Image description
 

চলতি বছরের জানুয়ারিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর এক নজিরবিহীন ভাষণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা দেশগুলো এমন এক ‘আদর্শ ও শৃঙ্খলাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’র কথা বলে সমৃদ্ধ হয়েছে, সেটি তারা নিজেরাই বিশ্বাস করে না, তারা অবগত যে, এটার আগাগোড়াই হিপোক্রেসি বা ভণ্ডামি।

পশ্চিমা বিশ্ব লিবারেলিজম বা উদারনৈতিক আদর্শের কথা বলেছে, কিন্তু নিজেদের স্বার্থ হাসিলের সময় সেই নিয়মে ছাড় দিয়েছে। মুক্তবাণিজ্যের পক্ষে কথা বলেছে, কিন্তু তা প্রয়োগ করেছে বেছে বেছে। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ভাষা ব্যবহার করেছে, অথচ বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্ষেত্রে সেই নীতির প্রয়োগ করেছে অসমভাবে।

কার্নি স্বীকার করেন, ‘আমরা এই আচারগুলো মেনে চলেছি আর কথার সঙ্গে বাস্তবতার যে ফাঁকফোকর ছিল, তা বেশির ভাগ সময় এড়িয়ে গেছি।’

প্রথমত, এই ব্যবস্থা সহনীয় ছিল এর স্থিতিশীলতার কারণে। দ্বিতীয়ত, দ্বিচারিতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোতে প্রয়োজনীয় ‘নিত্যপণ্য’ সরবরাহ করত। কিন্তু কার্নি মনে করছেন, এই সমঝোতা আর কাজ করছে না।

কার্নি যাকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ‘ভাঙন’ বলেছেন, তার মূল কারণ হলো এই সমঝোতার পতন। ট্রাম্পের আমলে এসে যুক্তরাষ্ট্র শুধু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার নিয়মই নয়, বরং নিজেদের কর্ম যে নীতি দ্বারা পরিচালিত, সেই অভিনয়ও ত্যাগ করছে।

কার্নি ঠিকই বলেছেন, মৌলিক কিছু বদলে গেছে। কিন্তু তিনি যখন মধ্যম ও উদীয়মান শক্তিগুলোকে এই ভাঙা ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য দেখানো বন্ধ করতে বলেন, তখন তিনি এর ক্ষতিকর দিকটি অবমূল্যায়ন করেন। সেটি হলো, লিবারেলিজমের অভিনয় হারিয়ে গেলে তার সঙ্গে আর কী কী হারিয়ে যায়?

গত ২০ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে বক্তব্য দেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: সংগৃহীত
গত ২০ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে বক্তব্য দেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: সংগৃহীত

কার্নির মতে, কানাডার মতো ছোট বা মধ্যম শক্তির দেশগুলো ‘নিয়মনির্ভর ব্যবস্থা’ ভেঙে পড়লেও কিছু উদারনৈতিক মূল্যবোধ ধরে রাখতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে আদৌ কি কোনো আদর্শভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব?

 

সেই ভবিষ্যতের ভাবনা বেশ উদ্বেগজনক। কারণ, যে বিশ্বে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের কাজের নৈতিক ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য নয়, সেই বিশ্ব আরও বেশি বিপজ্জনক। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদের কাজের নৈতিকতা ব্যাখ্যা করতে বাধ্য থাকে, তখন দুর্বল রাষ্ট্রগুলো সুবিধা পায়। তারা যৌথ মানদণ্ডের কথা বলতে পারে, আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় নিতে পারে এবং কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য দাবি করতে পারে।

 

কিন্তু নিয়মনীতির অভিনয়টুকুও যখন আর প্রয়োজন হয় না, তখন শক্তিধর দেশ যা খুশি তা-ই করতে পারে। কারণ, সে জানে, তাকে ঠেকাতে পারে কেবল অন্য কোনো বড় শক্তিধর রাষ্ট্র বা সুপারপাওয়ার। এই অস্থিতিশীলতা শেষ পর্যন্ত শক্তিশালীদেরও ছাড় দেয় না। এক চিরস্থায়ী যুদ্ধ ও দ্বন্দ্বের দিকে ঠেলে দেয় নিজেদের।

 

হতে পারে এটা অভিনয়, তবু এইটুকু মন্দ নয়

কথাটি জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দুর একটি গানের লাইন। এটিই যেন বিদ্যমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঠিক দৃশ্যায়ন। সত্যি বলতে, ভণ্ডামি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বরাবরই দ্বিমুখী ভূমিকা রেখেছে। একদিকে এটি ক্ষোভ ও অবিশ্বাস জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে বৃহৎ শক্তিকে নিয়ন্ত্রণেও রেখেছে। কারণ, রাষ্ট্রগুলোকে তারা যে নৈতিক মানদণ্ডের কথা বলে, তার জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়েছে, অভিনয়ের ছলে হলেও।

 

  

কোল্ড ওয়ার বা শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ঝান্ডা উঁচিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজের নেতৃত্বের বৈধতা দিয়েছিল, যদিও বাস্তবে দেশটির আচরণ প্রায়ই সেই আদর্শের সঙ্গে মিলত না। তবে সেই ভণ্ডামিকে চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হয়েছে।

 

মিত্র রাষ্ট্র ও নিরপেক্ষ দেশগুলো বারবার মার্কিন বয়ানকে ব্যবহার করেই তার আচরণের সমালোচনা করেছে এবং ঘোষিত নীতির সঙ্গে বাস্তব আচরণের সামঞ্জস্যতা দাবি করেছে। এই চাপ বাস্তব ফলও দিয়েছে।

 

উদাহরণ হিসেবে ১৯৭৫ সালের চার্চ কমিটির কথা বলা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গোপন কার্যক্রম নিয়ে কংগ্রেসের তদন্ত শুরু হয় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে। এই তদন্ত গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নজরদারি কাঠামো বদলে দেয় এবং পররাষ্ট্রনীতিতে মানবাধিকারের গুরুত্ব বাড়ায়।

 

এই চাপ শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও বজায় ছিল। ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দিয়েই ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ ব্যবহারের হুমকি দিয়েছিল। তবে অস্ত্র না পাওয়ায় সেটি আর করতে পারেনি। এরপরেও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র, কারণ ওয়াশিংটন ‘নিয়মনির্ভর ব্যবস্থার’ ভেতরেই কাজ করে বলে দাবি করত।

 

একই ধরনের চাপ দেখা যায় ড্রোন তৈরি ও হামলার ক্ষেত্রেও। ডেমোক্রেটিক-রিপাবলিকসহ সব আমলেই যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন কর্মসূচি বিস্তৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ, মিত্র দেশ ও নাগরিক সমাজ চুপ থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্রের আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতি উদ্ধৃত করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি দাবি করেছে। চাপে পড়ে ওয়াশিংটন আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছে, কখনো লক্ষ্যমাত্রা সংকুচিত করেছে, আবার কখনো নজরদারি মেনে নিয়েছে।

এই সীমাবদ্ধতা নিখুঁত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি শেষ পর্যন্ত কার্যকরই ছিল। কিন্তু নৈতিক ব্যাখ্যার বাধ্যবাধকতা একধরনের সংশ্লেষণ তৈরি করেছিল। এটি দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিরোধের ভাষা দিয়েছিল এবং শক্তিধর রাষ্ট্রকে স্বার্থের বাইরে জবাবদিহির মুখে ফেলেছিল।

 

অনৈতিক-অমুখাপেক্ষী যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই জবাবদিহির সংস্কৃতি স্পষ্টভাবে দুর্বল হয়েছে। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—যুক্তরাষ্ট্র শুধু তার ঘোষিত নীতিই লঙ্ঘন করছে না, বরং নিজের কাজের নৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজনতাই বোধ করছে না।

 

আগের প্রশাসনগুলো যেখানে আইন, বৈধতা, নৈতিকতা বা উদারনৈতিক মূল্যবোধের ভাষায় ক্ষমতার ব্যবহারকে ডিফেন্ড করত, সেখানে এখন যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘ন্যাকেড লেনদেনে’র যুক্তিতে পররাষ্ট্রনীতি ব্যাখ্যা করছে।

 

  

এই প্রবণতা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই স্পষ্ট হয়। ২০১৮ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে ট্রাম্প বলেননি যে ইরান আন্তর্জাতিক আইন ভেঙেছে। তিনি বলেছিলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘খারাপ চুক্তি’।

 

সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প মানবাধিকার নয়, বরং অস্ত্র বিক্রি ও কর্মসংস্থানের কথা বলে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে সাফাই গান।

 

দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প নৈতিক ব্যাখ্যার ভাষাটুকুও বর্জন করেছেন। গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তিনি ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় মিত্রদের শুল্কের হুমকি দিয়েছেন লেনদেনের ভাষায়।

 

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

 

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তদন্ত করায় ট্রাম্প আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এটি আইনি যুক্তি দিয়ে নয়, কেবল প্রতিশোধ হিসেবেই করেছিলেন।

 

সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ আসে তাইওয়ান প্রসঙ্গে। চীনা আগ্রাসন নিয়ে প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, এতে তিনি খুশি হবেন না, তবে সিদ্ধান্তটি সি চিন পিংয়ের। এগুলো নীতির ব্যতিক্রম নয়, এগুলো নীতির অনুপস্থিতি।

 

নৈতিকতার পথ কণ্টকাকীর্ণ

আপাতদৃষ্টিতে নৈতিক ব্যাখ্যা পরিহার দীর্ঘদিনের ভাঙা ক্যাসেট বন্ধ হওয়া বলে মনে হতে পারে। ভণ্ডামিপূর্ণ নৈতিক ব্যাখ্যা যদি বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে এবং প্রতিক্রিয়া ডেকে আনে, তবে নৈতিক দাবি না তুলে ক্ষমতা প্রয়োগ করাকে তুলনামূলকভাবে আরও কার্যকর উপায় বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। সর্বজনীন নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিহীন এক দুনিয়ায় কেবল বস্তুগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ প্রাধান্য পেলে সুনাম তুলনামূলক কম ক্ষুণ্ন হয়।

এই পরিবর্তনকে কেউ কেউ স্বাগতও জানিয়েছেন। ব্রাজিলের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক সেলসো আমোরিমের মতে, ট্রাম্পের কাজকর্মে ভণ্ডামি নেই, আছে শুধু নগ্ন স্বার্থ ও নিরেট সত্য। এটি দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো বিভ্রম ছাড়াই দর-কষাকষির সুযোগ দেয়।

 

কিন্তু এই নগ্ন স্বার্থের কার্যকারিতারও একটি মূল্য চোকাতে হয়। যখন বড় শক্তিগুলো আর নিজেদের আচরণের নৈতিক ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য বোধ করে না, তখন যে বিরোধগুলো একসময় বৈধতা নিয়ে যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে চলত, সেগুলো ক্রমেই শক্তি প্রয়োগের পরীক্ষায় পরিণত হয়। সামরিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এর একটি প্রধান উদাহরণ।

 

  

 

আগের ব্যবস্থায়, নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী শক্তিকে ব্যাখ্যা করতে হতো, কোন নির্দিষ্ট আইন বা বিধি লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়ায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তা কীভাবে সর্বজনীন আদর্শ ও নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসন যখন ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করে, তখন তারা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি (এনপিটি) ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব লঙ্ঘনের তথ্য নথিভুক্ত করে এবং চুক্তিটিকে যাচাইযোগ্য আইনি কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করে।

 

আজ সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। এখন কোনো বড় শক্তি কেবল নিজের স্বার্থ এগিয়ে নিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের আগস্টে ট্রাম্পের ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপকে উল্লেখ করা যেতে পারে, এটি কোনো বাণিজ্য চুক্তি ভঙ্গের কারণে নয়, বরং পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনার সময় মধ্যস্থতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকেই।

 

এ ধরনের ব্যবস্থায় যুক্তি নয়, দর-কষাকষিই মুখ্য হয়ে ওঠে; সম্মতির বদলে চাপ প্রয়োগের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি সেই ভাষা হারিয়ে ফেলে, যার মাধ্যমে বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করা যায়, ফলে শক্তিশালী পক্ষগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো ফল নির্ধারণের সুযোগ পায়।

 

এই পরিবর্তন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর জন্য হয়তো সামাল দেওয়া সম্ভব, কারণ, তারা সহজেই জরিমানা আরোপ করতে পারে এবং প্রতিক্রিয়া সহ্য করার সক্ষমতাও রাখে; কিন্তু গোটা বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য এটি ভয়াবহ অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। নৈতিক ব্যাখ্যার চাপ না থাকলে শক্তিধর রাষ্ট্র একেবারেই লাগামছাড়া হয়ে যায় এবং দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর ফলে একধরনের নগ্ন শ্রেণিবিন্যাস তৈরি হয়, যেখানে সহযোগিতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং সংঘাত আরও অবশ্যম্ভাবী ও তীব্র হয়ে ওঠে।

 

মধ্যম শক্তিদের খুঁজতে হচ্ছে ভিন্ন পথ

এই পরিবর্তনের মূল্য সবাইকে সমানভাবে চোকাতে হবে না আর এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব দেখা যাচ্ছে ‘গ্লোবাল সাউথ’ দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে। যৌথ মানদণ্ড ও নৈতিক ব্যাখ্যার ভাষা হারানো ওয়াশিংটনের পক্ষে এখন প্রতিষ্ঠান ও নিয়মের মাধ্যমে বিরোধ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে; এর বদলে তাকে বেশি করে নির্ভর করতে হচ্ছে নিজের শক্তি ও চাপ প্রয়োগের ওপর।

 

শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী দীর্ঘ সময়জুড়ে যৌথ নিয়মের প্রতি প্রতিশ্রুতি ‘গ্লোবাল সাউথ’ দেশগুলোকে সুযোগ দিয়েছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে পড়লেও বিরোধকে কেবল শক্তির পরীক্ষায় পরিণত না করে তা মোকাবিলা করতে পেরেছে। ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ব্রাজিল দীর্ঘদিন বৈশ্বিক মুক্তবাণিজ্যের নিয়ম মানতে অনীহা দেখিয়েছিল। কিন্তু একবার সে ব্যবস্থা গ্রহণ করার পর সেই নিয়মগুলো নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে শিখে যায়।

 

 

২০০০-এর দশকের শুরুতে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তুলা উৎপাদক ব্রাজিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ভর্তুকির বিরুদ্ধে মামলা করে। ব্রাজিলের যুক্তি ছিল, নিজেদের তুলাশিল্পে ভর্তুকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ডব্লিউটিওর বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করছে। এই মামলা ডব্লিউটিওর আইনি কাঠামোর মধ্যেই নিষ্পত্তি হয়। যুক্তরাষ্ট্র মামলায় হেরে যায় এবং ছাড় দিতে বাধ্য হয়।

 

এই বিরোধ একটি যৌথ ও পারস্পরিকভাবে স্বীকৃত আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর ভেতরেই মীমাংসিত হয়েছিল, যার ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অক্ষুণ্ন থাকে এবং বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হয়।

এর সঙ্গে তুলনা করলে আজকের যুক্তরাষ্ট্র-ব্রাজিল বাণিজ্যনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের রপ্তানির ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছে, এটি কোনো বাণিজ্য চুক্তি লঙ্ঘনের কারণে নয়, বরং ট্রাম্পের রাজনৈতিক মিত্র ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে সাজা দেওয়ার প্রতিশোধ নিতেই। উল্লেখ্য, বলসোনারো নির্বাচনের ফল উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত তাঁকে দণ্ড দেন।

 

এই শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে ব্রাজিল বহুপক্ষীয় বাণিজ্যনীতির আশ্রয় নেয়নি, বরং তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করেছে। শুধু তা-ই নয়, দেশটি বিরল খনিজসম্পদ ভবিষ্যতে চীনকে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। তবে ব্রাজিলে স্বার্থ থাকা মার্কিন কোম্পানিগুলো হোয়াইট হাউসের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে উত্তেজনা প্রশমিত হয়।

 

এই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গেও। কয়েক দশক ধরে জার্মানির মতো দেশগুলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে অসম অংশীদারত্ব মেনে নিয়েছিল, কারণ যৌথ নীতি, নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় দেশটির একটি অবস্থান ছিল। বহুপাক্ষিকতা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য দূর করেনি, তবে তা কিছুটা নমনীয় করেছিল।

 

ভণ্ডামির অবসানকে অনেক সময় অগ্রগতি বলে মনে হতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময়ে পশ্চিম জার্মানি এবং ১৯৯০ সালের পর একীভূত জার্মানির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এই যুক্তির ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল। ন্যাটো ও বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত থেকে জার্মান নেতারা আইন, প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়াগত কাঠামোর মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অসম সম্পর্ক সামাল দিতেন। বিরোধগুলো শক্তির মুখোমুখি সংঘর্ষ হিসেবে নয়, বরং একটি যৌথ ব্যবস্থার ভেতর যুক্তিতর্ক হিসেবে উপস্থাপিত হতো।

 

১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র যখন পশ্চিম জার্মানিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পারমাণবিক প্রযুক্তি রপ্তানি সীমিত করার জন্য চাপ দেয়, তখন জার্মান সরকার পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি (এনপিটি) ও নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপের মাধ্যমে সেই বিধিনিষেধ মেনে নেয়। এতে বাণিজ্যিক স্বার্থকে অগ্রাহ্য করে এমন একটি নীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে হলেও উভয় দেশের জন্যই গ্রহণযোগ্য ছিল।

 

এই পদ্ধতি জার্মানিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে সুযোগ বুঝে প্রতিরোধের সুযোগ দিয়েছিল, একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবেও থেকে গেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যখন উদারনৈতিক মূল্যবোধ ও নৈতিকভাবে নিজের কাজের ব্যাখ্যা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, তখন সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জার্মানির ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে খোলাখুলি লেনদেনভিত্তিক ভাষায়। শুল্ককে ব্যবহার করেছে চাপের হাতিয়ার হিসেবে, জ্বালানি নীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে গৌণ নিষেধাজ্ঞার হুমকি আর নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিকে উপস্থাপন করেছে ‘সুরক্ষা সেবা’ হিসেবে।

 

এর জবাবে জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে শুরু করেছে, ইউরোপীয় শিল্পনীতি জোরদার করছে, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনে বিনিয়োগ করছে এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব বৈচিত্র্যময় করছে। বার্লিন নিজেকে এমন এক বিশ্বের জন্য প্রস্তুত করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি যৌথ নিয়মের বদলে কেবল চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে কাজ করে। 

 

কানাডাও একই ধরনের সংকটে পড়েছে। ট্রাম্প কানাডার ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন এবং দেশটিকে নিজস্ব জ্বালানিনীতি পরিত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার দাবি জানিয়েছেন। আরও চরমভাবে, ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন।

 

জার্মানির মতো কানাডাও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে শুরু করেছে। বাণিজ্য অংশীদারত্ব বৈচিত্র্যময় করা ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ নিচ্ছে। উভয় দেশই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পথেই হাঁটছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর যৌথ নীতির প্রতি আত্মসংযম দেখাচ্ছে না, সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা রক্ষা করাই মূল লক্ষ্য।

 

দাভোসে দেওয়া ভাষণে মার্ক কার্নি ঠিক এই বাস্তবতাকেই নতুন আন্তর্জাতিক ভাঙনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, নিয়মনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পতন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এখন নিরাপদ নয়, আত্মরক্ষার্থে সাবধানতা অবলম্বনের বিকল্প নেই।

 

লিবারেলিজমের সঙ্গে কি যুক্তরাষ্ট্রেরও বিদায়?

যুক্তরাষ্ট্র যখন উদারনৈতিক ব্যাখ্যার দায় থেকে সরে যাচ্ছে, তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নয়; বরং দেশটি দীর্ঘদিন ধরে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং এর নিয়ন্ত্রক ছিল, সেটিকেই ভেঙে দেবে।

 

আমেরিকান শক্তির সবচেয়ে বড় সাফল্য কেবল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ছিল না, বরং সেই আধিপত্যের প্রতি অন্য দেশগুলোর নৈতিক সম্মতি আদায়। কেবল লেনদেনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জোট টিকে থাকতে পারে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো হয় দুর্বল এবং সংকটকালে নেতৃত্ব দেওয়ার কেউ থাকে না। নীতির ভাষা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র অন্যদের কাছে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার সক্ষমতাও হারাচ্ছে।

 

ভণ্ডামির অবসান দ্বৈত মানদণ্ড, ভান ও আত্মপ্রবঞ্চনার উচ্ছেদ বলে মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে ‘ভণ্ডামিপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ একটি কাঠামোগত ভূমিকা পালন করে। ভণ্ডামি অবশ্যই ত্রুটিপূর্ণ, কিন্তু সেই ভণ্ডামির ছলেই সে বড় শক্তির পায়ে বেড়ি পরাতে পারে। ভণিতার ছলেই দুর্বল রাষ্ট্র হয়ে ওঠে শক্তিশালী।

 

নিশ্চিতভাবেই, এটি এমন কোনো যুক্তি নয় যে হারিয়ে যাওয়া এক বিশ্বব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। তথাকথিত ‘নিয়মনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ কখনোই যতটা নীতিনিষ্ঠ বলে দাবি করা হতো, ততটা ছিল না। অনেক সময় ভণ্ডামি যেমন ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করত, তেমনি অন্যায়ও আড়াল করত।

 

তবু সর্বজনীন মূল্যবোধের ভণিতার মধ্য দিয়েই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো স্বীকার করত, এই মূল্যবোধগুলোর গুরুত্ব আছে। যখন রাষ্ট্রগুলো আর নিজেদের কর্তৃত্ব বৈধ প্রমাণ করতে বাধ্য বোধ করে না, তখন সম্মতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং ক্ষমতা আরও লাগামহীন হয়ে কাজ করতে শুরু করে। এতে সংঘাত শুধু বাড়েই না, বরং তা চলে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো একসময় বুঝতে পারবে, নগ্ন আধিপত্য একটি হিপোক্রেট বিশ্বব্যবস্থার চেয়েও বেশি অস্থির ও টেকসই নয়; কিন্তু তখন কি যুক্তরাষ্ট্র টিকে থাকবে, না তাকে গিলে খাবে অন্য কোনো শক্তিধর?

ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ