গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে নতুন সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে একটি পুরোনো চলাচলযোগ্য সেতুর অর্ধেকের বেশি অংশ ভেঙে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। তবে এর জন্য কোনো প্রকার টেন্ডার বা নিলামের তোয়াক্কা করেননি তিনি।
অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যানের নাম মো. মোখলেছুর রহমান মণ্ডল। তিনি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান।
এদিকে, সংযোগ সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় এবং সেতুর অবশিষ্টাংশ বিপজ্জনক অবস্থায় ঝুলে থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন উপজেলার চারটি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুটির অবস্থান ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের দক্ষিণ রাজীবপুর গ্রামের উত্তর পাড়ায় আলম মিয়ার বাড়ির পাশে। সেতুটিতে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। এক সময়ের চলাচলযোগ্য সেতুটির অর্ধেকের বেশি অংশ গায়েব। ভেঙে নিয়ে যাওয়া হয়েছে লোহার রড ও ইট। কোনো বিকল্প রাস্তা বা সংযোগ সড়ক না করেই কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় সেতুর বাকি অংশ এখন শূন্যে ঝুলে আছে।
ফলে স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে সেতুর দুপাশে সড়ক কেটে ঢালু পথ তৈরি করেছেন, যা দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রিকশা, ভ্যান ও সাধারণ মানুষ চলাচল করছে।
আর চেয়ারম্যানের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, সরকারি ওই সেতুর বিপুল পরিমাণ পুরোনো ইট সেখানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় মাস খানেক আগে চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান তার ছেলে ও কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে এসে ঘোষণা দেন—এখানে নতুন ব্রিজ হবে, তাই পুরোনোটা সরাতে হবে। এর পরপরই শুরু হয় ভাঙচুর। টানা ৮-১০ দিন ধরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার ইট এবং রড ট্রাক্টরে করে চেয়ারম্যানের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর রহস্যজনকভাবে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
দক্ষিণ রাজীবপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. লাল মিয়া বলেন, ‘চেয়ারম্যান ও কনটাকটার এসে বলেন যে, এখানে ব্রিজের টেন্ডার হয়েছে। সে কারণে পোরান ব্রিজ ভাঙি, নিয়ে যাচ্ছি। এক সপ্তাহের মধ্যে ব্রিজ করি দেবো বলেই ভাংগা শুরু করেন। আটদিন ধরি ইট, লোহা-লস্কর যা-যা আছে সবই নিয়ে গেছেন চেয়ারম্যান মোখলেছুর। ব্রিজটির বাকি অংশ প্রায় একমাস থাকি এ ভাবে পড়ে আছে। চলাচলে খুব সমস্যা হচ্ছে আমাদের।’
সেতুর পাশেই বাড়ি সিএনজি চালক মো. নজরুল ইসলামের। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখানেই আমার বাড়ি। আগে যা ছিল, তাতে চলাচল করা যেতো। এখন যে অবস্থা করেছে, তাতে দুর্ভোগটা আরও বেড়েছে। আমি গাড়ি চালাই। দুর্ঘটনার ভয়ে এখান দিয়ে নামতেও পারি না, উঠতেও পারি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামনে বর্ষাকাল আসতেছে। এখানে দুই তিন মানুষ লম্বা পানি হবে। পাশেই স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা আছে। বাচ্চারা কীভাবে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করবে?—মনে হলেই টেনশন ওঠে।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. সৈকত হাসান লিটন বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানতাম না। এক ব্যক্তি ফোন করে আমাকে জানায়। পরে ব্রিজের কাছে গিয়ে দেখি ঘটনা সত্য এবং তখন ওখানে চেয়ারম্যান সাহেবের ছেলে ছিলেন। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি তার বাবার কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যানকে ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে বিষয়টি ইউএনও ও পিআইও অফিসের লোককে জানাই। এ অবস্থার পর থেকে চার গ্রামের লোকদের যাতায়াতে কঠিন সমস্যা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে এড়িয়ে যান।
পরে উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘ব্রিজ টেন্ডারে আমি পেয়েছি। ভোটের কারণে কাজ আপাতত বন্ধ রেখেছি। বাকি অংশও ভোটের পরে নিয়ে আসব।’
তবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মশিউর রহমান জানান ভিন্ন তথ্য। তিনি বলেন, ‘সেতুটি অপসারণের জন্য নিলাম বা টেন্ডার প্রক্রিয়া এখনো প্রক্রিয়াধীন। চেয়ারম্যানকে নিষেধ করা সত্ত্বেও তিনি এটি ভেঙেছেন। এটি কোনোভাবেই ঠিক হয়নি।’
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘নিলাম ছাড়া ব্রিজটি ভেঙে নিয়ে গিয়ে ঠিক করেননি ইউপি চেয়ারম্যান। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’