ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করছে সরকার। এবারই প্রথম কোনো নির্বাচনে পুরো দেশের সবক’টি ভোটকেন্দ্রে ক্যামেরা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে ভোটগ্রহণ করা হবে। তবে এই ক্যামেরা লাগানো, নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য মিলছে না। এতে জনমনে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও স্থাপন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও কোথাও একটি দল সমর্থিত ব্যবসায়ীরা ক্যামেরা লাগানোর দায়িত্ব পেয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোটকেন্দ্রে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেয়ার জন্যই মূলত সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র শনাক্ত করে ২১ হাজার ৯৪৬টি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য ৭১ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব ভোটকেন্দ্রে ক্যামেরা স্থাপনের কাজ প্রায় শেষের দিকে। স্থানীয় প্রশাসনই এসব ক্যামেরা স্থাপন করছে। দেশের প্রায় ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬ হাজার ৫৫২টি কেন্দ্রে আগে থেকেই সিসি ক্যামেরা রয়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলোতে নতুন করে ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার কিছুদিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, বরাদ্দের আওতায় প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে কমপক্ষে ছয়টি করে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ তালিকার বাইরে থাকা কেন্দ্রগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের নিজস্ব অর্থায়নে ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে সব জেলায় এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং অনেক এলাকায় তা দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। ২৯৯টি ভোটকেন্দ্র শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। এসব কেন্দ্রে সৌর বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, প্রয়োজনে জেনারেটরের মাধ্যমে হলেও ভোটের দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
সারা দেশের একাধিক রিটার্নিং, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে কিছু কিছু ভোটকেন্দ্রে অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্টে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বা অন্য কেন্দ্রগুলোতে যদি কোনো অপ্রীতিকর কিছু ঘটে তা হলে ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। সিসি ক্যামেরার পুরো নিয়ন্ত্রণ করবেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তারা। তারা পুরো জেলার কেন্দ্রগুলো পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। এ ছাড়া সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারাও ভোটকেন্দ্র সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং করবেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা সিসি ক্যামেরা দিয়ে ভোটকেন্দ্র মনিটরিং করবেন আর পুলিশ বডি ওর্ন ক্যামেরা দিয়ে ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করবে। এজন্য ২৫ হাজারের বেশি ক্যামেরা পুলিশকে সরবরাহ করা হয়েছে।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, কেরানীগঞ্জ উপজেলায় মোট ২২১টি কেন্দ্র রয়েছে। প্রত্যেকটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। চট্টগ্রামের সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা বশির আহমেদ বলেন, ইসির পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকারকে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা তাদের মতো করে করছে। লাগানো অনেকটা শেষ পর্যায়ে। চট্টগ্রাম নগরের সিসি ক্যামেরা সিটি করপোরেশনের লোকজন দায়িত্বে লাগানো হচ্ছে। আর উপজেলার দায়িত্ব ইউএনও’র হাতে দেয়া হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা নুরমহল আশরাফী মানবজমিনকে বলেন, মুন্সীগঞ্জের ৪৬৯টি ভোটকেন্দ্রের প্রত্যেকটিতে সিসি ক্যামেরা থাকবে। আইপি সিস্টেমের মাধ্যমে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে মনিটরিং হবে। আমি সেন্ট্রালি নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং করবো। মনিটরিংয়ে পুলিশের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আর সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে থাকবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ভোটকেন্দ্রের সিসি ক্যামেরা পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করবে না। পুলিশ শুধুমাত্র ২৫ হাজার ৭০০ বডি ওর্ন ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করবে। ভোটকেন্দ্রের ক্যামেরা রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিটরিং করবেন।