Image description
 

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, গণভোট এবং জুলাই সনদের ধারণ সবচেয়ে বেশি বহন করেছেন শেখ হাসিনা। সেই সনদ ধারণ করার কারণেই তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। কিন্তু যারা কার্যত কিছু না করে সেই সনদ ধারণ করতে চেয়েছিল, তারা এখনো দ্বিধা ও দ্বন্দ্বে আটকে আছে। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই স্বৈরশাসন, ভোট জালিয়াতি, ত্রাণ ও কম্বল চুরির সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল। মাঝখানে জিয়া থেকে এরশাদের শাসনকাল পর্যন্ত দুর্নীতির সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল।

বাংলাদেশের একটি আঞ্চলিক প্রবাদ আছে, “সব মাছে ঘু খায়, ঘ্যাড়ো মাছের দোষ হয়।” তবে শেখ হাসিনার পতন ও দেশ ছাড়ার মধ্য দিয়ে তিনি শুধু স্বৈরাচারী উপাধিই অর্জন করেননি, বিনিময়ে বাংলাদেশকেও বর্জন করেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি বা দলের ছিল না। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল প্রকৃত অর্থেই আপামর জনগণের। অথচ ঠিক সেই জুলাই সনদকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, অপমানিত করা হয়েছে এবং হ্যাঁ ও না ভোটের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে।

যে সনদ ছিল সাধারণ মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক, সুইডিশ ভাষায় বললে আরও হৃদয়স্পর্শীভাবে, ‘självklara valet’, যার বাংলা অর্থ স্বাভাবিক ও অনিবার্য, ঠিক সেখানেই বাংলাদেশের একটি বড় গোষ্ঠী প্রশ্ন তুলছে। এই জাতি যখন এটা করতে পারে, তখন ধরে নিতে হয় তাদের নৈতিক মূল্যবোধ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। যে জাতি ধর্মের চর্চা করে এবং নিজে বিপদে পড়লে বলে ওপরওয়ালা পরীক্ষা নিচ্ছেন, কিন্তু অন্য কেউ ঠিক একই বিপদে পড়লে বলে পাপের শাস্তি হচ্ছে।

 

আমি নেমকহারাম শব্দটির মানে জানি। আমি নেমকহারাম দেখেছি। আমি নেমকহারামি করতে দেখেছি। কিন্তু বর্তমান রাজনীতিবিদদের মতো জালিয়াত নেমকহারাম পৃথিবীর কোথাও দেখিনি। একটি কথা বলে রাখা ভালো, অনেকে জুলাই সনদকে ব্যবহার করেছে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য। সম্ভবত এই কারণেই দেশের কিছু মানুষ মনঃক্ষুণ্ন হয়েছে। এর ফলেই দুঃখের সঙ্গে হলেও তারা মুখে বলে, তারা এখন আর জুলাই সনদ ধারণ করে না। আমার বিশ্বাস, এটি অভিমান থেকে বলা, মন থেকে নয়।

 
 

এবার আসা যাক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতায়ন এবং গত দীর্ঘ ১৮ মাসে তারা কী করেছেন, সেই প্রসঙ্গে। জাতির প্রত্যাশা ছিল ড. ইউনূসকে ঘিরে। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তিনি পরাজিত হয়েছেন এবং আমাদেরকেও পরাজিত করেছেন। ওসমান হাদি তাকে বলেছিলেন, ড. ইউনূস যেন মুখ খুলে জাতিকে জানান, কারা তাকে সঠিক পথে দেশ শাসন করতে বাধা দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি সেটাও করেননি। এই না করাটাই জুলাই সনদকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই দায় কি তিনি এড়াতে পারবেন।

 

তিনি রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে গণমাধ্যমে যখন বলেন, ‘জালিয়াতিতে বাংলাদেশ পৃথিবীতে চ্যাম্পিয়ন’, তখন সেই বক্তব্যের পর থেকেই নানা মহলে আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, রাষ্ট্রের শীর্ষ নির্বাহী যখন এ ধরনের কথা বলেন, তখন তা আর ব্যক্তিগত মতামত থাকে না, তা রাষ্ট্রের ভাষায় পরিণত হয়। বিশেষ করে সেই ব্যক্তি যদি মুহাম্মদ ইউনূসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত, নোবেলজয়ী এবং বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হন, তাহলে তার উচ্চারিত প্রতিটি বাক্য দেশের সীমানা পেরিয়ে বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

গত বুধবার ঢাকার বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপোর উদ্বোধন এবং ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’-এর ওয়েবসাইট ও লোগো উন্মোচন অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘জালিয়াতিতে বাংলাদেশ পৃথিবীতে চ্যাম্পিয়ন। আমাদের সব জিনিস জাল। বহুদেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না। ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল। এটা একটা জালিয়াতের কারখানা বানাইছি আমরা।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন, প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্যের সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ নাগরিকদের ওপর, যাদের বড় একটি অংশ বিদেশে কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা পর্যটনের জন্য ভিসা ও পাসপোর্টের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশে পাসপোর্ট খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৪ সালে বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক প্রতিবেদনেও সে কথা উঠে এসেছে। ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৩ সালে সেবাখাতের মধ্যে পাসপোর্ট পেতে গিয়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হয়েছে।

মনে কি পড়ে, ড. ইউনূসের মতো শেখ হাসিনাকেও বলতে শুনেছেন, তার বাড়ির কাজের লোক চারশ কোটি টাকার মালিক। সেদিনই আমি ধরে নিয়েছিলাম, শেখ হাসিনার সময় ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু তিনি আজও সেই বাস্তবতা মেনে নিতে পারেননি। আফসোস।

দেশটা যে কারো বাপের না, কারো মায়ের না, বা কোনো পরিবারের না, এই কথাটা আমরা আজও বোঝাতে পারিনি। এটাই আমাদের ব্যর্থতা।

সদ্য জামায়াতের আমির যে মন্তব্য করেছেন, তা শুধু সময়ের সঙ্গে বেমানান নয়, বরং ভয়ংকরভাবে মানবিক ও নৈতিক সীমা লঙ্ঘন করেছে। প্রযুক্তির এই যুগে, যেখানে নারী বিশ্ব নেতৃত্ব দিচ্ছে, আরব সভ্যতায় পরিবর্তন ঘটছে, এবং যেখানে ইসলামের ইতিহাসেই হজরত মুহম্মদ (সা.) এর সহধর্মিণী হজরত খাদিজা (রা:) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী ও সমাজে সম্মানিত প্রতিনিধি, সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নারীদের কাজ করাকে পতিতাবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। রাষ্ট্রের ৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় দেশ পরিচালনা করেছেন একজন নারী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ প্রীতিলতা ওয়েদ্দেদার, মুক্তিযুদ্ধে বীর প্রতীক ডা. সেতারা বেগম ও তারামন বিবি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা ইন্দিরা গান্ধী কিংবা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর নারী নেতৃত্ব, সবই প্রমাণ করে যে নেতৃত্ব ও দায়িত্ব পালনে নারী কোনো ব্যতিক্রম নয়।

রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেও মা হওয়ার দায়িত্ব পালনের নজির বিশ্বজুড়ে রয়েছে। বেনজির ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় সন্তান জন্ম দিয়েছেন, জেসিন্ডা আরডার্ন রাষ্ট্র পরিচালনার মাঝেই মাতৃত্ব গ্রহণ করেছেন, বাংলাদেশের নারী প্রধানমন্ত্রীদেরও সন্তান রয়েছে। দেশের ভেতরেও নারীরা মা হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও করপোরেট খাতে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কাজ করা নারী মানেই নৈতিক অবক্ষয়, এই ধারণা ইতিহাস, বাস্তবতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, তিনটির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।

রাষ্ট্র পরিচালনা বা প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব কোনো কায়িক শ্রমনির্ভর কাজ নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার বিষয়। এই সত্যই ২০২৩ সালে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ক্লডিয়া গোলডিনের গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আধুনিক যুগে শিক্ষা ও জ্ঞানভিত্তিক কাজে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষের সমান, অনেক ক্ষেত্রে বেশি। করোনা মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন নারী, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্য এনেছে নারী ফুটবল ও ক্রিকেট দল, এভারেস্ট জয় করেছেন বাংলাদেশি নারী, প্রবাসে রাজনীতি ও বিচার বিভাগেও নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন।

এই বাস্তবতার পরও যখন একজন রাজনৈতিক নেতা কর্মজীবী নারীদের পতিতার সঙ্গে তুলনা করেন, তখন সেটি কেবল নারী অবমাননা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রচিন্তার ঘোষণা। শেখ হাসিনার সেই প্রশ্ন, “রাজাকারের নাতিপুতি কী কোটা পাবে?” এই মুহূর্তে নতুন করে ফিরে আসে। কারণ এখানেই স্পষ্ট হয়, জামায়াত ইসলামের রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন নারীর নাগরিক মর্যাদা কোথায় দাঁড়াতে চায়। বাংলাদেশের জনগণ যদি এই মন্তব্যের যুক্তিসংগত ও প্রকাশ্য জবাবদিহি না চায়, তাহলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র কোন পথে যাবে, সেই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে।

দেশের রাজনীতি, দুর্নীতি এবং বহিরাগত চাপের বাস্তবতা

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা ব্যক্তি পর্যায়ের সংঘাত নয়। এটি এখন গঠনগত এবং ভূরাজনৈতিক স্তরে পৌঁছে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি ব্যবহৃত হয়েছে অনৈতিক পুঁজি সঞ্চয় ও দুর্নীতির হাতিয়ার হিসেবে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে জনগণের বিশ্বাস হারিয়েছে। দুর্নীতির ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়। এটি মানুষের অধিকার, ন্যায্যতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে বহিরাগত আগ্রহ ও চাপ। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে কৌশলগত গুরুত্ব, জনসংখ্যা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেশটিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র করে তুলেছে। ফলে বিভিন্ন বিদেশি শক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

এই পরিস্থিতিতে দেশের ভেতরের রাজনৈতিক জোটগুলোও অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পরিবর্তে নিজেদের অস্তিত্ব ও ক্ষমতা রক্ষার প্রশ্নে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠেছে। ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতার বাইরে থাকা, উভয় পক্ষের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের হিসাব। এর ফলে জাতীয় স্বার্থ, দুর্নীতিমুক্ত শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রশ্নগুলো বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।

অতীতের নির্বাচনগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, বৈদেশিক মন্তব্য এবং কূটনৈতিক উদ্বেগ যেভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, তা দেখিয়ে দেয় দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কতটা আস্থাহীন হয়ে পড়েছে। যখন রাষ্ট্র নিজেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তখন বাইরের শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। এই সুযোগ কখনো মানবাধিকার, কখনো গণতন্ত্র, আবার কখনো স্থিতিশীলতার নামে সামনে আসে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বিভাজন ও অবিশ্বাস। একে অন্যকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনছে। এই বিভাজনের সুযোগেই বহিরাগত শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে। রাষ্ট্র তখন জনগণের নয়, বিভিন্ন স্বার্থের সংঘর্ষস্থলে পরিণত হয়।

এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে। আমরা কি সত্যিকার অর্থে একটি দুর্নীতিমুক্ত, সার্বভৌম এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, নাকি কেবল ক্ষমতার নতুন বন্দোবস্তে সন্তুষ্ট থাকব। যদি নির্বাচন, গণভোট এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বারবার আস্থার সংকটে পড়ে, তাহলে মানুষের বিশ্বাস আর ফিরে আসবে না। তখন রাজনীতি আর জনগণের হাতিয়ার থাকবে না, বরং তা হয়ে উঠবে দেশি ও বিদেশি স্বার্থের কৌশলগত মাঠ।

রহমান মৃধা গবেষক ও লেখক সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন