাচনী অফিসে হামলা, নির্বাচনের জন্য অফিস ভাড়া দিতে অনাগ্রহ, ব্যানার ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা, সাইবার বুলিং, কর্মী-সমর্থকদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন, অনাকাক্সিক্ষত জরিমানাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন তারা। দেশের বিভিন্ন আসনের নারী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এ সব জানা গেছে। তারা বলছেন, এ সব কারণেই নির্বাচনে আশানুরূপ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দেখছেন না তারা।
ফরিদপুর-২ আসনের বিএনপি’র প্রার্থী শামা ওবায়েদ মানবজমিনকে বলেন, বিভিন্ন জায়গায় কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। সেই জায়গা থেকে নির্বাচন কমিশনকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। তিনি বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকায় নারী প্রার্থী হিসেবে আমি সমস্যায় পড়ছি। বিভিন্ন ইসলামিক দলের প্রার্থীরা আছেন, যারা মসজিদ, ওয়াজ মাহফিল ব্যবহার করছেন ভোট চাওয়ার জন্য। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে তারা ভোট চাচ্ছেন। অথচ নির্বাচন কমিশন বলেছে- ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা যাবে না। সেখানে তারা সুযোগ নিচ্ছেন। এখানে অবশ্যই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ভঙ্গ করে। কিন্তু আমি নারী প্রার্থী হিসেবে সেখানে যেতে পারছি না। তাছাড়া বিভিন্ন মিসইনফরমেশন, ডিজইনফরমেশন ইত্যাদি ছড়াচ্ছে, সে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে দেখতে হবে। কিছু ইসলামী দল উল্টা-পাল্টা কথা বলার চেষ্টা করে। বিচ্ছিন্নভাবে তারা নারীদের রাজনীতি বা নারীদের প্রার্থিতার বিষয়ে উল্টা- পাল্টা কথা বলার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত বরিশাল-৫ (সদর) আসনের প্রার্থী ডা. মনিষা চক্রবর্তী বলেন, প্রচ্ছন্নভাবে আমি হুমকি, ভয়ভীতির সম্মুখীন হচ্ছি। এখানে আচরণবিধি ভঙ্গের হিড়িক পড়ে গেছে। পিভিসি বিলবোর্ড টাঙানো হয়েছে। যেখানে রঙ্গিন বিলবোর্ড লাগানোর বিষয়টি নির্বাচনী বিধির মধ্যে নেই, সবখানে সাদা-কালো ও পচনশীল দ্রব্য ব্যবহারের কথা রয়েছে। এখানে একজন প্রার্থী অগ্নিকাণ্ডের স্থানে এসে টাকা বিতরণ করার মতো আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে। এসব নিয়ে নির্বাচন কমিশন যতোটা নিশ্চুপ, নির্বাচনের দিন তাদের কতটুকু স্বকীয়তা থাকবে সেটা নিয়ে আমরা সন্ধিহান হয়ে যাচ্ছি। তাছাড়া বিভিন্ন জায়গায় পেশিশক্তির বহ্নিপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনী অফিস নিতে দেয়া হচ্ছে না, মাইকিং থামিয়ে দেয়া হচ্ছে- এ সমস্ত বিষয়গুলোর কারণে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এখনো যথেষ্ট পরিমাণে নিশ্চিত করা হয়নি। মনিষা বলেন, শুধু সাইবার বুলিং নয়, আমাদের সরাসরি বুলিং করা হচ্ছে। এখানে একটি টকশোতে চরমোনাই পীরের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য আমাদের সরিয়ে দেয়া হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক বিএনপি নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা মানবজমিনকে বলেন, অন্যান্য প্রার্থী যে রকম বাধার মুখে পড়ে আমিও সে রকম বাধার মুখে পড়ছি। আমাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে, আমার নেতাকর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে, সমানে বহিষ্কার করা হচ্ছে। নেতাকর্মীদের বলা হচ্ছে ১২ তারিখের পর তাদের দেখে নেয়া হবে।
প্রচারণার ক্ষেত্রে বৈষম্যের কথা জানিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, আমাকে একবার চল্লিশ হাজার, আরেকবার দশ হাজারসহ প্রায় পঞ্চান্ন হাজার টাকার মতো জরিমানা করেছে। অথচ একই আসনের বিএনপি’র জোট সমর্থিত প্রার্থীকে এক টাকাও জরিমানা করা হয়নি। কিন্তু সে প্রতিদিন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে। নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের প্রার্থিতা কম হওয়ার কারণ কী- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে গত দশ বছর মাঠে কাজ করার পরও আমাকে নমিনেশন দেয়নি। আমি আমার মতো নির্বাচনে দাঁড়িয়ে গেছি। মানুষ আমার সঙ্গে আছে। যদি তারা কারচুপি না করে জয়ের বিষয়ে আমি শতভাগ আশাবাদী।
ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ বলেন, প্রচারণার জন্য লাগানো ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়, খুলে ফেলা হয়। এই বিষয়ে প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিনেই আমার নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর হয়। কটূক্তিমূলক মন্তব্য, সাইবার বুলিংয়ের শিকার তো হচ্ছিই।
ঢাকা-১২ আসনে গণসংহতি আন্দোলন (জিএসএ) মনোনীত প্রার্থী তাসলিমা আখতার বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় বিভিন্ন জায়গায় আমার বিলবোর্ড ফেলে দেয়া হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা ধরনের হয়রানি করা হচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে, সামনে আরও কী হবে- সেটা নিয়ে শঙ্কিত হচ্ছি।