Image description
 

বাংলাদেশের বিদ্যমান সরকার কাঠামো অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। অন্যদিকে, কাগজে-কলমে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও বাস্তবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত থাকায় পদটি অনেকটাই আলংকারিক রূপ ধারণ করেছে।

 

এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনতে ‘জুলাই সনদ’-এ রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব বাড়ানোর প্রস্তাব আনা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, দায়িত্ব ও নির্বাচন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

বদলাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া হবে সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সব সদস্যের গোপন ব্যালটের মাধ্যমে। বর্তমানে হাত তুলে দৃশ্যমানভাবে ভোট দেওয়ার পদ্ধতির পরিবর্তে গোপন ভোট চালু হলে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারবেন।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এতে সংসদের ফ্লোর ক্রসিং সংক্রান্ত বাধা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

 

রাষ্ট্রপতির বাস্তব ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

মনির হায়দার বলেন, সাধারণত রাষ্ট্রপতির দুটি প্রধান দায়িত্ব রয়েছে—প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও বিচারপতি নিয়োগ। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এসব সিদ্ধান্ত মূলত প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই হয়ে থাকে।

তিনি জানান, বাস্তবে প্রধানমন্ত্রী যাকে চান তাকেই বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

‘হ্যাঁ’ ভোটে বাড়বে রাষ্ট্রপতির স্বাধীনতা

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন সংস্কারমূলক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। পাশাপাশি তিনি নিজ ইচ্ছায় নিয়োগ দিতে পারবেন—

  • বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর

     
  • জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য

     
  • তথ্য কমিশনের প্রধান ও কমিশনাররা

     
  • প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য

     
  • আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য

     
  • বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য

     

গঠিত হবে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ

জুলাই সনদ অনুযায়ী, ১০০ সদস্যবিশিষ্ট সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যাদের নির্বাচন হবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতিতে।

কোনো দল জাতীয় নির্বাচনে আসন না পেলেও যদি নির্দিষ্ট শতাংশ ভোট পায়, তাহলে তারা উচ্চকক্ষে প্রতিনিধি পাবে। এর ফলে সংসদে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রপতির যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৪)-এ বর্ণিত যোগ্যতা বহাল থাকবে। পাশাপাশি প্রার্থী মনোনয়নের সময় কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয়, সরকারি বা রাজনৈতিক দলের কোনো পদে থাকতে পারবেন না।

সংশোধন হবে সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতে পারবেন।

রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়া

জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধানে রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়া যুক্ত করা হবে। রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে।

প্রক্রিয়াটি হবে—

  • নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাস

     
  • এরপর উচ্চকক্ষে প্রেরণ

     
  • শুনানি শেষে উচ্চকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনে চূড়ান্ত অনুমোদন

     

সাজা মওকুফের ক্ষমতা

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, মামলার বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সম্মতি সাপেক্ষে কোনো আদালত কর্তৃক প্রদত্ত দণ্ড রাষ্ট্রপতি মৌখিকভাবে স্থগিত বা রদ করার ক্ষমতা পাবেন।

সংবিধানে যুক্ত হবে জুলাই সনদের বিধান

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতি, ক্ষমতা ও দায়িত্ব সংক্রান্ত এসব বিষয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি হবেন সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত একজন ব্যক্তি।