Image description
সাইবারজগতে প্রতারণার নিত্যনতুন কৌশল

দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় গ্রুপ অব কোম্পানির হিসাব শাখার ডেপুটি ম্যানেজার মো. মাসুদ। কোম্পানীর বিশ্বস্ত কর্মকর্তা মাসুদের পোস্টিং রাজবাড়ীতে। গত নভেম্বরের শেষদিকে বায়রা রিক্রুটিং এজেন্সি নামের ফেসবুক পেজ থেকে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মেসেঞ্জারে একটি ইনভাইটেশন আসে। মাসুদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তিনি অনলাইনে পার্টটাইম কাজ করে উপার্জন করতে ইচ্ছুক কি না। মাসুদ আগ্রহ দেখান। তখন তাকে টেলিগ্রামের একটি লিংক দেওয়া হয়। ওই এজেন্সি থেকে মাসুদকে বলা হয়, ‘আপনাকে বিদেশি ৭৫টি সিনেমার রেটিং (লাইক কমেন্ট শেয়ার) দিতে হবে। তা থেকে যে লাভ আসবে, এর ৫ শতাংশ আপনাকে দেওয়া হবে।’ মাসুদ রাজি হলে তাকে একটি ওয়ার্কিং আউটলেট আইডিও খুলে দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, ওই আইডিতে আপনার প্রাপ্ত টাকা জমা হবে। সে অনুযায়ী কাজ শুরু করেন মাসুদ। প্রথমদিন কাজ করার পর মাসুদের আইডিতে ৮০০ টাকা জমা হয়েছে মর্মে দেখানো হয়। ওইদিনই বিকাশের মাধ্যমে সেই টাকা মাসুদকে দেওয়া হয়।

এদিকে ওয়ার্কিং আউটলেট আইডিতে ৯ হাজার টাকা জমা দেখিয়ে ওই এজেন্সি থেকে বলা হয়, এখানে কাজ করতে হলে কিছু টাকা জমা রাখতে হয়। এজেন্সির পক্ষ থেকে আপনার অ্যাকাউন্টে ওই টাকা জমা রাখা হয়েছে। এখন সেই টাকা ফেরত নিতে চায় এজেন্সি। মাসুদ আপত্তি না করে অনুমতি দিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে তাকে বলা হয়, আপনি পুনরায় কাজ করতে হলে ৯ হাজার টাকা জমা করতে হবে। মাসুদ টাকা জমা করার পর তাকে রেটিং বাড়ানোর কাজ দেওয়া হয়। কাজ করার প্রথমদিনেই মাসুদ ১৩ হাজার টাকা পান। আবার ১১ হাজার টাকা জমা করতে বলা হয় তাকে। কাজ করার পর ওইদিন পান ১৮ হাজার টাকা। পরে ১৯ হাজার টাকা জমা দিয়ে কাজ করার পর পান ৩৬ হাজার টাকা। এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে জমার অঙ্ক। বাড়তে থাকে লভ্যাংশও। এজেন্সির দেওয়া বাংলাদেশি বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেন মাসুদ। একপর্যায়ে ৬০ লাখ টাকা জমা করেন তিনি। এ পর্যায়ে মাসুদের লভ্যাংশ দেখানো হয় ১ কোটি টাকার বেশি। এই টাকা তোলার জন্য মাসুদকে ১৫ লাখ টাকার ইন্স্যুরেন্স করার অফার দেওয়া হয়। পাশাপাশি বলা হয়, আপনার আইডি মার্চেন্ট হয়ে গেছে। এত টাকা তুলতে হলে ৮ লাখ টাকা জমা দিতে হবে। তখন মাসুদ জানান, তার কাছে আর কোনো টাকা নেই। মাসুদের কাছ থেকে এ কথা শোনার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় বায়রা রিক্রুটিং এজেন্সি। মাসুদ তখন বুঝতে পারেন, তিনি ভয়াবহ স্ক্যামারের খপ্পরে পড়েছেন। তিনি জানতে পারেন, বায়রা রিক্রুটিং এজেন্সি একটি বায়বীয় নাম। বাধ্য হয়ে তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন রাজধানীর বাড্ডা থানায়। পাশাপাশি ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) কাছেও অভিযোগ দেন।

কেবল মাসুদ একাই নন, প্রতিনিয়ত এভাবে সাইবার স্ক্যামিংয়ের শিকার হচ্ছেন দেশের অসংখ্য মানুষ। এর নেপথ্যে কাজ করছে স্ক্যামিং সেন্টার। যাদের কাজই হচ্ছে সাইবার জালিয়াতি। দেশের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন সেন্টার থেকে নিত্যনতুন ফাঁদ পাতছে স্ক্যাম স্টাররা। তাদের ফাঁদে পড়ছেন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম ব্যবহারকারীরা। তারা শিকার হচ্ছেন ডিজিটাল স্ক্যামিংয়ের। ডিজিটাল স্ক্যামিং হলো ভয়াবহ সাইবার প্রতারণা। এর মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ আর ব্যক্তিগত তথ্য।

সাধারণত, অজ্ঞাত স্থান থেকে আর্থিক সুবিধার অফার দেওয়ার মাধ্যমে এই ডিজিটাল স্ক্যামিংয়ের শুরু। অনলাইনে পার্টটাইম কাজের মাধ্যমে উপার্জন, গিফট ভাউচার পাঠানোর প্রলোভন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে প্রায়ই স্ক্যামিং হচ্ছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পাঁচতারকা রিভিউ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে স্ক্যাম স্টাররা। শুধু বাংলাদেশই নয়, অন্যান্য দেশের নাগরিকও এর ফাঁদে পড়ছেন। ভয়াবহ স্ক্যামিংয়ের অভিযোগে চীন ইতোমধ্যে একই পরিবারের ১১ জনের ফাঁসি কার্যকর করেছে।

সিআইডি সূত্র জানায়, স্ক্যামিং সেন্টারের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে যেসব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো মূলত ভুয়া হিসাব নম্বর। যার নামে হিসাব খোলা হয়েছে, তিনি বিষয়টি জানেনই না। অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে। সিআইডির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, গভীর উদ্বেগের বিষয়-স্ক্যাম স্টাররা বাংলাদেশ থেকেও স্ক্যামার সংগ্রহ করছে। এক্ষেত্রে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক বা বিদেশে অবস্থানরত সমস্যাগ্রস্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের টার্গেট করা হচ্ছে। তাদের মোটা অঙ্কের বেতনে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কম্বোডিয়া, লাউস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশের স্ক্যাম সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর সেসব সেন্টার থেকেই ভিকটিম হচ্ছেন বাংলাদেশিরা। কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের কয়েকটি স্ক্যাম সেন্টার থেকে এ পর্যন্ত ২৮ জন বাংলাদেশিকে ফেরত আনা হয়েছে। তবে উদ্ধার করা যায়নি প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া টাকা। গত ২১ জানুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে দেওয়া এক চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও লাওসে অবস্থিত অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারগুলোয় অবৈধভাবে নিয়োজিত আছেন। তাদের কেউ কেউ স্বেচ্ছায়, আবার কাউকে কাউকে জোর করে অবৈধ কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে। ব্যাংককে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এ ধরনের আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত অপরাধী চক্র ও দালালদের চিহ্নিত করার অনুরোধ জানিয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের এক স্ক্যাম সেন্টার থেকে উদ্ধার ৮ বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরেছেন। তারা হলেন আব্দুল মালেক, হাবিবুর রহমান, রহিম বাদশা, এসকে মিনহাজুল হোসেন, মেহরাজ হাসান, রিয়াজ ফকির, রিপন মিয়া ও উলহাসায় মারমা। তাদের কাউকে দুবাই, মালয়েশিয়া বা সরাসরি ঢাকা থেকে ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ওসব দেশে নেওয়া হয়।

মিয়ানমার থেকে দেশে ফেরা হাবিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ২০২৩ সালে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে আমি মালয়েশিয়া যাই। সেখানে নূর নবী নামে এক বাংলাদেশির সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি আমাকে থাইল্যান্ডে ভালো কাজের (হোটেলে) কথা বলেন। সেখানে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য ২ লাখ টাকা দাবি করা হয়। নূর নবীর কথা বিশ্বাস করে আমি ২ লাখ টাকা দিই। কিন্তু আরও দুই বিদেশি নাগরিকসহ (একজন পাকিস্তানি এবং অন্যজন কেনিয়ান) আমাকে থাইল্যান্ড না নিয়ে জঙ্গল, নৌ এবং সড়কপথে অবৈধভাবে মিয়ানমারে নেওয়া হয়। ২০২৫ সালে সেখানে নেওয়ার পর আমাকে জোর করে স্ক্যামিং সেন্টারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

স্ক্যাম সেন্টার থেকে ফেরা মেহরাজ হাসান যুগান্তরকে জানান, স্ক্যামিং সেন্টারে তার কাজ ছিল মূলত ফেসবুকের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর সংগ্রহ করা। প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফোন নম্বর সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে তাকে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া হতো। এসব শাস্তির মধ্যে ছিল প্রচণ্ড রোধে মাঠে দৌড়ানো, ২০ লিটার ওজনের পানির পাত্র বহন করা, দীর্ঘ সময় অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা প্রভৃতি।

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের মার্চে ১৮ বাংলাদেশি নাগরিককে মিয়ানমারের স্ক্যাম সেন্টার থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের একজন আলিফ সিআইডিকে জানিয়েছেন, দুবাইয়ে জাহাজে কাজ করতেন তিনি। বেশি বেতনে ডেটা এন্ট্রির কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে থাইল্যান্ড নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে মিয়ানমার নিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মানুষের নাম, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল প্রভৃতি সংগ্রহ করা ছিল তার মূল কাজ।

২০২৫ সালের মে মাসে পৃথক ঘটনায় কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টার থেকে দুইজনকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে আল আমিন খান নামের একজনকে ২৩ মে এবং সজিব নামের অন্যজনকে ২৭ মে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। একটি ঘটনায় কুষ্টিয়ার মিরপুর থানায় এবং অন্য ঘটনায় কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানায় মামলা হয়। মামলা দুটির তদন্তকাজ চলমান। এছাড়া স্ক্যামসংক্রান্ত একটি মামলায় সিআইডি ইতোমধ্যে চার্জশিট দিয়েছে। স্ক্যামিংয়ের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তালেব যুগান্তরকে বলেন, স্ক্যামাররা বাংলাদেশি নাগরিকদের ফোর্স ইনভেস্টমেন্ট, ব্ল্যাকমেইলিং, যৌনতা, মানি লল্ডারিংসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জোর করে নিয়োজিত করছে। এমন বাস্তবতায় বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কম্বোডিয়া, লাউস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম যাওয়ার সময় আমাদের নাগরিকদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।