Image description
সাবেক স্পিকারেও বাধা নেই

বিদায়ি সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করলেও নতুন সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পড়াতে পারবেন। এক্ষেত্রে সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মামলাও রয়েছে মাত্র একটি। সেক্ষেত্রে আদালতে তার জামিন হলে এবং সরকার চাইলে তিনি যথাসময়ে প্রকাশ্যে আসতে পারেন। জাতীয় নির্বাচনের পর নাটকীয়ভাবে এমন কিছু ঘটলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যুগান্তরকে এমনটি জানিয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞসহ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের অনেকে।

এদিকে এর বাইরে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি শপথ পড়াতে পারবেন। জাতীয় সংসদ পরিচালিত হয় যে কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে, সেখানে দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫-এর ১ দফায় রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তিরও শপথ পড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার যদি সাবেক স্পিকারের সাংবিধানিক উল্লিখিত সুযোগকে কাজে লাগাতে না চায়, সেক্ষেত্রে শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। এ বিষয়ে সংবিধানের ১৪৮(১) অনুচ্ছেদের ২(ক) দফায় সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে।

এছাড়া সরকার চাইলে কারাগারে আটক ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকুও শপথ পড়াতে পারবেন। এজন্য তিনি যদি জামিন না পান, তাহলে সরকার তাকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে শপথ পড়ানোর ব্যবস্থা করতে পারবে। তবে শেষ পর্যন্ত কে নতুন সংসদ-সদস্যদের শপথ পড়াবেন, তা জানতে কয়েকটি দিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। ইতোমধ্যে সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে বিকল্প একাধিক প্রস্তাব উত্থাপন করে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এ সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। সূত্র জানায়, প্রস্তাবটি পাঠানোর আগে এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংসদ সচিবালয়ের মধ্যে একাধিক অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়।

তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের ১৪৮(১) অনুচ্ছেদের ২(ক) দফা অনুসরণ করে সিইসিকে এ দায়িত্ব দিতে চাইলেও এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির মতামত নিয়ে আদেশ জারি করতে হবে। তারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে সুস্পষ্ট সমাধান আমাদের সংবিধানেই দেওয়া আছে। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেওয়া আছে। তাই এ নিয়ে অযথা বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।

বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে বুধবার যুগান্তরকে বলেন, বিদায়ি সংসদের স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতি কিংবা তাদের অপারগতায় নতুন সংসদের সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে শপথ পড়াবেন, সেজন্য আবার রাষ্ট্রপতির আদেশ প্রয়োজন হবে। তাই এ নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই। আর এ কাজটি সংসদ সচিবালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পন্ন করবে।

১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়াামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। দেশ পরিচালনার জন্য দায়িত্ব নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আর এই সরকারের অধীনেই ১৭ মাসের মাথায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নির্বাচন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টিসহ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা এই ভোটযুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। আওয়ামী লীগ এবং তাদের শরিক ১৪ দল ছাড়াই এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতই হচ্ছে একে-অপরের মূল প্রতিপক্ষ।

সংবিধান অনুসারে নির্বাচনের পর গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে বিদায়ি সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ পড়াবেন। তা না হলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি এই শপথ পড়ানোর কাজটি সম্পন্ন করবেন। যদিও গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকারের পদ থেকে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরেই তার কোনো খবর মিলছে না। বিদায়ি সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু তার পদ থেকে পদত্যাগ না করলেও হত্যাসহ একাধিক মামলায় তিনি এখন কারাগারে আটক রয়েছেন।

সংবিধান এবং কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ পড়ান বিদায়ি সংসদের স্পিকার। তিনি না থাকলে শপথ পড়াবেন ওই সংসদেরই ডেপুটি স্পিকার। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনও বসবে বিদায়ি সংসদের স্পিকারের সভাপতিত্বে। তিনি না থাকলে ওই সংসদের ডেপুটি স্পিকার নতুন সংসদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। তাদের যে কোনো একজনের সভাপতিত্বেই নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ গ্রহণের পাশাপাশি নতুন সংসদের স্পিকার নির্বাচন করা হয়। এরপর নবনির্বাচিত স্পিকার রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়ে নতুন অধিবেশনে সভাপতির আসন নেবেন।

তার সভাপতিত্বে সংসদের প্রথম অধিবেশনে নতুন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এরপর পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীর মনোনয়ন ও শোক প্রস্তাব শেষে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদে ভাষণ দেবেন। তার ভাষণের পর প্রথম দিনই সংসদ অধিবেশন মুলতবি রাখা হবে। পরে অধিবেশন শুরু হলে সেখানে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা শুরু হবে। বছরের প্রথম এবং একই সঙ্গে নতুন সরকার ও সংসদেরও প্রথম অধিবেশন হওয়ায় সাধারণত এটি বেশ দীর্ঘ হয়। এই অধিবেশনে চিফ হুইপ, হুইপ, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা নির্বাচন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে। এর আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া দল তাদের সংসদীয় দলের বৈঠকে সংসদ নেতা এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া (বিরোধী) দল তাদের (বিরোধীদলীয়) নেতা নির্বাচিত করবেন।

কিন্তু বিদায়ি সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করায় এবং ওই সংসদের ডেপুটি স্পিকার কারাগারে থাকায় এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, নতুন সংসদ-সদস্যদের কে শপথ পড়াবেন। কার সভাপতিত্বে বা নতুন সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশন শুরু হবে। কে পালন করবেন এই গুরুদায়িত্ব। ভোটের দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে ততই সর্বত্র এ নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে ২৮ জানুয়ারি সংসদ সচিবালয় নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ পাঠ কে করাবেন, সে বিষয়ে মতামত চেয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের কাছে নথি পাঠিয়েছে। এখানে প্রয়োজনীয় ভেটিং শেষে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা সারসংক্ষেপ আকারে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অনুমোদনের পর নথিটি যাবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে। এরপর রাষ্ট্রপতির সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে আদেশ জারি হবে।

নতুন সংসদের নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথের বিষয়ে সংবিধানের ১৪৮ (১) অনুচ্ছেদের ২(ক)-এ বলা হয়েছে, ‘১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন অনুষ্ঠিত সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদ্দুশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যে কোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’

এক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির দ্বিতীয় অধ্যায়ে ৫(১)-এ বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের ৭১ অনুচ্ছেদের (২) দফার (গ) উপ-দফায় বর্ণিত শর্তসাপেক্ষে, সাধারণ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম (অধিবেশনের পূর্বে) সংসদে নির্বাচিত প্রত্যেক ব্যক্তি সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে প্রদত্ত সংসদ-সদস্যদের জন্য নির্ধারিত ফরমে বিদায়ি স্পিকারের এবং তাহার অনুপস্থিতিতে বিদায়ি ডেপুটি স্পিকারের এবং উভয়ের অনুপস্থিতিতে এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয় পদ শূন্য থাকিলে স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ-সদস্যদের শপথ পরিচালনা ও সংসদে সভাপতিত্ব করিবার উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তির সম্মুখে শপথ গ্রহণ করিবেন এবং উহাতে স্বাক্ষর করিবেন।’ কার্যপ্রণালি বিধির এই দফা অনুসরণ করে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ পড়াবেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর বাইরে সরকার চাইলে বিদায়ি সংসদের পদত্যাগী স্পিকার এবং কারাবন্দি ডেপুটি স্পিকারও নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ পড়াতে পারবেন। সংবিধানের ৭৪(৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন স্পিকার কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত আগের সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার নিজ পদে বহাল আছেন বলে গণ্য হবেন। এর আলোকে সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করলেও তার নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ পড়াতে আইনি কোনো বাধা নেই।

বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে বলেন, পদত্যাগ করলেও নতুন স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত শপথ পড়াতে শিরীন শারমিন চৌধুরীর কোনো আইনি বাধা নেই।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই আত্মগোপনে আছেন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, তিনি কোথায়, কিভাবে আছেন-বর্তমান সরকার এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তা ভালোভাবে জানা আছে। এছাড়া ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে রয়েছে মাত্র একটি মামলা। রংপুরের পীরগঞ্জে একটি হত্যা মামলায় তিনি এক নাম্বার আসামি। এর বাইরে তার বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা নেই।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন সংসদের প্রথম দিন রাষ্ট্রপতি কি ভাষণ দেবেন, সে বিষয়েও খসড়া তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করেন রাষ্ট্রপতি। পরবর্তীতে ওই সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করায় অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর একটি অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। ওই অধ্যাদেশের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, সংসদ সচিবালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পিকারের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অন্যান্য দায়িত্ব এবং ক্ষমতা (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৪ অনুযায়ী সংসদ কার্য-সংক্রান্ত দায়িত্ব ব্যতীত) সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা পালন ও প্রয়োগ করতে পারবেন। এই অধ্যাদেশের আলোকে একটি কমিশনও গঠন করা হয়। কমিশনের চেয়ারম্যান সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। সদস্য হিসাবে রয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব এবং অর্থ বিভাগের সচিব। কমিশন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন।