রাজশাহী বিভাগের আট জেলার ৩৯টি আসনের মধ্যে অন্তত ১৭টিতে এককালের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী ও দলের বিদ্রোহীদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এসব আসনের মধ্যে ১২টিতে জামায়াত প্রার্থীদের এবং ৫টি আসনে বিদ্রোহীরা গড়ে তুলেছেন শক্ত অবস্থান। এই পাঁচটি আসনে বিদ্রোহীদের কাছে বিএনপি প্রার্থীরা কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। দলীয় নেতাকর্মীরা বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে দলীয় সূত্রে।
এলাকার ভোটার ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্বল প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া, দলীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের তুলে নিতে না পারার কারণে বিএনপি আলোচিত ১৭টি আসনে ঝুঁকিতে পড়েছে। এছাড়া নেতাকর্মীদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি, দখল ও ঢালাও মামলা বাণিজ্য এলাকার মানুষকে বিএনপির প্রতি বিমুখ করেছে। এর বাইরে জামায়াত প্রার্থীদের শক্ত অবস্থান বিএনপিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির দুর্গখ্যাত বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে দলীয় প্রার্থী মীর শাহে আলম তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী মাওলানা শাহাদুজ্জামানের শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। এই আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না কেটলি প্রতীকে নির্বাচন করছেন। মান্নাকে আসন ছেড়ে না দেওয়াও বিএনপি প্রার্থীর ঝুঁকির একটি বড় কারণ বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্রগুলো।
সূত্রগুলো থেকে আরও জানা গেছে, বগুড়া-২ আসনে জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক মামলায় অনেক নিরীহ মানুষকে আসামি করে ব্যাপক মামলা বাণিজ্য হয়েছে। এসব মামলার পেছনে বিএনপি নেতাকর্মীদেরই দায়ী করেন ভুক্তভোগীরা। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সমর্থকরা জামায়াতকে ভোট দেবে-এমন সম্ভাবনার কথা বলেছেন অনেকেই। এ বিষয়ে জানতে বিএনপি প্রার্থী শাহে আলমকে মোবাইলে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। জামায়াত প্রার্থী শাহাদুজ্জামানের দাবি, তিনি আসনটিতে জয়ের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী। ভোটারদের বিপুল সমর্থন পাচ্ছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীরা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, তিনটি আসনেই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকট। জেলা বিএনপির কোনো নেতাই এখন পর্যন্ত কোনো দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামেননি। দলীয় প্রার্থীরা একা একা প্রচার করছেন। জামায়াতের প্রার্থীরা তিনটি আসনেই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। জেলা জামায়াতের আমির আবুজার গিফারির দাবি, তিনটি আসনেই জামায়াতের প্রার্থীরা জয়ী হবেন। রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে বিএনপি প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীনের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মজিবুর রহমান। মজিবুর রহমান ১৯৮৬ সালে এই আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। আসনটি পেতে জামায়াতের নেতাকর্মীরা মাটি কামড়ে ধরেছেন।
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনটিতেও বিএনপির ডিএম জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে জামায়াতের ডা. আব্দুল বারী সরদার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। জামায়াত প্রার্থী এলাকায় চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয়দের কাছে বেশ জনপ্রিয়। অন্যদিকে বিএনপির ডিএম জিয়ার বিরুদ্ধে এলাকায় বাহিনী তৈরি করে সন্ত্রাস সৃষ্টি, দখল, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে পরিস্থিতি আরও জটিল। এখানে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলামের পাশাপাশি দলীয় দুই বিদ্রোহী খাইরুল হক শিমুল ও ব্যারিস্টার রেজাউল করিম ভোটের মাঠে সক্রিয়। জামায়াতের প্রার্থী মনজুর রহমানও ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন। বিএনপির ভোট তিন ভাগে বিভক্ত হলে দলীয় প্রার্থীর জয় পাওয়া কঠিন হবে। রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনটিতেও বিএনপি প্রার্থী শফিকুল হক মিলন জামায়াত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন।
এদিকে নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে বিএনপির ফারজানা শারমীন পুতুলের দলীয় ভোটের বড় অংশে ভাগ বসাচ্ছেন বিদ্রোহী তাইফুল ইসলাম টিপু। দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের অধিকাংশই টিপুর সঙ্গে প্রকাশ্যে প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। তাদের দাবি, বিদ্রোহী টিপুর অবস্থানই শক্তিশালী। বিএনপির কাড়াকাড়ির মধ্যে আসনটিতে জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনটিতে বিএনপির আনোয়ারুল ইসলামের পাশাপাশি বিদ্রোহী দাউদার মাহমুদ প্রচারে তৎপর। আসনটি ১১ দলীয় জোট ছেড়ে দিয়েছে এনসিপির জার্জিস কাদিরকে। তবে জামায়াতের নেতাকর্মীরা এনসিপি প্রার্থীর পক্ষে তেমনভাবে মাঠে নামেননি। তাদের অনেকেই দাউদার মাহমুদকে সমর্থন দিচ্ছেন। এদিকে নওগাঁর ৬টি আসনের কোনোটিতেই বিএনপির প্রার্থীরা নিশ্চিতভাবে জয়ের স্বপ্ন দেখতে পারছেন না। নওগাঁ-১ (সাপাহার-পোরশা-নিয়ামতপুর) আসনে বিএনপির মোস্তাফিজুর রহমান, বিদ্রোহী সালেক চৌধুরী ও জামায়াতের অধ্যক্ষ মাহবুবুল আলমের মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে। বিএনপির বিদ্রোহীর অবস্থান বেশ শক্ত। সালেক চৌধুরীর দাবি, তিনি জিতবেন।
নওগাঁ-৩ (মহাদেবপুর-বদলগাছি) আসনে বিএনপি আকিজ বশির গ্রুপের এমডি ফজলে হুদাকে মনোনয়ন দিলেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন বিদ্রোহী পারভেজ সিদ্দিকী ও জামায়াতের মাহফুজুর রহমান। নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রানীনগর) আসনে বিএনপির শেখ রেজাউলের পাশাপাশি বিদ্রোহী আলমগীর কবির নির্বাচন করছেন। জামায়াতের খবিরুল ইসলামও আসনটিতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। অন্যদিকে নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনে বিএনপির একরামুল বারী জামায়াতের আব্দুর রাকিবের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। একরামুল বারী বলেন, দলের অভ্যন্তরে কিছুটা সমস্যা থাকলেও তা কেটে যাচ্ছে। আব্দুর রাকিব বলেন, আসনটিতে দাঁড়িপাল্লার বিপুল ভোটে জয় সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া আংশিক) আসনে বিএনপির শামসুর রহমান ওরফে ভিপি সামসু ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন। তবে তিনি জামায়াতের ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমানের শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। নাজিবুর রহমান জামায়াতের সাবেক আমির প্রয়াত মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে। নিজামী ১৯৯১ ও ২০০১ সালে এই আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল জামায়াত প্রার্থীকে সুবিধা দিচ্ছে। ব্যারিস্টার নাজিবের দাবি, তিনি জেতার ব্যাপারে আশাবাদী। এই আসনে জামায়াতের ভোটব্যাংক আছে।
পাবনা-৫ (সদর) আসনটিতেও জামায়াতের ভোটব্যাংক রয়েছে। বিএনপির শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস হেভিওয়েট প্রার্থী হলেও জামায়াতের ইকবাল হোসাইন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। আসনটিতে জামায়াতের মাওলানা আব্দুস সোবহান একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। পাবনা-৩ (চাটমোহর-ভাঙুড়া-ফরিদপুর) আসনটিতে বিএনপির হাসান জাফির তুহিন বেশ বেকায়দায় রয়েছেন। চলনবিল অধ্যুষিত আসনটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলামকে সমর্থন দিচ্ছেন দলের একাংশের নেতাকর্মীরা। এতে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আছগার সুবিধা পাচ্ছেন।
বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত বলেন, কোথাও কোথাও কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা ধানের শীষেই ভোট দেবেন। বিএনপি প্রার্থীরা বিভাগের সব আসনেই বিপুল ভোটে জিতবেন বলে আমি আশাবাদী।