Image description
 

আর মাত্র ৯ দিন বাকী, সত্যিকারার্থে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক একট সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি। রাজনৈতিক দলের নেতারা যে যার মতো মাঠে প্রচার কাজ চালাচ্ছেন। নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ ব্যস্ত ছিলেন নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করতে। রাজনৈতিক মাঠে থাকা দলগুলোর মধ্যে আলোচিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপিপ) গত ৩০ জানুয়ারি ৩৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এ সপ্তাহেই নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবে। বিএনপি আগামীকাল মঙ্গলবার ইশতেহার ঘোষণা করবে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও প্রকৃতপক্ষে দলটি এখনও ইশতেহার ঘোষণার দিনক্ষণ ঠিক করেনি, দু’একদিনের মধ্যে দলের পক্ষ থেকে ইশতেহার ঘোষণার তারিখ ও সময় জানানো হতে পারে। জামায়াতের ইসলামী ১ ফেব্রুয়ারি ইশতেহার ঘোষণার সিদ্ধান্ত থাকলেও পরে দলীয় কর্মসূচির কারণ তা পরিবর্তন করে ৪ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় নির্ধারণ করা হয়। একইদিনে ইশতেহার ঘোষণা করবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দলগুলো ইশতেহারে নিজস্ব পরিকল্পনা তুলে ধরবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ইতিমধ্যেই নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করেছে। বিএনপির ইশতেহারে চারটি বিষয়কে সামনে রাখা হয়েছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, দলটির দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’, বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফা এবং বিভিন্ন সংস্কার কমিশন ও জুলাই সনদে দেওয়া বিএনপির ইতিবাচক প্রস্তাবনাগুলোর (নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া) সমন্বয়ে ইশতেহার প্রস্তুত করা হয়েছে। অন্যদিকে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, নারীর নিরাপত্তা ও উন্নয়নের কথা থাকছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারে। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কে পৃথকভাবে দলটির চিন্তা ও পরিকল্পনা উল্লেখ থাকবে ইশতেহারে। প্রিন্ট ও ভার্চুয়ালী ইশতেহার তুলে ধরবে দলটি।

কী থাকছে বিএনপি’র ইশতেহারে
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঘোষিত ভিশন ২০৩০-কে ধারণ করে ২৩ সালে জনগণের সামনে তারেক রহমানের নির্দেশনায় ৩১ দফা উপস্থাপন করে বিএনপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেই ৩১ দফার আলোকেই ৮ প্যাকেজে ইশতেহার সাজাচ্ছে দলটি। ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড, দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যসেবা, কর্মমুখী শিক্ষা, পেশা হিসেবে ক্রীড়াকে প্রতিষ্ঠা, বাসযোগ্য পরিবেশ, দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ধর্মীয় নেতাদের জীবনমান উন্নয়নে একগুচ্ছ পরিকল্পনা দলটির। থাকছে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার। বিএনপির পরিকল্পনায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও ধর্মীয় নেতাদের জীবনমান উন্নয়নকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের মূল বিষয়গুলোও ইশতেহারে প্রতিফলিত হবে। তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ অ্যা প্লান’ এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের আদলে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ তৈরির পরিকল্পনা এবং বিএনপি নির্বাচিত হলে ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।

জানা গেছে বিএনপির, এবারের ইশতেহারে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারসহ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি থাকবে। দলটি ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি পরিবারে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নামে ফ্যামিলি কার্ড চালু করবে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায়। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে সার, উন্নত বীজ ও কৃষিপ্রযুক্তি পাবেন কৃষকরা। প্রত্যেকের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াসহ শক্তিশালী প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়টি উল্লেখ থাকবে। চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ক্রীড়াকেও পেশা হিসেবে গ্রহণযোগ্য করতে সব স্তরে খেলাধুলার উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেবে বিএনপি। নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং বাড়িয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা হবে। কর্মসংস্থানে এসএমই, বস্ত্র অর্থনীতি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আইসিটি খাতে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা হবে। বিদেশি শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ খুঁজে আরও বেশি তরুণকে পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানির ব্যবস্থা করা হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে কথা হয় শীর্ষনিউজ ডটকমের এ প্রতিবেদকের। এ সময় তিনি জানান, মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০, তারেক রহমানের ৩১ দফার সঙ্গে জুলাই সংস্কারের বিষয়গুলোর সমন্বয়ে ইশতেহার প্রস্তুত করেছে বিএনপি। কবে ইশতেহার ঘোষণা করা হতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে ইশতেহার ঘোষণার সঠিক দিনক্ষণ জানাতে পারেননি বিএনপির বর্ষীয়ান এই নেতা। এ দিকে স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য ও দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান শীর্ষনিজ ডটকমকে জানিয়েছেন, নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করা হয়েছে। দু’একদিনের মধ্যে ঘোষণার দিনক্ষণ জানিয়ে দেওয়া হবে। আপনারাই (সাংবাদিক) আগে জানবেন।

জামায়াত কেমন ইশতেহার দিচ্ছে
কয়েকদিন আগে ঢাকার একটি হোটেলে জামায়াতে ইসলামী ‘পলিসি সামিট’ উপস্থাপন করেছে। সেখানে দলটির আগামী দিনে দেশ নিয়ে কি পরিকল্পনা রয়েছে তার একটা ধারণা দেওয়া হয়েছে। এই পলিসি সামিটের সঙ্গে ইশতেহারের একটা মিল থাকবে। দলটির পলিসি সামিট ছিল প্রায় ৬ হাজার পৃষ্ঠার, আর ইশতেহার হবে ৪০ থেকে ৫০টি পয়েন্টে। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও দলটির সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সঙ্গে কথা হয় শীর্ষনিউজ ডটকমের এই প্রতিবেদকের। তিনি জানিয়েছেন, সরকারের যে ক’টি মন্ত্রণালয় রয়েছে প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিয়ে আলাদা আলাদা পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। শর্ট (ছোট) এবং ব্রট (বৃহৎ) আকারে বিভাগভিত্তিক ধারণা দেওয়া হবে। জনগণের কাছে প্রিন্ট ও ভার্চুয়ালী দলীয় ইশতেহার তুলে ধরা হবে।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আরও বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা ও নারীকে প্রধান্য দেওয়া হবে ইশতেহারে। বিনামূল্যে শিক্ষা, মেধাবীদের বিদেশে গিয়ে উচ্চ শিক্ষায় স্পন্সর করার ঘোষণা থাকবে। আর যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য যাচ্ছেন তাদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট করতে প্রয়োজনীয় কার্যকর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। যাতে শিক্ষাগ্রহণের পর কেউ বেকার না থাকেন। তিনি জানান, স্বাস্থ্যখাতে অগ্রাধিকার দিবে জামায়াতে ইসলামী, বিশেষ করে রোগীরা যাতে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে না হয় সেজন্য দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ বিশেষায়িত চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এতে ঢাকার ওপর চাপ কমবে, রোগী এবং তার স্বজনরা হয়রানি ও বাড়তি খরচ এড়াতে পারবেন। এছাড়াও ব্যবসায়ীদের সব ধরনের ঝামেলা ও জটিলতামুক্ত ব্যবসা করার পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি তাদের শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা হবে।

এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, যা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, এমন কিছুই থাকবে না জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহারে। এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, ২০ জানুয়ারি রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘পলিসি সামিট ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। পলিসি সামিটে বিভিন্ন প্যানেল ডিসকাশনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে পলিসি ঘোষণা করা হয়। ওই পলিসি সামিটের সঙ্গে ইশতেহারের সমন্বয় থাকবে।

শীর্ষনিউজ